মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬ ।। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ৯ জিলহজ ১৪৪৭


আলহাজ মাওলানা কবির আহমাদ: দীপ্ত জীবনের সুখ-স্মৃতি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| আব্দুল্লাহ আলমামুন আশরাফী ||

—‘আব্বা! আপনি অসুস্থ, মাযুর। ওযু করতে আপনার কষ্ট হবে। ওযুর পরিবর্তে আপনি তায়াম্মুম করে নিতে পারেন।’ 

—‘না, বাবা। আমাকে পানি দাও। আমি ওযু করবো। আমি পরিপূর্ণ পাক পবিত্র হতে চাই। তায়াম্মুমে তৃপ্তি পাই না। আমার জন্য পানির ব্যবস্থা করো।’

জীবন সায়াহ্নে দীপ্ত জীবনের অধিকারী আজীবন পবিত্রতার সৌরভে সুরভিত একজন আলোকিত মানুষ ও তাঁর সন্তানদের সাথে কথোপকথন চলছে। তিনি কিছুতেই তায়াম্মুম করবেন না। তিনি অজুই করবেন।  হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। ছেলেরা পানির ব্যবস্থা করলেন। তিনি পানি দেখে আনন্দিত হলেন। চেহারায় সে আনন্দের ঝলক ফুটে উঠলো। চারপাশে থাকা প্রিয়জনদেরকেও সে আনন্দ ছুঁয়ে গেল। তিনি ধীরে সুস্থে বিছানা থেকে উঠলেন। সারাজীবনের প্রিয় অভ্যাস মতো আস্তে আস্তে সুন্নত তরিকায় অজু সারলেন। পাক পবিত্র হয়ে একরাশ স্নিগ্ধ অনুভূতির পরশ সাড়া শরীরে ছড়িয়ে পড়লো। তিনি আবারও আনন্দিত বোধ করলেন।

অজু করে পাক পবিত্র  হতে পেরে তিনি আল্লাহর শোকর আদায় করলেন। তখন যোহরের ওয়াক্ত চলছে। তিনি অসুস্থতা সত্ত্বেও পবিত্র অভ্যাস মতো ধীরে সুস্থে জোহরের নামাজ আদায় করলেন। এটাই ছিলো তাঁর জীবনের শেষ নামাজ।

তিনি জীবন সায়াহ্নে উপনীত হয়েছেন। বয়স নব্বইয়েরও বেশি। বড় কোন অসুস্থতায় ভুগছেন না। একেবারে শয্যাশায়ী হয়েও পড়েননি। বার্ধক্যজনিত ছোটখাটো কিছু সমস্যা ছাড়া বড় ধরনের কোনো অসুস্থতা নেই। বেশ কিছু দিন হলো শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। বড় ছেলেকে কাছে ডাকলেন। শরীরের অবস্থা খুলে বললেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁকে নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। শারীরিক অবস্থা ধীরে ধীরে উন্নতির দিকেই যাচ্ছিল। 

