নিজস্ব প্রতিবেদক:
জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক ঘটনা। ছেলেকে জমি লিখে না-দেওয়ার জেরে বৃদ্ধামাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন ছেলে। বৃদ্ধা মা কাঁদতে কাঁদতে বুকে কোরআন জড়িয়ে ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এ ঘটনায় নেটিজেনদের মনে ব্যাথার পাহাড় গড়ে উঠেছে। কেউ সন্তানকে তিরষ্কার করছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর ঘটনা।
ভুক্তভোগী পরিবার বলছেন, এটি কোনো সন্তান দ্বারা মাকে বের করে দেওয়ার ঘটনা নয়, বরং সৎ ও নিজের সন্তানদের বঞ্চিত করে মায়ের সম্পত্তি ও পেনশনের টাকা হাতিয়ে নিতে মামাদের সাজানো এক নাটক।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পোগলদিঘা ইউনিয়নের গেন্দারপাড়া গ্রামের মৃত মোজাম্মেল হক গুঠু তালুকদারের প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি টাঙ্গাইলের রাশেদা বেগমকে বিয়ে করেন। পরে ছেলে রাশেদকে জন্ম দেন তিনি। ১৯৯২ সালে জেএফসিএল প্রতিষ্ঠার সময় প্রথম পক্ষের স্ত্রীর বাবার বাড়ির সম্পত্তি পাওয়া যায় বাবদ ২৫ হাজার টাকা। প্রথম পক্ষের সন্তানরা ছোট থাকার সুযোগে রাশেদা বেগম তার স্বামীকে বুঝিয়ে সেই টাকার সঙ্গে আরও টাকা যোগ করে বাবার বাড়ি কেন্দুয়া এলাকায় কেনেন ৮ বিঘা জমি।
জমি কেনার দায়িত্বে ছিলেন রাশেদা বেগমের বাবা আরফান আলী সরকার। কিন্তু তিনি জামাতার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রথম পক্ষের দুই মেয়েকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করেন এবং নিজের মেয়ে রাশেদার নামে ৪ বিঘা, প্রথম পক্ষের ছেলে জাহাঙ্গীর ও নাতি রাশেদের নামে ৩ বিঘা এবং জামাতার নামে সামান্য জমি কেনেন।
জমি কেনার পর থেকেই রাশেদা বেগমের ভাইয়েরা (মামারা) সেই জমি নিজেদের দাবি করে চাষাবাদ করে আসছেন। শুধু তাই নয়, রাশেদার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যের দুই বিঘা জমির এক বিঘা তার ভাইয়েরা নিজেদের নামে রেখে দিয়েছেন।
মোজাম্মেল হকের মৃত্যুর পর তার পেনশনের ৪ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসের ১৮ হাজার টাকা বেতনও রাশেদা বেগম একাই ভোগ করছেন, যাতে সৎ সন্তানেরা নিজেদের মা মনে করে লিখিত অনুমতি দিয়েছেন।
সন্তানদের অভিযোগ- মায়ের সাথে তাদের কোনো বিবাদ নেই; বরং বিবাদ বাধিয়ে রেখেছেন মামারা, বিশেষ করে বড় মামা ও স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আহাম্মেদ আল ফরিদ। ভাগিনারা তাদের নিজেদের নামের সম্পত্তি বিক্রি করতে গেলে চেয়ারম্যান ফরিদ ও তার ভাইয়েরা বাধা দেন এবং নামমাত্র মূল্যে তাদের কাছে বিক্রি করতে হুমকি দেন।
ছেলে রাশেদুল ইসলাম বলেন, কান্নাজড়িত কণ্ঠে কোরআন বুকে নিয়ে রাশেদা বেগমের বাড়ি ছাড়ার ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ সাজানো নাটক। তিনি জানান, সেদিন মামারাই আমাদের বাড়িতে এসে মাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বুঝিয়ে নিয়ে গেছেন। মাকে নিজেদের জিম্মায় রাখলে মামাদের বড় লাভ। একদিকে মায়ের সম্পত্তি তারা ভোগ করতে পারবেন, অন্যদিকে প্রতি মাসে মায়ের কাছে আসা পেনশনের মোটা অঙ্কের নগদ টাকাও তারা হাতিয়ে নিতে পারবেন।
প্রথম পক্ষের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম আক্ষেপ করে বলেন, রাশেদা বেগম আমার সৎ মা হলেও তাকে আমরা কখনো আলাদা করে দেখিনি। বাবার পেনশনের টাকাও তাকে আমরা দিয়ে দিয়েছি। আমরা চাই মা ভুল বুঝতে পেরে আমাদের মাঝে ফিরে আসুক। আমরা তাকে মায়ের মমতায় আজীবন আগলে রাখতে চাই।
এ বিষয়ে সরিষাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন জানান, মায়ের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতেই অভিযুক্ত রাশেদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অপরাধী যেই হোক, আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
আওয়ার ইসলাম/জেডএম
