|| আকিদুল ইসলাম সাদী ||
মাগরিবের নামাজ পড়ে উঠোনে চেয়ার পেতে বসে আছেন জহির সাহেব। আকাশভরা তারা। সেদিকে তাকিয়ে তিনি ভাবছেন। তাঁর সাথে বসে আছে কয়েকজন নাতি-নাতনি। তাদের চোখে কৌতূহলের ঝিলিক। দাদার মুখ থেকে তারা গল্প শুনবে।
দাদা গল্প শুরু করলেন।
আজ তোমাদের এমন এক গল্প শোনাব, যে গল্প শুধু একটা মানুষের নয়; পুরো পৃথিবীকে বদলে দেওয়া এক মহান মানুষের আগমনের গল্প। তবে সেই গল্প শুরু করার আগে আমাদের জানতে হবে, তিনি যখন আসেননি, তখন পৃথিবীটা কেমন ছিল।
ছোট নাতিটা জিজ্ঞেস করল, দাদা, তখন কি মানুষ ভালো ছিল না?
দাদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সব মানুষ খারাপ ছিল না দাদু ভাই। কিন্তু সমাজটা ছিল খুব অন্ধকারচ্ছন্ন। ইতিহাসে সেই সময়কে বলা হয়— "আইয়্যামে জাহিলিয়াত, অর্থাৎ অজ্ঞতা আর বর্বরতার যুগ।"
দাদা একটু থামলেন। সবাই মন দিয়ে শুনছে।
—ভাবো তো, বিশাল মরুভূমি। চারদিকে শুধু বালু আর বালু। সেই মরুভূমিতে বাস করত আরবের মানুষ। তারা ছিল সাহসী, অতিথিপরায়ণ আর উদার। অতিথি এলে নিজের শেষ খাবারটুকুও তাকে খাইয়ে দিত। কিন্তু একটা বড় দুঃখ ছিল—তারা তাদের প্রকৃত স্রষ্টা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল।
এক নাতনি অবাক হয়ে বলল, তারা কি আল্লাহকে চিনত না?
দাদা বললেন, একসময় চিনত। হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.) আল্লাহর ইবাদতের জন্য কাবা শরিফ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু বহু বছর পরে মানুষ সেই শিক্ষা ভুলে গেল। কাবাঘরের চারপাশে তারা শত শত মূর্তি বসিয়ে দিল। কেউ পাথর পূজা করত, কেউ গাছ, কেউ সূর্য, কেউ চাঁদ, আবার কেউ নিজের হাতেই মূর্তি বানিয়ে পরে সেটাকেই সিজদা করত। ভাবতে পারো?
নাতিরা বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকাল।
দাদা আবার বলতে লাগলেন, তখন শক্তিশালী মানুষের কথাই ছিল আইন। যার হাতে শক্তি, তার হাতেই বিচার। দুর্বল মানুষের কোনো মূল্য ছিল না। সামান্য একটি বিষয় নিয়ে দুই গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে সেই যুদ্ধ বছরের পর বছর চলতে থাকত। প্রতিশোধ নেওয়াকে তারা গর্বের বিষয় মনে করত।
দাদার কণ্ঠ একটু ভারী হয়ে এল। তিনি বললেন, আর জানো, তখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেত কারা?
সবাই একসঙ্গে বলল, কারা?
দাদা বললেন, মেয়েরা। আজ তোমরা যেভাবে নিজের বোনকে ভালোবাসো, তখন অনেক মানুষ কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জা মনে করত। কেউ কেউ নিষ্ঠুরভাবে নিজের ছোট্ট মেয়েটিকে জীবন্ত মাটির নিচে চাপা দিয়ে দিত। শুধু এই কারণে যে, সে মেয়ে হয়ে জন্মেছে।
দাদার কথা শুনে নাতনিদের চোখ ভিজে উঠল। একজন বলল, দাদা! কেউ কি তাদের বাঁচাত না?
দাদা ধীরে মাথা নাড়লেন, না। খুব কম মানুষই প্রতিবাদ করত। সমাজে অন্যায় যেন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। সুদ, জুয়া, মদ, ব্যভিচার—এসব ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ধনীরা আরও ধনী হতো, গরিবরা আরও অসহায় হয়ে পড়ত। সত্যবাদী আর ন্যায়পরায়ণ মানুষ ছিল হাতে গোনা।
কিছুক্ষণের জন্য সবার মধ্যে নীরবতা নেমে এলো।
তারপর দাদা মুচকি হেসে বললেন, তবে আল্লাহ কখনো পৃথিবীকে পুরোপুরি অন্ধকারে রেখে দেন না। সেই সময়েও কিছু মানুষ ছিলেন, যারা মূর্তিপূজা করতেন না। তারা মনে মনে বলতেন, 'এভাবে তো চলতে পারে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আবার একজন মহান পথপ্রদর্শক পাঠাবেন।'
দাদা আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত ও অনুবাদ করলেন— "আল্লাহই মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। অথচ এর আগে তারা ছিল স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায়।" (সূরা আলে ইমরান: ১৬৪)
নাতিরা চুপচাপ দাদার কথা শুনছে।
দাদা এবার মুখে এক অপূর্ব হাসি ফুটিয়ে বললেন, আর জানো, সেই প্রতীক্ষার শেষ হতে আর বেশি দেরি ছিল না। মরুর বুকে উদিত হতে যাচ্ছিল এমন এক আলোকিত সূর্য, যার আলো শুধু আরবের বালুকণায় নয়, পৃথিবীর প্রতিটি কোণে পৌঁছে যাবে। তিনি মানুষকে শিখিয়ে দেবেন সত্য, ন্যায়, দয়া আর আল্লাহর ইবাদতের পথ।
ছোট্ট নাতিটা উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, দাদা, সেই মানুষটি কে ছিলেন?
দাদা ভালোবাসাভরা চোখে নাতিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, সেই মহান মানুষই হলেন আমাদের প্রিয় নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক— হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! এটি দুরুদ তোমারাও পড়।
নাতিনাতনিরা একসাথে কলকলিয়ে পড়ে ওঠলো, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!
দাদা বললেন, এশার নামাযের সময় হয়ে গেছে, চলো ওঠা যাক। আগামী গল্পে আমরা জানব সেই বরকতময় শিশুর জন্মের কাহিনি— যাঁর আগমনে অন্ধকার পৃথিবী আলোয় ভরে উঠেছিল।
চলবে.....
আইও/