রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬ ।। ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ ।। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮


যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে ঘর, বৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছে গাজাবাসীর শেষ আশ্রয়টুকুও!

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজার উত্তরাঞ্চলের আল-মিনা শরণার্থী শিবির। রাতভর বৃষ্টিতে ডুবে গেছে ২৯ বছর বয়সী রানা আদনান হমেইদার তাঁবু। ভিজে গেছে বিছানাপত্র, কম্বল ও পরিবারের সবার কাপড়চোপড়। প্রবল ঠান্ডায় কাঁপছে তাঁর সন্তানরা। কোলে মাত্র দুই মাস বয়সী শিশুকন্যা। এক হাতে শিশুটিকে আগলে রেখে অন্য হাতে তাঁবুতে ঢোকা পানি ঠেকানোর চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু বৃষ্টির পানি আর ঝোড়ো বাতাসের সঙ্গে পেরে উঠছেন না।

গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর বাস্তুচ্যুত এই পরিবারগুলোর জন্য এটি চতুর্থ শীতকাল। ঘরবাড়ি হারিয়ে তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলোর কাছে শীত মানেই নতুন দুর্ভোগ। এবার ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া সেই দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কোথাও তাঁবু ভেঙে পড়ছে, কোথাও বৃষ্টির পানিতে ডুবে যাচ্ছে আশ্রয়স্থল। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেঁচে থাকা মানুষগুলো এখন প্রকৃতির বৈরিতার সঙ্গেও লড়ছেন।

আল-জাজিরাকে রানা হমেইদা বলেন, ‘মধ্যরাত থেকে আমরা জেগে বসে আছি। তাঁবুর ভেতরে পানি ঢুকে বিছানাপত্র, কম্বল—সবকিছু ভিজে গেছে। সকালে দেখি, আমার ছেলে ও ছোট মেয়েটি ঠান্ডায় কাঁপছে। দুই মাসের শিশুটিও প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিল।’

তিনি বলেন, ‘আমি কী করব? সন্তানদের আগলে রাখব, নাকি পানি ঠেকানোর চেষ্টা করব? ছোট মেয়েটিকে কোলে নিয়ে উষ্ণ রাখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পানি ঢোকা বন্ধ হচ্ছিল না। বাতাস এতটাই প্রবল ছিল যে মনে হচ্ছিল, তাঁবুটি বুঝি মাটি থেকে উপড়ে নিয়ে যাবে।’

তাঁর স্বামী ৩০ বছর বয়সী সামেহ হমেইদা জানান, সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়ায় তাঁদের তাঁবুটি ঝড়ের সরাসরি কবলে পড়েছে। অথচ তাঁবুতে এমন কোনো ত্রিপল বা তাপ নিরোধক উপকরণ নেই, যা প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে পরিবারটিকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।

এক রাতের ঝড়েই নিঃস্ব বহু পরিবার

গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে গাজার বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। শনিবারের বৃষ্টিতে কয়েকটি শিবিরে পানির উচ্চতা ৩০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা শত শত সহায়তার ফোন পেয়েছে।

আল-মিনা শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি পরিবারের বসবাস। বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়েছে বহু তাঁবুতে। শিবিরের মাটি পরিণত হয়েছে কাদাপানির জলাশয়ে।

৪০ বছর বয়সী রায়েদ আবু আমশার পরিবারের ওপর ঝড়ের সময় তাঁবু ভেঙে পড়ে। নিজের সন্তানদের পাশাপাশি প্রয়াত ভাইয়ের চার সন্তানসহ মোট নয় শিশুর দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। ঝড়ে সবার কাপড় ও কম্বল ভিজে গেছে।

তিনি বলেন, ‘নিজের সন্তানদের পাশাপাশি এতিম শিশুদেরও দেখাশোনার দায়িত্ব আমার। কিন্তু তাদের প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য আমার নেই। মাত্র দুই ঘণ্টার ঝড় আমাদের কী অবস্থায় ফেলেছে, দেখুন। আমাদের তাঁবু, ত্রিপল এবং শিশুদের সুরক্ষার জন্য যেকোনো ধরনের উপকরণ প্রয়োজন। এভাবে আর কত দিন আমাদের বেঁচে থাকতে হবে?’

