||মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া||
আমাদের আকাবির উলামায়ে কেরাম যে যেখানে ছিলেন, সেখানকার সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করেই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিতে দ্বীন-ইসলাম ও উম্মাহর খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। তারা কেবল মসজিদ-মাদরাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং দেশ, জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বার্মা ও বাংলাদেশসহ পুরো উপমহাদেশ জুড়ে দ্বীনি দাওয়াত, শিক্ষা, লেখালেখি, আন্দোলন ও সংগ্রাম–সবক্ষেত্রেই তাদের অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে।
প্রতিটি বাতিল ফিরকার বিরুদ্ধে তারা অত্যন্ত দৃঢ়, সুসংগঠিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। কমিউনিজম, পুঁজিবাদ ও নাস্তিক্যবাদী দর্শনের বিরুদ্ধে যেমন ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি ভন্ড নবীর অনুসারী কাদিয়ানী সম্প্রদায়, বাহাই, মওদুদিবাদ, বেরেলভি, মুনকিরিনে হাদিস, আহলে কুরআন ও কথিত সালাফি ফেতনার বিরুদ্ধেও তারা সুসংগঠিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করে গিয়েছেন। এর ফলে তারা নিজেরাও হেফাজতে থেকেছেন এবং উম্মতকেও হেফাজত করেছেন।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমান সময়ে দ্বীনের নামে অসংখ্য বিচ্ছিন্ন গ্রুপ, প্ল্যাটফর্ম ও আত্মকেন্দ্রিক চক্র গড়ে উঠছে। এদের কথাবার্তায় অতি আবেগ; চিন্তা ও কর্মপন্থায় উগ্রতা রয়েছে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে উম্মাহর কল্যাণের বদলায় অকল্যাণ, ঐক্য-সংহতির পরিবর্তে বিভক্তি ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অমুসলিম তো বটেই, সাধারণ মুসলমানের কাছেও ইসলামকে ভীতিকর হিসেবে চিত্রায়িত করার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যা ইসলামোফোবিয়াকে আরও উসকে দিচ্ছে।
এই গোষ্ঠীগুলো কোনো সুসংগঠিত কাঠামো বা স্বীকৃত মুরুব্বিদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত নয়। তারা বিচ্ছিন্ন, দায়িত্বহীন ও আত্মকেন্দ্রিক। ছাত্রদের আবেগকে ব্যবহার করে গোপন কর্মকাণ্ড ও সেলিব্রিটিজমের খেলাটা এখানে বহুরূপে চলমান।
এই হঠকারিরা উদ্ভ্রান্তের ন্যায় এদিক সেদিক ছুটোছুটি করছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, উগ্রতা, বিচ্ছিন্ন ও বিশৃঙ্খল কর্মপন্থা কখনো শান্তি সম্প্রীতি, স্থিতিশীলতা উপহার দিতে পারে না। আদর্শিক আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না।
দুই.
যখন কমিউনিজমের প্রবল উত্থান চলছিল, তখন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে মাওবাদী, নকশালী, সর্বহারা প্রভৃতি নামে বেনামে অসংখ্য গুপ্ত সংগঠন গড়ে উঠেছিল। অর্থনৈতিক মুক্তির স্লোগানের আড়ালে তারা সমাজে হত্যা, লুটতরাজ, নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্টি করত।
‘কেউ খাবে, কেউ খাবে না— তা হবে না তা হবে না’ জাতীয় চটকদার স্লোগান দিত, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরিকরণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলত, কিন্তু এসবের আড়ালে তারা মূলত সমাজে বিশৃঙ্খলাই ডেকে এনেছিল।
পরবর্তীতে যখন কমিউনিজমের পতন ঘটল এবং যারা এসব গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা করত তারা মুখ ফিরিয়ে নিল, তখন এদের রসদ পাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, ফলে পর্যায়ক্রমে এসব গুপ্ত গোষ্ঠী বা সংগঠনও বাতাসে মিলিয়ে অস্তিত্বহীন হয়ে পরে।
আজ অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, একই কৌশল ইসলামের ছদ্মাবরণে প্রয়োগের অপ চেষ্টা চলছে। বামপন্থী গুপ্ত গোষ্ঠীর মত ধর্মীয় লেবেল লাগিয়ে বিভিন্ন গুপ্ত প্লাটফর্ম তৈরির কথা শুনা যায়। কারা এদের তৈরি করছে? কারা এদের হৃষ্টপুষ্ট করছে? এসবের সদোত্তোর মিলা দূরহ ব্যাপার। এরা কথিত খেলাফত, ইসলামী হুকুমত, ইসলামী শাসনব্যবস্থার নামে সমাজে উগ্রতার বিষবাষ্প ছড়ায়। তাদের বক্তব্য, আচরণ ও কর্মকাণ্ডে চরমপন্থার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।
মুসলিম কাজী ও ইসলামী আদালত সংশ্লিষ্ট শরিয়তের সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো সম্পর্কে ভ্রান্তিপূর্ণ মানসিকতা তৈরির হীন কশরত করে চলছে। ইসলামী ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, যা আমাদের কারো জন্যই কল্যাণকর নয়। এর ফলে ইসলামি শাসনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে— যা অদূর ভবিষ্যতে মুসলিমসমাজে অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তিন.
