রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬ ।। ১ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮


হাতির বছরের সেই শিশুটি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: এআই

|| আকিদুল ইসলাম সাদী ||

গরমের রাত। উঠোনে মাদুর পেতে বসেছে কয়েকজন নাতি-নাতনি। আকাশভরা তারা, হালকা বাতাস। তারা দাদার জন্য অপেক্ষা করছে।

দাদা আসলেন। চেয়ারে বসে মৃদু হেসে বললেন, দাদুভাইয়েরা, আজ তোমাদেরকে এমন একজন মানুষের জন্মকথা ও বংশ পরিচয়ের গল্প শোনাব, যাঁকে আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। জানো তিনি কে?

সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!

দাদা স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে বললেন, ঠিক বলেছ। কিন্তু জানো, তিনি যখন পৃথিবীতে এলেন, তখন পৃথিবীর অবস্থা কেমন ছিল?

ছোট্ট নাতনি জিজ্ঞেস করল, কেমন ছিল, দাদু?

দাদা একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, চারদিকে ছিল অন্ধকার আর অন্ধকার। মানুষ পাথরের মূর্তিকে উপাস্য বানিয়েছিল। দুর্বল মানুষের ওপর অত্যাচার হতো, অন্যায় ছিল নিত্যদিনের ঘটনা, আর সত্যবাদী মানুষ ছিল খুবই কম। মনে হচ্ছিল, পৃথিবী যেন আলোর অপেক্ষায় আছে।

কিছুক্ষণ থেমে তিনি আবার বললেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করলেন। তিনি মানবজাতির জন্য এক মহা রহমতের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। সেই রহমতের সূচনা হয়েছিল এমন এক বছরে, যেটিকে আজও সবাই "হাতির বছর" নামে চেনে। 

একজন নাতি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, দাদু, হাতির বছর কেন বলা হয়?

দাদা মুচকি হেসে বললেন, শোনো তাহলে সেই কাহিনী। ইয়েমেনের শাসক ছিল এক অহংকারী রাজা—নাম আব্রাহা। সে বিশাল একটি সেনাবাহিনী আর বড় বড় হাতি নিয়ে মক্কায় এসেছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর ঘর কাবা শরিফ ধ্বংস করা। মানুষ খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কারও সেই শক্তিশালী বাহিনীর সামনে দাঁড়ানোর সাহস ছিল না।

নাতিনাতনিদের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। একজন বলল, তারপর কী হলো, দাদু?

দাদা বললেন, তারপর ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। আল্লাহ তাআলা ছোট ছোট পাখির ঝাঁক পাঠালেন। তাদের ঠোঁট আর পায়ে ছিল ছোট ছোট পাথর। সেই পাথরেই ধ্বংস হয়ে গেল আব্রাহার বিশাল বাহিনী। শক্তি আর অহংকার আল্লাহর ক্ষমতার সামনে টিকতে পারল না। এই ঘটনাই কুরআনের সূরা ফীলে বর্ণনা করা হয়েছে।

তিনি একটু থেমে আবেগভরা কণ্ঠে বললেন, আর জানো, সেই হাতির বছরেই পৃথিবীতে জন্ম নিলেন এমন এক শিশু, যিনি একদিন সারা পৃথিবীর মানুষের হৃদয়ের আলো হয়ে ওঠেছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।

সবাই চুপচাপ গল্প শুনছে।

দাদা বললেন, ঐতিহাসিকদের অধিকাংশের মতে, তিনি হাতির বছরের রবিউল আউয়াল মাসের এক সোমবার পবিত্র মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের আগেই তিনি একটি বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হন। তাঁর বাবা, আবদুল্লাহ ইবন আবদুল মুত্তালিব, তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন। তাই পৃথিবীতে আসার আগেই তিনি পিতৃহীন হয়ে যান।

ছোট্ট নাতনি আস্তে করে বলল, তাহলে তিনি কি বাবাকে কোনো দিন দেখতেই পারেননি?

দাদা মাথা নেড়ে বললেন, না দাদুভাই, পারেননি। তবে আল্লাহ তাঁর জন্য একজন স্নেহময়ী মা দিয়েছিলেন। তাঁর নাম ছিল আমিনা বিনতে ওহাব। তিনি ছিলেন অত্যন্ত পবিত্র চরিত্রের একজন নারী। তিনি তাঁর ছোট্ট সন্তানকে বুকের সব ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতে চেয়েছিলেন।

দাদা আবার বলতে লাগলেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্মেছিলেন আরবের সবচেয়ে সম্মানিত কুরাইশ গোত্রের বানু হাশিম পরিবারে। তাঁর দাদা ছিলেন কাবা শরিফের তত্ত্বাবধায়ক ও মক্কার সম্মানিত নেতা আবদুল মুত্তালিব। আর তাঁর বংশধারা গিয়ে মিলেছে মহান নবী ইবরাহিম (আ.)-এর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর সঙ্গে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এমন এক সম্মানিত ও পবিত্র বংশে জন্ম দিয়েছিলেন, যাতে তাঁর সত্যবাদিতা ও মর্যাদা নিয়ে কারও প্রশ্ন তোলার সুযোগ না থাকে।

নাতিদের একজন বলল, দাদু, তখন কি মানুষ বুঝতে পেরেছিল এই শিশুই একদিন নবী হবেন?

দাদা মৃদু হেসে বললেন, না, তখন কেউ তা জানত না। সবাই তাঁকে একটি সাধারণ শিশু হিসেবেই দেখেছিল। তবে কিছু মানুষ পূর্বের কিতাবে উল্লেখিত নিদর্শনাবলী দেখে বুঝতে পেরেছিলেন এই ছোট্ট শিশুই একদিন মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের ডাক দেবেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাবেন, সত্য, দয়া, সততা ও মানবতার শিক্ষা দেবেন।

জন্মের পর সেই শিশুটির নাম রাখা হলো "মুহাম্মাদ"— অর্থাৎ "অত্যন্ত প্রশংসিত"। তখন যদিও কেউ জানত না, একদিন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এই নাম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর দরুদ-সালামের সঙ্গে উচ্চারণ করবে। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর নাম মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।

দাদা এবার নাতি-নাতনিদের দিকে তাকালেন। বললেন, আজকের গল্প থেকে আমরা কী শিখলাম জানো?

সবাই চুপ।

দাদা বললেন, আল্লাহ যখন কোনো মহান কাজের ইচ্ছা করেন, তখন তিনি তার জন্য আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রাখেন। অন্ধকার যতই গভীর হোক, আল্লাহর পাঠানো আলোর সামনে তা টিকে থাকতে পারে না। আর আমাদের প্রিয় নবীর জন্ম ছিল সেই আলোর সূচনা, যা আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয় আলোকিত করে চলেছে।

নাতি-নাতনিরা মুগ্ধ হয়ে দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারা জানত, আগামী রাতেও দাদা তাদের এই অসাধারণ মানুষের জীবনের আরেকটি গল্প শোনাবেন। সেজন্য তাদের অপেক্ষা করতে হবে।

চলবে....

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