ধসে পড়ার শঙ্কায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনও

শুধু তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া মানুষ নয়, গাজার ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর দুর্ভোগও বেড়েছে। মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে বৃষ্টির কারণে পুরোনো ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবনগুলোতে নতুন করে ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

৫৪ বছর বয়সী নাসের আল-হাজ্জ থাকেন এমনই একটি বহুতল ভবনে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওপরের তলাগুলোর ধ্বংসাবশেষ তাঁর বাসার ওপর পড়ে ছাদে বড় গর্ত তৈরি করেছে। বৃষ্টি হলেই সেই গর্ত দিয়ে ঘরে পানি ঢোকে।

ছাদটি ঠেকা দিয়ে মজবুত করার চেষ্টা করা হলেও একজন প্রকৌশলী তাঁকে ভবনটি বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করেছেন। সর্বশেষ ঝড়ের সময় সন্তানদের নিয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয় তাঁকে। তাঁর দুই সন্তান অটিজমে আক্রান্ত। তারা ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ থেকে দূরে নিরাপত্তাকর্মীদের কক্ষে ঘুমায়।

আল-জাজিরাকে নাসের আল-হাজ্জ বলেন, ‘আমি এমন একটি জায়গায় থাকতে বাধ্য হচ্ছি, যেটি যেকোনো মুহূর্তে আমাদের মাথার ওপর ধসে পড়তে পারে। কিন্তু যাব কোথায়? বাড়িভাড়া অনেক বেশি। তাঁবুও তো নিরাপদ নয়। জানি, জায়গাটি কতটা বিপজ্জনক। কিন্তু আমার আর কোনো উপায় নেই।’

বন্যার ঝুঁকিতে ৯ লাখ ৫০ হাজার বাস্তুচ্যুত

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দফতর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, গাজায় বাস্তুচ্যুত প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন। এর মধ্যে চার লাখের বেশি মানুষ রয়েছেন বন্যার উচ্চ ঝুঁকিতে। বিশেষ করে নিচু ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক।

এ ছাড়া প্রায় ৪৪ হাজার ফিলিস্তিনি কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাস করছেন। ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গাজাজুড়ে চার হাজারের বেশি ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ভেঙে ফেলা প্রয়োজন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শীতের আগে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার ২৫০টি পরিবারের আশ্রয় সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে মজুত থাকা সহায়তা উপকরণ দিয়ে এই চাহিদার মাত্র ১৮ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব।

অচল নিষ্কাশনব্যবস্থা, বাড়ছে জলাবদ্ধতা

ঝড় ও বৃষ্টির পানি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে গাজার পৌর কর্তৃপক্ষও। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১৫ কিলোমিটার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নালা এবং ২১২ কিলোমিটার পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক। আটটি পানি নিষ্কাশন পাম্প স্টেশন এবং বৃষ্টির পানি সংগ্রহের তিনটি প্রধান জলাধারও অচল হয়ে পড়েছে।

গাজা পৌরসভার মুখপাত্র হোসনি মুহান্না জানান, সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বর্তমানে সচল নিষ্কাশনব্যবস্থার মাধ্যমে মোট বৃষ্টির পানির সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অপসারণ করা সম্ভব।

তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে পানি নিষ্কাশনের নালাগুলো পরিষ্কারের কাজ চলছে। পৌরসভার কর্মীরা নালা ও ম্যানহোল পরিষ্কার, আবর্জনা অপসারণ, ক্ষতিগ্রস্ত নিষ্কাশন লাইন মেরামত এবং পাম্প সচল রাখার চেষ্টা করছেন। তবে জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশের সংকটের কারণে এসব উদ্যোগে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

মুহান্না জানান, শুধু গাজা সিটিতেই দুই হাজারের বেশি ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শহরটিতে ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ আড়াই কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে।

এদিকে বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনাকারী কমিটিগুলোও আশ্রয় উপকরণের সংকটে পড়েছে। নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের জরুরি কমিটির কর্মকর্তা আদলি আওয়াদ জানান, বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁবু ও ত্রিপল বিতরণের চেষ্টা করছেন তাঁরা। পাশাপাশি তাঁবুর চারপাশে পানি নিষ্কাশনের নালা খননেও পরিবারগুলোকে সহায়তা করা হচ্ছে। কিন্তু সহায়তার প্রয়োজন এমন মানুষের সংখ্যা মজুত উপকরণের তুলনায় অনেক বেশি।

আওয়াদ বলেন, তাঁরা যত বেশি সম্ভব তাঁবু ও ত্রিপল দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যাতে বৃষ্টির পানি তাঁবুতে ঢুকতে না পারে এবং জলাবদ্ধতা কমানো যায়।

যুদ্ধের আঘাতে ঘরবাড়ি হারানো গাজার মানুষের কাছে আশ্রয় নেওয়ার মতো নিরাপদ জায়গা এখনো অনিশ্চিত। ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়ানো তাঁবুগুলোও বৃষ্টি ও ঝড়ে টিকতে পারছে না। দুই মাসের শিশুকে বুকে আগলে রাখা রানা হমেইদার মতো হাজারো মায়ের কাছে এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা—কীভাবে সন্তানদের এই শীত থেকে বাঁচাবেন।

সূত্র: আল-জাজিরা

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