|| আকিদুল ইসলাম সাদী ||
সন্ধ্যার পর উঠোনে হালকা বাতাস বইছে। আকাশে একে একে তারা ফুটতে শুরু করেছে। নাতি-নাতনিরা দাদার চারপাশে গোল হয়ে বসেছে। আগের দিনের গল্পের কথা সবারই মনে আছে। আজ দাদা আবার গল্প শুরু করলেন।
বাচ্চারা, মনে আছে তো? ছোট্ট মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাত্র ছয় বছর বয়সেই তাঁর মাকে হারিয়েছিলেন। কত বড় কষ্ট! কিন্তু আল্লাহ কখনো তাঁর প্রিয় বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না। একজন চলে গেলে আরেকজনকে তাঁর পাশে দাঁড় করিয়ে দেন।
দাদা একটু থামলেন। তারপর বললেন, মায়ের ইন্তেকালের পর ছোট্ট মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে মক্কায় নিয়ে আসেন উম্মে আইমান (রা.)। এরপর তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব নেন তাঁর দাদা, কুরাইশদের সম্মানিত নেতা আবদুল মুত্তালিব।
এক নাতি জিজ্ঞেস করল, দাদু, তিনি কি নবীজিকে খুব ভালোবাসতেন?
দাদা হেসে বললেন, খুব! না রে দাদু ভাই, শুধু খুব নয়— অসীম ভালোবাসতেন। কাবা শরিফের পাশে আবদুল মুত্তালিবের জন্য একটি বিশেষ আসন পাতা থাকত। গোত্রের বড় বড় নেতারাও সেখানে বসার সাহস করতেন না। কিন্তু ছোট্ট মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্ভয়ে দাদার সেই আসনে গিয়ে বসতেন। কেউ তাঁকে সরিয়ে দিতে চাইলে আবদুল মুত্তালিব বলতেন, ‘ওকে কিছু বলো না। আমার এই নাতির একদিন অনেক বড় মর্যাদার অধিকারী হবে।’ তারপর তিনি আদর করে তাঁকে নিজের পাশে বসিয়ে নিতেন।
নাতি-নাতনিদের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
দাদা আবার বলতে লাগলেন, কিন্তু সুখের সেই সময়ও বেশি দিন স্থায়ী হলো না। মাত্র দুই বছর পর, যখন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বয়স আট বছর, তখন তাঁর দাদাও ইন্তেকাল করলেন।
কথাটি বলে দাদা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর বললেন, ভাবো তো, ছোট্ট একটি শিশু— জন্মের আগেই বাবা নেই, ছয় বছর বয়সে মা নেই, আর আট বছর বয়সে দাদাও চলে গেলেন। একের পর এক প্রিয়জনকে হারিয়েও তিনি ধৈর্য হারালেন না। কারণ, আল্লাহ তাঁর জন্য আরও একটি আশ্রয় ঠিক করে রেখেছিলেন।
এক নাতনি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, সেই আশ্রয় কে ছিল, দাদু?
দাদা বললেন, তিনি ছিলেন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চাচা আবু তালিব। তিনি ধনী ছিলেন না। সংসারে অভাব ছিল। তবুও তিনি নিজের সন্তানের মতোই মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ভালোবাসতেন। কখনো তাঁকে একা রেখে কোথাও যেতেন না। ব্যবসার সফরে সিরিয়ায় যাওয়ার সময়ও তিনি ছোট্ট মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, এই শিশুকে ছাড়া তাঁর মন স্থির থাকত না।
আবু তালিব সব সময় তাঁর ভাতিজার নিরাপত্তার দিকে খেয়াল রাখতেন। পরে যখন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুওয়াত লাভ করলেন এবং মক্কার কাফিররা তাঁর বিরোধিতা শুরু করল, তখনও আবু তালিব নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাতিজাকে রক্ষা করেছিলেন।
দাদা মৃদু কণ্ঠে বললেন, দেখো বাচ্চারা, আল্লাহ যখন একটি দরজা বন্ধ করেন, তখন আরেকটি দরজা খুলে দেন। মা চলে গেলেন, দাদা আগলে রাখলেন। দাদা চলে গেলেন, চাচা বুকে টেনে নিলেন। এভাবেই আল্লাহ তাঁর প্রিয়নবীকে ধাপে ধাপে বড় করে তুললেন।
তারপর দাদা সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই গল্প আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। পরিবারের বড়রা আল্লাহর বড় নিয়ামত। দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-ফুফু, মামা-খালা— তাঁদের ভালোবাসার মূল্য দিতে হবে। আর যেসব এতিম শিশু বাবা-মা হারিয়ে একা হয়ে যায়, তাদের প্রতি আমাদের দয়া, স্নেহ ও সহানুভূতি দেখাতে হবে। কারণ, আমাদের প্রিয়নবী নিজেও এতিম ছিলেন এবং তিনি সবসময় এতিমদের ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।
দাদা গল্প শেষ করলেন এই বলে, মনে রেখো, মানুষের প্রকৃত আশ্রয় শুধু মানুষ নয়— সর্বোচ্চ আশ্রয় আল্লাহ। মানুষ চলে যায়, কিন্তু আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না। যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তাঁর জন্য আল্লাহ অবশ্যই উত্তম ব্যবস্থা করে দেন।
নাতি-নাতনিরা চুপচাপ বসে রইল। তাদের মনে আজ আরেকটি শিক্ষা গেঁথে গেল— আল্লাহর পরিকল্পনা সব সময়ই মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক সুন্দর।
দাদা বললেন, আচ্ছা, আজ তাহলে এখানেই শেষ করছি। আগামীকাল তোমাদের শোনাব প্রিয়নবীর জীবনের আরেকটি গল্প।
চলবে....
আইও/