২৭ শে মে (২০২৫) মঙ্গলবার হাসপাতালে তিনি স্বাভাবিকভাবেই যোহরের নামাজ আদায় করেন। বিকেল চারটার দিকে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে থাকে। দ্রুত নেত্রকোনা বড় মসজিদ সংলগ্ন নূরজাহান ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। সদর হাসপাতাল থেকে নূরজাহানে আসতে সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের রাস্তা। বড় ছেলে একটি আলিয়া মাদরাসার শিক্ষক জনাব হাবিবুর রহমান, ছোট ছেলে হাফেজ মাওলানা মিজানুর রহমান, বড় মেয়ে, মেঝো মেয়ের জামাতা হাফেজ কারী মাজহারুল ইসলাম শাহীন সাহেব তাঁর সাথে ছিলেন। তারা জানিয়েছেন, পুরোটা সময় তিনি ইসতিগফার করছিলেন। বিভিন্ন রকমের মাসনুন মাকবুল দোয়া অবলীলায় পড়ে যাচ্ছেন। কালিমায়ে শাহাদাত পড়ছেন। ধীরে ধীরে শরীরটা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। তাঁকে দ্বিতীয় তলায় উঠানো হচ্ছে। সেসময় দুই সন্তানের কাঁধে তাঁর হাত। লজ্জা ও শালীনতার ব্যাপারে চিরসতর্ক সুন্দর জীবনবোধের অধিকারী এই মানুষটি জীবনের শেষ মুহুর্তেও সতর্কতার সাথে লুঙ্গিটা ভালো করে টাখনোর ওপর পড়ে নেন। মুখে জিকির-আজকার চলছে। বিশেষত সুরায়ে মুযযাম্মিলের শেষ আয়াত “ওয়াসতাগফিরুল্লাহ, ইন্নাল্লাহা গাফুরুর রাহিম” বারবার পড়ছিলেন। এভাবে আল্লাহর কালাম, দোয়া ও জিকির করতে করতে তিনি দুনিয়ার সফর সমাপ্ত করেন।

তাঁর আজীবনের আরাধ্য ছিল একটি সুন্দর মৃত্যু। এমন একটি সুন্দর মৃত্যুর জন্য তিনি অনেক কেঁদেছেন। রাতের শেষ প্রহরে সারাজীবন তাহাজ্জুদের জায়নামাজে রোনাজারি করেছেন। সব সময় পাক পবিত্র জীবন যাপন করেছেন। অবশেষে তিনি দৃশ্যমান একটি সুন্দর মৃত্যু উপহার পেয়েছেন। মাশাআল্লাহ।

বলছিলাম সাধারণের বেশে এক অসাধারণ মানুষ, দ্বীনের পথে দৃঢ়তার এক অনন্য উদাহরণ, আমার প্রথম শিক্ষক ও আমার শ্রদ্ধেয় নানাভাই আলহাজ মাওলানা কবীর আহমাদ সাহেবের কথা। রহিমাহুল্লাহু রাহমাতান ওয়াসিয়া। 

দুই.

নানাভাই রহিমাহুল্লাহর প্রথম নাতি আমি। আমার মাধ্যমেই তিনি নানা হয়েছেন। তাই স্বাভাবিকভাবে আমার প্রতি তাঁর স্নেহ, মায়া, মমতার কোনো অন্ত ছিল না। নানাভাইয়ের বড় মেয়ে, আমার আম্মুকে তিনি অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে একজন আলেমের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল নাতিরা হাফেজ আলেম হবে। দ্বীনের দাঈ হবে। তাঁর সদাকায়ে জারিয়ার হবে। আলহামদুলিল্লাহ, নানাভাই রহিমাহুল্লাহর সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবায়নের পথে। আল্লাহ তায়ালা আমাকে হিফজ সম্পন্ন করে কওমি মাদরাসার একাডেমিক পড়াশোনা সমাপন করার তাওফিক দিয়েছেন। অর্ধ যুগ হতে চলল, কওমি মাদরাসায় শিক্ষকতা করছি। পাশাপাশি  লেখালেখি ও বক্তৃতার অঙ্গনেও কাজ করছি আলহামদুলিল্লাহ। ছোট দুই বোনের বড়জন আলেমা হয়েছে। ছোট জন হাফেজা হয়ে এ বছর কওমি মাদরাসায় হেদায়া জামাতে পড়ছে। নানাভাই রহিমাহুল্লাহ তাঁর বাকি দুই মেয়েকেও হাফেজ আলেম জামাতার হাতে তুলে দিয়েছেন। তাদের সন্তানরাও হাফেজ হয়ে কিতাব বিভাগে পড়ছে। কেউ কেউ হিফয পড়ছে।

নানাভাই রহিমাহুল্লাহর চার ছেলের তিনজন মাদরাসায় পড়াশোনা করেছেন। দুজন আলেম হয়েছেন। একজন মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করে সাংসারিক কাজে মনোযোগী হয়েছেন। সবার বড়জন জেনারেল লাইনে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে একটি আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করছেন। 

নানাভাই রহিমাহুল্লাহর অসিয়ত অনুযায়ী তাঁর সাত সন্তানের সকলেই দ্বীনের উপর চলার চেষ্টা করছেন। আল্লাহ তায়ালা সকলকে কবুল করুন।

তিন.

