নিজস্ব প্রতিবেদক
গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের সমর্থনে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে যে গণরায় এসেছে, তা কার্যকর না করে সরকার জনগণের সঙ্গে গাদ্দারি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে সংবিধান সংশোধনের নামে দুর্বল পরিবর্তন নয়, বরং জুলাই সনদের আলোকে স্থায়ী ও কাঠামোগত সংবিধান সংস্কার করতে হবে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আড়াইহাজার থানা শাখার উদ্যোগে গণভোটের রায় কার্যকর ও নাগরিক সংকট সমাধানের দাবিতে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সংবিধান সংস্কার ছিল বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার অন্যতম প্রধান দাবি। এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই দলটি জনগণের ভোট ও রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন করেছিল। অথচ এখন সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন ও সংবিধান সংস্কার এক বিষয় নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা হলেও ভবিষ্যতে আদালত বা নতুন সরকারের মাধ্যমে তা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনে প্রয়োজন স্থায়ী ও কাঠামোগত সংস্কার।
তিনি আরও বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর ৩৩টি রাজনৈতিক দল দীর্ঘ নয় মাসে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ৮৩টি অধিবেশনে অংশ নিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। সেই ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন এবং গণভোটের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল দুটি ভিন্ন উদ্দেশ্যের নির্বাচন। সংসদ নির্বাচন ছিল সরকার গঠনের জন্য, আর গণভোট ছিল রাষ্ট্র মেরামতের জন্য। জনগণের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে এর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল।
বিএনপির সংসদ সদস্যদের সমালোচনা করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এর মাধ্যমে গণভোটে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে দেওয়া জনগণের রায় উপেক্ষা করা হয়েছে। সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিলে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের প্রয়োজন হবে না। তবে জনগণের ভোটাধিকার ও গণরায় অবজ্ঞা করা হলে অতীতের স্বৈরাচারী শাসকদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাই সনদের আলোকে সংস্কার হলে প্রধানমন্ত্রীর হাতে এককভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং প্রশাসন ও পুলিশকে দলীয়করণমুক্ত করতে হবে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের জন্য পৃথক বিচারব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সবার জন্য সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ তুলে মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাসী। আড়াইহাজারে নাগরিক সমাবেশের যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া হলেও একজন সংসদ সদস্যের নির্দেশে প্রশাসন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বৈষম্য অব্যাহত থাকলে দেশে আবারও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও গণবিপ্লবের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। মামুনুল হক বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে সংকটের মুখে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটে কারখানাগুলোর উৎপাদন কমছে, অথচ উৎপাদন ব্যয় কমছে না। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ শিল্পকে রক্ষা করতে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা, জ্বালানিসংকটের সমাধান এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে কার্যকর সংস্কার জরুরি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য দূর করার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কারও সঙ্গে আপস করবে না।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের ওপর নেতাগিরি করবেন না; বরং জনগণের সেবা ও খেদমত করবেন। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন ও মাওলানা তোফাজ্জল হুসাইন মিয়াজি, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান হেলাল এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি মাওলানা উবায়দুল কাদের নদভী।
এ সময় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারায়ণগঞ্জ জেলা ও আড়াইহাজার থানা শাখার নেতারা, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় জনগণ উপস্থিত ছিলেন।
এসএইচ/