আওয়ার ইসলাম ডেস্ক
ভাগ্যে যা লেখা আছে, তা-ই যদি হয়, তাহলে মানুষের চেষ্টা ও সাধনার প্রয়োজন কী? তাকদির সম্পর্কে এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই আসে। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, তাকদিরে বিশ্বাস করা এবং নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া—দুটিই একজন মুমিনের দায়িত্ব।
ইসলামি আকিদার অন্যতম মৌলিক বিষয় হলো তাকদিরে বিশ্বাস। ঈমানের ছয়টি মূল বিষয়ের একটি এটি। তবে তাকদির ও মানুষের চেষ্টা-সাধনার সম্পর্ক নিয়ে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ মনে করেন, সবকিছু যখন আগে থেকেই নির্ধারিত, তখন চেষ্টা করে লাভ কী! আবার কেউ মনে করেন, মানুষ নিজের ইচ্ছা ও কাজের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন। অথচ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা এ দুই ধারণার মধ্যবর্তী ও ভারসাম্যপূর্ণ।
তাকদিরের সঠিক ধারণা মানুষকে কর্মবিমুখ করে না; বরং চেষ্টা, পরিশ্রম, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং ফলাফলে সন্তুষ্ট থাকার শিক্ষা দেয়। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক।
তাকদির সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহর আকিদা
তাকদিরের বিষয়ে ইতিহাসে দুটি ভ্রান্ত মতবাদ দেখা গেছে। একটি হলো জাবারিয়া। তাদের ধারণা, মানুষ নিজের কাজের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বাধ্য; তার কোনো ইচ্ছা বা স্বাধীনতা নেই। অন্যটি কাদারিয়া। তাদের ধারণা, মানুষের কাজকর্ম আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত তাকদিরের বাইরে এবং মানুষ নিজেই নিজের কাজের স্রষ্টা।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশ্বাস হলো, মানুষ সম্পূর্ণ বাধ্যও নয়, আবার আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে স্বাধীনও নয়। আল্লাহ তাআলা মানুষকে ইচ্ছা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজ করার সামর্থ্য দিয়েছেন। মানুষ নিজের ইচ্ছায় ভালো-মন্দ কাজ বেছে নেয়। এ কারণেই সে তার কাজের জন্য দায়িত্বশীল এবং পরকালে প্রতিদান কিংবা শাস্তির মুখোমুখি হবে। তবে মানুষের ইচ্ছা, ক্ষমতা ও কাজ—সবই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন।
তাকদিরে লেখা থাকলে চেষ্টা কেন?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, আল্লাহ তাআলা যদি আগে থেকেই জানেন কে কী করবে এবং কার ভাগ্যে কী রয়েছে, তাহলে মানুষের চেষ্টা করার প্রয়োজন কী?
এর উত্তর হলো, আল্লাহ তাআলার জ্ঞান অনাদি ও সর্বব্যাপী। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সবকিছুই তাঁর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ ভবিষ্যতে নিজের ইচ্ছায় কী সিদ্ধান্ত নেবে, কী কাজ করবে এবং কোন পথ বেছে নেবে—সবই আল্লাহ তাআলা আগে থেকেই জানেন। তাঁর এই জ্ঞানের ভিত্তিতে সবকিছু লওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
তবে আল্লাহ আগে থেকে জানেন ও লিখে রেখেছেন বলেই মানুষ বাধ্য হয়ে কাজটি করে—বিষয়টি এমন নয়। মানুষ নিজের ইচ্ছায় যে কাজ করবে, আল্লাহ তাআলা তা আগে থেকেই জানেন।
বিষয়টি বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক তাঁর কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনার প্রতি অবহেলা দেখে ধারণা করতে পারেন, সে পরীক্ষায় ভালো করবে না। পরে শিক্ষার্থীটি সত্যিই খারাপ ফল করল। শিক্ষকের আগের ধারণার কারণে সে খারাপ ফল করেনি; বরং নিজের অবহেলার কারণেই করেছে। তবে মনে রাখতে হবে, মানুষের অনুমান সীমিত ও ভুল হতে পারে, আর আল্লাহ তাআলার জ্ঞান পরিপূর্ণ, নির্ভুল ও অনাদি। তাই উদাহরণটি শুধু পূর্বজ্ঞান ও বাধ্যবাধকতার পার্থক্য বোঝার জন্য।
চেষ্টা ও পরিণতি—দুটিই তাকদিরের অন্তর্ভুক্ত
তাকদিরের অর্থ শুধু মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারিত থাকা নয়; বরং সেই পরিণতিতে পৌঁছানোর উপায়, মাধ্যম ও মানুষের চেষ্টা-সাধনাও আল্লাহর জ্ঞান ও তাকদিরের অন্তর্ভুক্ত।
যেমন, কারও রিজিকের পরিমাণ নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, সে ঘরে বসে থাকলেও কোনো চেষ্টা ছাড়াই তার কাছে সম্পদ চলে আসবে। বরং উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করা, ব্যবসা করা কিংবা চাকরি খোঁজার মতো মাধ্যম গ্রহণ করাও তাকদিরের অংশ। আল্লাহ তাআলা এসব মাধ্যমের সাহায্যেই তাঁর বান্দাকে রিজিক দান করেন।
অতএব, তাকদিরে বিশ্বাস করে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং বৈধ উপায় অবলম্বন করে সর্বোচ্চ চেষ্টা করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
মানুষের চেষ্টার গুরুত্ব সম্পর্কে কোরআনের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষের চেষ্টা ও কর্মের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ
‘আর মানুষ তা-ই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে।’ (সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩৯)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সূরা আর-রাদ, আয়াত: ১১)
এ আয়াতগুলো মানুষকে চেষ্টা, আত্মশুদ্ধি ও কর্মতৎপরতার শিক্ষা দেয়। একই সঙ্গে কোরআনে মানুষের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَمَن شَاءَ فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاءَ فَلْيَكْفُرْ
‘অতএব যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক, আর যার ইচ্ছা সে কুফরি করুক।’ (সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ২৯)
অর্থাৎ মানুষকে ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে তার ইচ্ছাও আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার অধীন।
তাকদিরের ওপর ভরসা করে আমল ছেড়ে দেওয়া যাবে না
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন।
হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের জানালেন, প্রত্যেক মানুষের জান্নাত কিংবা জাহান্নামের স্থান নির্ধারিত রয়েছে। তখন সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! তাহলে কি আমরা আমাদের তাকদিরের ওপর নির্ভর করে আমল করা ছেড়ে দেব?