মাওলানা কবীর আহমাদ রহ. এর পড়াশোনার সূচনা হয় স্কুলে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে সম্পূর্ণ নিজস্ব সিদ্ধান্তে তিনি দ্বীনি শিক্ষাকে বেছে নেন। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পৃথিবীতে চোখ মেলেন। জন্মস্থান নেত্রকোনা জেলাধীন আটপাড়া উপজেলার অন্তর্গত স্বরমুশিয়া ইউনিয়নের রুপচন্দ্রপুর গ্রাম। বৈষয়িক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্ভ্রান্ত এক পরিবারে জন্ম তাঁর। বাবার প্রচুর জমিজমা থাকায় তাঁর অন্যান্য ভাইয়েরা পড়াশোনায় বেশিদূর না এগিয়ে বাবার জমি-জমা ইত্যাদির দেখাশোনায় মনোযোগ দেন। কিন্তু কিশোর কবীর আহমাদ ছিলেন সবার চেয়ে আলাদা। কৈশরিক দূরন্তপনার চেয়ে পড়াশোনা তাঁকে বেশী টানতো। সবুজ শ্যামল ফসলী মাঠের চেয়ে স্কুলের পাঠকক্ষই তাঁর কাছে বেশী ভালো লাগতো। ফলে পরিবারে বা নিজ এলাকায় পড়াশোনার স্নিগ্ধ সুন্দর পরিবেশের সে রকম দেখা না মিলায় বাড়ি থেকে বেশ দূরে ভিন্ন একটি উপজেলা মোহনগঞ্জে চলে যান। সেখানে জায়গীর থেকে স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যান।

বাবার ইচ্ছে ছিল পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন শেষে অন্যান্য ভাইদের মতো কবীর আহমাদও বাবার সহায়-সম্পত্তি দেখাশোনায় মনোযোগ দিবে। কিন্তু না, পড়াশোনাই তাঁর আরাধ্য। জীবনে বড় হতে হবে। মানুষের মতো মানুষ হতে হবে। তাই পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চার বিকল্প নেই।  স্বপ্নবাজ কিশোর কবীর আহমাদ তাই একক সিদ্ধান্তে পড়াশোনার মাধ্যমে নিজের স্বপ্নের পথে দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। পারিবারিক আনুকুল্য খুব একটা না জুটলেও তিনি আপন লক্ষ্যে অটল অবিচল থাকেন। নিজ গ্রামে শিক্ষালয় না থাকায় তিনি দূরে চলে যান। সেখানেই চলতে থাকে স্বপ্নের পথে তার এগিয়ে যাওয়া।

মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা প্রায় শেষের দিকে। স্কুলের পড়াশোনায় তাঁর মন বসছে না। আশৈশব শান্ত ও নম্রস্বভাবের কবীর আহমাদ নিয়মিত নামাজ পড়তেন। সাধ্যমতো দ্বীনের পথে চলার চেষ্টা করতেন। কিন্তু মনে শান্তি পাচ্ছেন না। ইসলাম সম্পর্কে জানার দুর্নিবার আগ্রহ তাঁর হৃদয়ে। কিন্তু সে সুযোগ বা পরিবেশ স্কুল কলেজের স্বাভাবিক পড়াশোনায় সম্ভব না। তাই তিনি পড়াশোনার গতিপথ পাল্টে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। 

