লাইফস্টাইল ডেস্ক
সকালে ঘুম ভাঙতেই মোবাইল হাতে নেওয়া, একটু পরপর ফেসবুকের নোটিফিকেশন দেখা, অবসরে রিলস কিংবা শর্ট ভিডিও স্ক্রল করা—আধুনিক জীবনে অনেকেরই নিত্যদিনের অভ্যাস। প্রয়োজনীয় কাজের জন্য ফোন হাতে নিলেও কখন যে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিংয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও ফোন যেন হাতছাড়া হতে চায় না।
স্মার্টফোন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। যোগাযোগ, শিক্ষা, সংবাদ, কর্মজীবন ও বিনোদনের ক্ষেত্রে এটি এখন অপরিহার্য। কিন্তু এর ব্যবহার যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়, মনোযোগ ও সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোন ব্যবহারের কারণে ঘুম, পড়াশোনা, কাজ কিংবা পারিবারিক জীবনে ব্যাঘাত ঘটলে ব্যবহারের ধরন পরিবর্তন করা জরুরি।
কখন বুঝবেন ফোনের ব্যবহার আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে?
স্মার্টফোন ব্যবহার করলেই আসক্তি বলা যায় না। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। যেমন—
- প্রয়োজন না থাকলেও বারবার ফোন হাতে নেওয়া।
- অল্প সময় ব্যবহারের পরিকল্পনা করেও দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেওয়া।
- ফোন ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়া।
- ফোন কাছে না থাকলে অস্থিরতা বা বিরক্তি অনুভব করা।
- পড়াশোনা, কাজ কিংবা ঘুমের সময় ফোন ব্যবহারের কারণে নষ্ট হওয়া।
- পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে ফোনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
ফোনের ব্যবহার যখন দৈনন্দিন জীবন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও মানসিক সুস্থতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন তা সমস্যাজনক ব্যবহারের পর্যায়ে যেতে পারে।
স্মার্টফোনের আসক্তি থেকে মুক্তির ৭ উপায়
১. প্রথমে নিজের ফোন ব্যবহারের হিসাব জানুন
স্মার্টফোনের ব্যবহার কমানোর প্রথম ধাপ হলো নিজের অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া। প্রতিদিন কত ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করছেন, কোন অ্যাপ সবচেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে এবং কোন সময়ে ফোন ব্যবহারের প্রবণতা বেশি—এসব তথ্য জানা জরুরি।
অ্যান্ড্রয়েডের Digital Wellbeing কিংবা আইফোনের Screen Time ফিচার ব্যবহার করে দৈনিক স্ক্রিন টাইম ও অ্যাপ ব্যবহারের হিসাব দেখা যায়। কয়েক দিন এই হিসাব পর্যবেক্ষণ করলে নিজের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের জায়গাগুলো শনাক্ত করা সহজ হবে।
২. অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন
ফোনে প্রতিনিয়ত নোটিফিকেশন আসা মনোযোগ নষ্ট করার অন্যতম কারণ। একটি বার্তা কিংবা ভিডিওর নোটিফিকেশন দেখতে গিয়ে অনেকেই অন্য কাজে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন।
তাই জরুরি কল ও প্রয়োজনীয় বার্তা ছাড়া অন্য অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা যেতে পারে। বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করলে বারবার ফোন দেখার প্রবণতা কমে।
৩. ফোন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন
ফোন একেবারে বাদ দেওয়া অনেকের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। পড়াশোনা, কাজ ও যোগাযোগে স্মার্টফোনের ব্যবহার প্রয়োজন। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো।
দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করুন। কাজ শেষ হওয়ার পর কিংবা অবসর সময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফেসবুক বা ইউটিউব ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে অ্যাপের টাইমার ব্যবহার করুন এবং নির্ধারিত সময় শেষ হলে অ্যাপ থেকে বেরিয়ে আসুন।
৪. ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করুন
রাতে ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার অনেকের ঘুমের সময় পিছিয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রলিং, ভিডিও দেখা কিংবা বার্তা আদান-প্রদান ঘুমের প্রস্তুতিতে বাধা দিতে পারে।
National Sleep Foundation-এর বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঘুমের আগে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার ঘুমের সময় ও মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ জন্য ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করুন। বিছানায় ফোন নিয়ে যাবেন না, অন্য জায়গায় চার্জে রাখুন এবং ঘুমের আগে বই পড়া কিংবা শান্ত পরিবেশে সময় কাটানোর অভ্যাস করুন।
৫. ফোনের পরিবর্তে বিকল্প অভ্যাস গড়ে তুলুন
শুধু ফোন ব্যবহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না; অবসর সময় কীভাবে কাটাবেন, সেটিও ঠিক করতে হবে। একঘেয়েমি, একাকিত্ব কিংবা মানসিক চাপের সময় অনেকেই ফোনের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
ফোন ব্যবহারের পরিবর্তে বই পড়ুন, হাঁটাহাঁটি করুন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প করুন কিংবা নিজের পছন্দের কোনো কাজে সময় দিন। নতুন কোনো দক্ষতা শেখার চেষ্টা করলেও অপ্রয়োজনীয় ফোন ব্যবহার কমানো সহজ হতে পারে।
৬. খাবার, পড়াশোনা ও নামাজের সময় ফোন দূরে রাখুন
কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়ার সময় ফোন পাশে থাকলে বারবার সেটি দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তাই খাবার গ্রহণ, পড়াশোনা, অফিসের কাজ, পারিবারিক আলোচনা কিংবা নামাজের সময় ফোন দূরে রাখা ভালো।
বিশেষ করে পড়াশোনার সময় ফোন অন্য ঘরে রাখা কিংবা Focus Mode চালু করলে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হতে পারে। পরিবারের সবাই মিলে খাবারের সময় ফোন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন।
৭. একবারে সব বন্ধ নয়, ধীরে ধীরে কমান
অনেকেই স্মার্টফোনের ব্যবহার কমাতে গিয়ে একদিনেই সব অ্যাপ বন্ধ করে দেন। কিন্তু কিছুদিন পর আবার আগের অভ্যাসে ফিরে যান। তাই ধীরে ধীরে ব্যবহার কমানো অধিক বাস্তবসম্মত হতে পারে।
ছোট ছোট পরিবর্তন নিয়মিত চালিয়ে যাওয়াই দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।
প্রযুক্তি থাকবে, নিয়ন্ত্রণ থাকবে নিজের হাতে
স্মার্টফোন আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। এটি আমাদের জ্ঞান অর্জন, যোগাযোগ, কর্মজীবন ও দৈনন্দিন কাজকে সহজ করেছে। তাই স্মার্টফোন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই প্রয়োজন।
প্রযুক্তির ব্যবহার তখনই সুন্দর, যখন তা আমাদের জীবনকে সহজ করে; জীবন থেকে সময়, মনোযোগ ও সম্পর্ক কেড়ে নেয় না। ফোনের স্ক্রিনে কত সময় কাটালাম, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই সময়ের বিনিময়ে জীবনের কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো হারিয়ে ফেলছি।
নিজের ব্যবহারের প্রতি সচেতনতা, নির্দিষ্ট সময়সীমা, বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস—এসবের সমন্বয়ে স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
মনে রাখতে হবে, স্মার্টফোন আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আমরা স্মার্টফোনের নিয়ন্ত্রণে নয়।
তথ্যসূত্র
হার্ভার্ড টি. এইচ. চান স্কুল অব পাবলিক হেলথ
ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন
এসএইচ/