তিনি বললেন,
«اعْمَلُوا فَكُلٌّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ»
‘না, বরং তোমরা আমল করতে থাকো। কারণ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছে, সে পথ সহজ করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৪৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৪৭)
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরা আল-লাইলের ৫-১০ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করেন। এসব আয়াতে দানশীলতা, তাকওয়া ও সত্যকে গ্রহণ করার বিনিময়ে কল্যাণের পথ সহজ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, তাকদিরের অজুহাতে আমল ছেড়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। বরং মানুষের দায়িত্ব হলো নেক আমল ও সৎকাজে অব্যাহত থাকা।
তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়
তাকদির ও চেষ্টার সম্পর্ক বোঝার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাওয়াক্কুল। আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ গ্রহণ না করে বসে থাকা নয়। বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ»
‘উটটি বেঁধে রাখো, এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৭)
অর্থাৎ একজন মানুষকে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। উটের মালিক যেমন উটের রশি বেঁধে রাখবে, তেমনি একজন শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা করতে হবে, ব্যবসায়ীকে ব্যবসার জন্য পরিশ্রম করতে হবে এবং অসুস্থ ব্যক্তিকে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। এরপর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে।
এক তাকদির থেকে অন্য তাকদিরে যাওয়া
তাকদিরের বিষয়ে হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি ঘটনা বিশেষভাবে শিক্ষণীয়।
সিরিয়ায় প্লেগ মহামারি ছড়িয়ে পড়লে হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেখানে প্রবেশ না করে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন আবু উবাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে প্রশ্ন করেন, আপনি কি আল্লাহর তাকদির থেকে পালাচ্ছেন?
জবাবে হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
«نَفِرُّ مِنْ قَدَرِ اللَّهِ إِلَى قَدَرِ اللَّهِ»
‘আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে আল্লাহর অপর তাকদিরের দিকে পালাচ্ছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭২৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২১৯)
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বিপদ থেকে বাঁচার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করাও তাকদিরের বাইরে নয়। বরং আল্লাহ তাআলা বিপদ থেকে বাঁচার জন্য যে উপায়গুলো দিয়েছেন, সেগুলো গ্রহণ করাও মানুষের দায়িত্ব।
জীবনে তাকদির ও চেষ্টার ভারসাম্য যেভাবে রাখবেন
একজন মুমিনের জীবনে তাকদিরের বিশ্বাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। প্রথমত, কাজ শুরু করার আগে তাকে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চেষ্টা শেষে ফলাফল যা-ই আসুক, আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
পরীক্ষায় ভালো ফল করতে চাইলে নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে। ব্যবসায় সফল হতে চাইলে পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। এসবই মানুষের দায়িত্ব।
কিন্তু সব চেষ্টা করার পরও প্রত্যাশিত ফল না এলে হতাশ হয়ে পড়া উচিত নয়। তখন আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থেকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«احْرِصْ عَلَىٰ مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ، وَلَا تَعْجَزْ»
‘যা তোমার উপকারে আসে, তার জন্য সচেষ্ট হও। আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)
একই হাদিসের শেষাংশে তিনি আরও শিখিয়েছেন, কোনো বিপদ ঘটলে ‘যদি এমন করতাম, তাহলে এমন হতো’—এভাবে আক্ষেপ না করে বলতে হবে—
«قَدَّرَ اللَّهُ وَمَا شَاءَ فَعَلَ»
‘আল্লাহ তাকদিরে যা রেখেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন, তা-ই করেছেন।’
তাকদিরে বিশ্বাস মানুষকে অলস, কর্মবিমুখ কিংবা হতাশ করে না। বরং এটি মানুষকে চেষ্টা করতে শেখায়, ব্যর্থতায় ধৈর্য ধারণ করতে শেখায় এবং সফলতায় অহংকার থেকে রক্ষা করে। একজন মুমিন জানেন, চেষ্টা করা তাঁর দায়িত্ব, আর ফলাফল নির্ধারণ করা আল্লাহ তাআলার এখতিয়ার।
তাই তাকদিরের অজুহাতে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া যাবে না, আবার নিজের চেষ্টাকেই সবকিছুর একমাত্র কারণ মনে করাও যাবে না। বরং হালাল উপায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা এবং ফলাফলে তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকাই তাকদির সম্পর্কে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা।
এসএইচ/