স্কুলের পাঠ চুকিয়ে তিনি মাদরাসার স্নিগ্ধ সুন্দর আঙ্গিনায় চলে আসেন। হৃদয়ে তাঁর অনাবিল প্রশান্তি আর আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়ে। এতদিনে তিনি আসল পথটা খুঁজে পান। যে পথটা তিনি অনেক আগে থেকে খুঁজে ফিরছিলেন। অবশেষে চির সুন্দর সেই পথটির দেখা পান, যার শেষ প্রান্তে রয়েছে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের হৃদয়কাড়া সুযোগ।

ময়মনসিংহের নান্দাইল। একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ। কিশোর কবীর আহমাদ সংবাদ পান সেখানে একটি দ্বীনি শিক্ষাপীঠ আছে। শিক্ষা-দীক্ষায় অনন্য সেই  প্রতিষ্ঠানটি একটি আলিয়া মাদরাসা। ইলম ও আমলে অপূর্ব সমন্বয়ের দীপ্ত প্রতিচ্ছবি বর্তমান সময়ের কওমি মাদরাসার এক অসাধারণ উপমা ছিল সেই আলিয়া মাদরাসাটি। প্রতিটি ছাত্রকে মানসম্মত পাঠদানের পাশাপাশি আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি সীমাহীন পরিশ্রম করছিল। এক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট সফলতাও পেয়েছিল। যার জীবন্ত নমুনা ছিলেন মাওলানা কবীর আহমাদ রহ.। ইলেম-আমলের চমৎকার সমন্বয় ছিল তাঁর যাপিত জীবনে। একটি ঈর্ষনীয় জীবন কাটিয়ে তিনি আপন রবের দরবারে চলে যান।

নান্দাইলের নিভিয়াঘাটায় অবস্থিত আলিয়া মাদরাসাটি থেকে তিনি (তৎকালীন) মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর জামাতে উলা (ফাযেল) পাশ করেন।

চার.

একাডেমিক পড়াশোনা সমাপ্ত করে নানাভাই রহিমাহুল্লাহ শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তিনি ছিলেন একজন আপাদমস্তক শিক্ষক। শেখা ও শেখানো তাঁর আমৃত্যু প্রিয় অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। নিয়মতান্ত্রিকভাবে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি প্রায় দুই যুগ ব্যক্তিগত পড়াশোনা চালিয়ে যান। বিশেষত কুরআনুল কারিমের তেলাওয়াত ছিল তাঁর হৃদয় প্রশান্তির অনন্য উপকরণ। বোঝ হওয়ার পর থেকে আমি কোনো দিন তাঁর তেলাওয়াত ছুটতে দেখিনি। তেলাওয়াতের পাশাপাশি নিয়মিত তাফসেরের বিভিন্ন কিতাব মুতালাআ করতেন। হাদিস, সিরাত ও সালাফের ঘটনাবলী অধ্যয়ন ছিল তাঁর প্রিয় অভ্যাস। বিশেষত ২০০১ সালে হজ পালনের পর থেকে তিনি কুরআন মাজিদের তেলাওয়াত, তাফসির, হাদিস, সিরাত পাঠেই তাঁর সময় কাটাতেন।

নানাভাই রহিমাহুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে তিনি প্রায় তিন দশক শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। এক্ষেত্রে তিনি একটি অনন্য খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ছাত্রদের ঈমান-আকিদা বিশুদ্ধকরণ, অজু-গোসল তথা পাকপবিত্রতার শিক্ষাপ্রদান, নামাজ-রোজা, হালাল-হারাম ইত্যাদি মৌলিক বিষয়াদি শেখানোর ব্যাপারে তিনি খুব যত্নশীল ছিলেন। আমি নিজে দেখেছি, জোহরের সময় তিনি ছাত্রদেরকে ডেকে নিয়ে এসে জামাতের সাথে নামাজ পড়াতেন। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের অজু করা শেখাতেন। ক্লাসের নির্ধারিত পড়াশোনার পাশাপাশি  হাতে-কলমে সুরা-কেরাত ও নামাজের প্রয়োজনীয় মাসায়েল শেখাতেন। এভাবে অসংখ্য নিষ্পাপ হৃদয়ে দ্বীনের আলো জ্বালিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন।

পাঁচ.