চারদিকে এখন ঐক্য ঐক্য রব। যদিও এই কথিত ঐক্যই এক পর্যায়ে অনৈক্যের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঐক্যের নামে অতীতেও বহু প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছিল। ঐক্যের যেমন ইতিবাচক দিক আছে, তেমনি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। অতীতের সব ঐক্য শতভাগ সঠিক ছিল, এমন দাবি করা যায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তথাকথিত ঐক্যের নামে হকপন্থী উলামায়ে কেরাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদায় বিশ্বাসী কোন কোন দল অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ১৯৭৬ সালে গঠিত আইডিএল তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। যাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে গুরুতর অভিযোগ ছিল, ঐক্যের সুযোগে তারাই সব ফায়দা লুটে নিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বর্তমানে যে ঐক্যের স্লোগান তোলা হচ্ছে, তাতে উদ্বেগজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, জন্মকাল থেকেই যাদের ভ্রান্তি সম্পর্কে উলামায়ে কেরাম যুগ যুগ ধরে উম্মতকে সতর্ক করে আসছেন, ঐক্যের নামে সেই ভ্রষ্টতাকেই হালকা করে দেখানো হচ্ছে। গুরুতর আকিদাগত বিচ্যুতিকে গৌণ বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে কওমি প্রজন্মের একটি অংশ ধীরে ধীরে সেই ধারার দিকে ঝুঁকে পড়ছে, দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি অশনিসংকেত।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মৌলিক আকিদা সম্পর্কে যখন নমনীয় ও আপসকামী ধারণা প্রচার করা হয়, তখন হক ও বাতিলের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফলে হক বাতিলের পার্থক্যের সুদৃঢ় প্রাচীর দুর্বল হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বাতিলের আধারে হক মিশে যায়।
চার.
অতীতেও বহুবার কওমি প্রজন্মের সরলতা ও দ্বীনি আবেগকে পুঁজি করে তাদের ব্যবহার করা হয়েছে। তাই কওমি প্রজন্মের খুবই সতর্ক থাকতে হবে। যে কোন প্রতিকুল পরিবেশে প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মুরব্বিদের ছায়াতলে থাকায় হবে নিরাপদ। কোনো প্লাটফর্মে যুক্ত হওয়ার আগে, কোনো আন্দোলনে শরিক হওয়ার পূর্বে আকাবির-আসলাফের নীতিমালার সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়া। ‘নারায়ে তাকবির’ শুনলেই বিবেকহীনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে না। কোন অবস্থাতেই কারো অন্যায় স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হওয়া যাবে না।
জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ এগুলোর কোনোটি ইসলাম অনুমোদন দেয় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতেও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, কারো ফসল নষ্ট করা যাবে না, গাছ কাটা যাবে না, শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা যাবে না, ঘরবাড়ি লুণ্ঠন করা যাবে না, এমনকি শত্রুপক্ষের মৃতদেহের অঙ্গহানিও নিষিদ্ধ। যেখানে ইসলাম এত সূক্ষ্ম ও মানবিক বিধান দিয়েছে, সেখানে ইসলামের নাম ভাঙিয়ে লুটতরাজ ও ভাঙচুর কখনো ইসলামের দাবিদারদের কাজ হতে পারে না।
বুদ্ধিবৃত্তিক ভ্রান্তির মোকাবিলা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই করতে হবে। ইসলামের নাম ব্যবহার করলেই যে কোনো কাজ ইসলাম হয়ে যায় না। হককে হক হিসেবে, আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত রাখাই হকপন্থী উলামায়ে কেরামের মৌলিক দায়িত্ব।
অতএব, হে কওমি প্রজন্ম! যাচ্ছ কোথায়? বুঝেশুনেই কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে।
লেখক: মুহতামিম, জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়া আরজাবাদ
এনএইচ/