কওমি মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার প্রতিরোধ, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা এবং শিশু নির্যাতনসহ সব ধরনের অনিয়ম বন্ধে ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করেছে ইসলামী আইন সংরক্ষণ পরিষদ। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাধীন তদন্ত সেল গঠন, ২৪ ঘণ্টার হটলাইন চালু, শিশু সুরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন, শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা যাচাই, বালিকা মাদরাসার নিরাপত্তা এবং মাদরাসাগুলোকে নিবন্ধন ও জবাবদিহির আওতায় আনা।
রোববার (১ নভেম্বর) দুপুর ২টায় রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ‘কওমি মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার প্রতিরোধ, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা এবং সমকালীন আদর্শিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উলামায়ে কেরামের ভূমিকা’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করে ইসলামী আইন সংরক্ষণ পরিষদ।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মুফতী বশিরুল্লাহ। প্রধান অতিথি ছিলেন মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী বলেন, ওলামায়ে কেরাম জাতির আস্থার জায়গা। তাঁদের মূল দায়িত্ব জাতির ঈমান-আকিদা সংরক্ষণ এবং ইসলামী আদর্শ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কওমি মাদরাসা ও দ্বীনি শিক্ষার ওপর সাম্প্রতিক অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আলেমদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি মাদরাসার পবিত্রতা রক্ষায় শিশু নির্যাতনসহ যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
সভায় সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম কাসেমী ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এতে কওমি মাদরাসা ও দ্বীনি শিক্ষার ওপর সাম্প্রতিক অপপ্রচারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো শিক্ষাব্যবস্থা বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়। তবে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম কিংবা শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।
ঘোষণাপত্রে ছয় দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—আল-হাইআতুল উলয়া ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কওমি মাদরাসা বোর্ডগুলোর অধীনে অভিজ্ঞ আলেম ও আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে স্বাধীন তদন্ত সেল গঠন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
এ ছাড়া ভুক্তভোগীদের পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানানোর জন্য ২৪ ঘণ্টার হটলাইন চালু এবং তাঁদের আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসনব্যবস্থা নিরাপদ করা, শিশু সুরক্ষায় সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনেরও দাবি জানানো হয়।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নৈতিক চরিত্র, পেশাগত দক্ষতা ও শিশু মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বালিকা মাদরাসায় নারী প্রশাসক নিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি বহিরাগতদের প্রবেশে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়। অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত মাদরাসাগুলোকে জাতীয় শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধন এবং জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও বলা হয়।
ঘোষণাপত্রে জন্মগত শারীরিক ভিন্নতা (ইন্টারসেক্স/হিজড়া) এবং ট্রান্সজেন্ডার ধারণার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে অনুধাবনের আহ্বান জানানো হয়। ইন্টারসেক্স বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাকে মানবিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে এ বিষয়ে আলেম ও আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি গবেষণা কমিটি গঠনের আহ্বান জানানো হয়।
সভায় মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যেকোনো অনিয়ম ও অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়। গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বজায় রাখা এবং সরকারকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আলেম-উলামাদের অহেতুক হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সভাপতির বক্তব্যে মুফতী বশিরুল্লাহ বলেন, বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো কওমি শিক্ষাব্যবস্থা বা দ্বীনি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়। একইভাবে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম কিংবা শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ারও সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, মাদরাসা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষায় স্বাধীন তদন্ত সেল গঠন, ২৪ ঘণ্টার হটলাইন চালু, শিশু সুরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ জরুরি। পাশাপাশি হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের নির্বাহী সভাপতি মুফতী আব্দুল্লাহ ইয়াহইয়া। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সহসভাপতি মুফতী মাহফুজুর রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আফসার মাহমুদ।
এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ, মাওলানা যায়নুল আবেদীন, মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মুফতী কিফায়াতুল্লাহ আজহারী, মুফতী জাবের হুসাইন কাসেমী, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, মাওলানা মুস্তাকীম বিল্লাহ হামিদী, মাওলানা ইয়াসিন আরাফাত, মুফতী মাহমুদুর রহমান, মুফতী শামসুল আলম, মুফতী ওয়াজেদ আলী, মুফতী হুসাইন মুহাম্মদ সোহরাব, মুফতী জুনাঈদ আইয়ূবী, মুফতী তানভীর আহমদ সিদ্দিকী, মুফতী আনোয়ারুল হক, মুফতী হামীদুল হক, মাওলানা আব্দুল্লাহ ফিরুজ, মুফতী জুবায়ের রশীদ, মাওলানা আ. ফ. ম. আকরান হুসাইন, মুফতী আনিসুর রহমান, মুফতী সুলতান আহমাদ জাফরী, মুফতী আঞ্জুম হাসান, মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মাসঊদ খান, মাওলানা এহতেশেমুল হক সাখী, মাওলানা সানাউল্লাহ, মাওলানা আবু রাহাত কামাল ও মুফতী যুবাইর আহমাদ ভৈরবীসহ দেশের বিশিষ্ট আলেম-উলামারা।
এসএইচ/