নানাভাই রহিমাহুল্লাহর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অসাধারণ। আমল-আখলাকের অনিন্দ্য সুন্দর সৌরভে তাঁর সুরভিত জীবন পরিচিত আলেম-উলামা ও দ্বীনদ্বার মহলে ছিল রীতিমতো ঈর্ষনীয়। সার্বক্ষণিক পবিত্রতার চাদর জড়িয়ে রাখা। অসাধারণ সময়ানুবর্তিতা। নীতি আদর্শে অবিচলতা। কাজকর্মে  ধীরস্থিরতা। লেনদেনে অনন্য স্বচ্ছতা ও সতর্কতা। তেলাওয়াত ও নামাজে ধ্যানমগ্নতা। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাথে সুন্দর আচরণ। এভাবে তাঁর জীবনপাতার প্রতিটি অধ্যায় ছিল সুরভিত, অনন্য ও ঈর্ষনীয়।

নানাভাই রহিমাহুল্লাহর অসাধারণ গুনাবলীর মাঝে আমার কাছে সব সময় অনন্য লাগতো তাঁর পবিত্রতার রুচিবোধ। আমার এই ছোট্ট জীবনে নানাভাই রহিমাহুল্লাহর মতো পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার ব্যাপারে এতো যত্নশীল আর কাউকে দেখিনি। সাধারণত সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা-লুঙ্গী, সাদা গেঞ্জি পরতেন। সব সময় পরিপাটি পোষাক পরতেন। সাধারণত কারো খেদমত গ্রহণ করতে চাইতেন না। নিজে ধীরস্থিরতার সাথে নিজের কাপড় ধুয়ে ইস্ত্রি করতেন। চলাফেরায় অনন্য রুচিশীলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেন। তাঁর চলাফেরা, তাঁর পোষাক-আষাক, তাঁর খাবার-দাবার, তাঁর যাপিত জীবনের সবকিছুতেই পরিচ্ছন্নতা, স্বচ্ছতা ও পবিত্র রুচিবোধের ঝলক ফোটে ওঠতো। এক্ষেত্রে তাঁর অনুপ্রেরণা ছিল কুরআন মাজিদের সর্ববৃহৎ সুরা বাকারার ২২২ নাম্বার আয়াতে কারীমার নির্দেশনা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

“নিশ্চয়ই আল্লাহ সেই সকল লোককে ভালোবাসেন, যারা তার দিকে  বেশি বেশি  রুজু করে (অর্থাৎ তাওবাহ করে) ও ভালোবাসেন তাদেরকে, যারা বেশি বেশি পাক পবিত্র থাকেন”। 

নানাভাই রহিমাহুল্লাহ ঘুম ও ইস্তিনজার সময় যে কাপড় পরতেন, তা পরে কখনো নামাজ পরতেন না। নামাজের জন্য আলাদা পাক পবিত্র কাপড় রাখতেন। ধীরস্থিরতার সাথে ইসতিনজা-অজু সেরে পাক পবিত্র হয়ে নামাজের জন্য নির্ধারিত কাপড় পরে নামাজ আদায় করতেন। তাই প্রতি ওয়াক্তে নামাজের জামাতের বেশ আগেই পাক পবিত্র হয়ে যেতেন নামাজের জন্য অপেক্ষা করতেন। এটা ছিল তাঁর সব সময়ের অভ্যাস।

সাধারণত তাঁর জামাত ছুটতো না। বাড়ি থেকে বেশ দূরে মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতেন। জীবনের শেষদিকে এতো দূর হেঁটে যাওয়া তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে পড়লে পরিবারের লোকদের পরামর্শে ঘরে নামাজ পড়তেন। কিন্তু তাঁর মনে বেদনা বিরাজ করতো৷ জামাতে যেতে পারছেন না বলে আক্ষেপ করতেন। 

রাতের শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় ছিল নানাভাই রহিমাহুল্লাহর চিরাচরিত আমল। বাড়িতে বা সফরে, শীতে বা গরমে, ঝড় বৃষ্টি—কোন অবস্থাতেই তাঁর তাহাজ্জুদ ছুটতো না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর অনুসরণে তিনি এশার নামাজ পড়ে দ্রুত ঘুমিয়ে যেতেন। ফলে রাতের শেষ প্রহরে জেগে ওঠা তাঁর জন্য সহজ হতো। সুবহে সাদেকের প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা আগে জেগে ওঠতেন। পাক-পবিত্র হয়ে লম্বা কেরাতে নামাজ পড়তেন। নানাভাই রহিমাহুল্লাহ হাফেজ ছিলেন না। কিন্তু কুরআন মাজীদের বড় বড় অনেক সুরা মুখস্থ ছিল। সেগুলো দিয়ে তিনি তাহাজ্জুদ পড়তেন। লম্বা সময় মুনাজাত করতেন। 

আমার সৌভাগ্য যে, আমি নানাভাই রহিমাহুল্লাহর তাহাজ্জুদ, তেলাওয়াত ও মুনাজাত খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। জন্মের পর থেকে ৯ বছর পর্যন্ত আমি নানাভাইয়ের কোলেপিঠেই বড় হয়েছি। আরবি, বাংলা, ইংরেজির হাতেখড়ি তাঁর হাতেই। মাদরাসায় একাডেমিক পড়াশোনা শুরুর বেশ আগেই আরবি ভাষাজ্ঞান, নিত্য আরবি শব্দাবলী, কুরআন মাজিদের অনেকগুলো সুরা, নামাজের দোয়া ও পদ্ধতি সরাসরি নানাভাইয়ের কাছ থেকে শিখে নিয়েছিলাম। ইয়াদুন (হাত, আইনুন (চোখ), বাতনুন… এগুলো এখনো কানে বাজে। অবুঝ শৈশবেই আরবি শব্দ ভাণ্ডারের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ নানাভাই রহিমাহুল্লাহ আমাকে মুখস্থ করিয়ে দেন। এসব সুখস্মৃতি হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। 

নানাভাই রহিমাহুল্লাহ গুরুত্বের সাথে আমাকে তাহাজ্জুদের সময় জাগাতেন। উঠতে না চাইলে বড়দের গল্প বলে, নানাকিছুর লোভ দেখিয়ে উঠাতেন। ইসতিনজা অজু করিয়ে নামাজ পড়াতেন। এভাবে আমাকে তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত করে তুলতে নানাভাই রহিমাহুল্লাহ অনেক চেষ্টা করেছেন। 

আমি অবাক হতাম। ঝড় বৃষ্টি তুফান কোন অবস্থাতেই তাঁর তাহাজ্জুদের রুটিনে ব্যত্যয় ঘটতো না। একবারের ঘটনা। মাদরাসা বিরতি হয়েছে। আমি নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি। সম্ভবত গ্রীষ্মকাল ছিল। আমি আর নানাভাই এশার পরে একই বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ি। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে তীব্র ঝড় শুরু হয়েছে। ঘড়িতে তখন দুইটা কি আড়াইটা বাজে। পাশে দেখি নানাভাই নেই। বিছানা থেকে নেমে দরজার পাশে গিয়ে দেখি নানাভাই নিম্নস্বরে ইস্তিগফার করছেন। যিকির আযকার করছেন। ঝড় থামলে বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে ইস্তিনজাখানায় গিয়ে হাজত সেরে পুকুরে ওযু করে (এটা ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস) তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়িয়ে যান। নানাভাই রহিমাহুল্লাহকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, কিতাবে পড়া তাহাজ্জুদপ্রেমীদের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি নিভৃতচারী বুজুর্গের সান্নিধ্যে আমার শৈশব কেটেছে। ভাবতেই আনন্দে হৃদয়টা ভরে ওঠে।

বাড়িতে তাহাজ্জুদ আদায় করে বেশ দূরে এলাকার মসজিদে গিয়ে ফজর পড়তেন। ফজরের পরে নিয়মিত মরহুম আত্মীয়স্বজনদের কবর জিয়ারত করতেন। হালকা নাশতা সেরে কুরআন মাজিদের তেলাওয়াত ও কিতাবাদী অধ্যয়ন করতেন। লম্বা সময় চলতো তাঁর পড়াশোনা। দশটা,কখনো এগারোটা পর্যন্ত পড়াশোনা শেষে নিজের নিত্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে জোহরের বেশ আগেই গোসল সেরে নামাজের উদ্দেশ্যে চলে যেতেন। যোহরের নামাজ পড়ে খাবার-দাবার সেরে কাইলুলা (দুপুরের ঘুম) করতেন।  আসরের বেশ আগেই ঘুম থেকে জেগে নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে মসজিদে চলে যেতেন। আসর, মাগরিব ও এশা পড়ে একসাথে বাড়িতে ফিরতেন। আসরের পরে সাধারণত দাওয়াত ও তাবলিগের বিভিন্ন   কাজে জড়াতেন। কখনো বিকেল বেলায় বাজারে যেতেন এবং হাঁটাহাঁটি করতেন। সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের ফলে নানাভাই রহিমাহুল্লাহর শরীর ছিল সুস্থ ও নিরোগ। চর্বি-মেদহীন হালকা পাতলা দেহে নির্ধারিত আমলগুলো রুটিনমাফিক সম্পাদন করা ছিল তাঁর জন্য অনায়াসসাধ্য।

নানাভাই রহিমাহুল্লাহর অনন্য জীবনপাতার সুরভিত আরেকটি দিক ছিল লেনদেনে স্বচ্ছতা। ঋণ,ধার কর্য থেকে যোজন যোজন দূরে থাকতেন। আল্লাহ তাঁর সম্পদে প্রচুর বরকত দিয়েছিলেন। কোন অভাব অনটন ছিল না। কিন্তু বেহিসেবী খরচ করতেন না। অপচয়কে খুব ঘৃণা করতেন। আত্মীয় স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশি ও আলেম উলামায়ে কিরামকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করতেন। প্রতিবেশী ও পরিচিত অনেক আলেমদের ছাত্রজীবনে  পড়াশোনায় তাদেরকে নানাভাবে সহায়তা করেছেন। কিন্তু এসবই ছিল  নীরবে নিভৃতে৷ তিনি কেবল আল্লাহর কাছেই বিনিময় আশা করতেন।

ছয়.

নানাভাই রহিমাহুল্লাহ তাঁর উসতাযদের  স্মৃতিচারণ করে দুআ করতেন। তাদের অবদানের মূল্যায়ন করতেন। ময়মনসিংহের বিখ্যাত বুজুর্গ মাওলানা ফয়জুর রহমান রহিমাহুল্লাহর সংগে ইসলাহী সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। আমৃত্যু আকাবির আসলাফের আদর্শ ধারণপূর্বক একটি অসাধারণ সুরভিত জীবন যাপন করে গত বছর ২০২৫ সালের ২৭ মে মোতাবেক ২৮ যিলক্বদ ১৪৪৬ হি. (১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ বাংলা) মঙ্গলবার বিকেল চারটার দিকে তিনি রব্বে কারীমের ডাকে সাড়া দেন এবং আখেরাতের সফরে রওয়ানা হন। পরদিন সকাল নয়টার দিকে রুপচন্দ্রপুর (আটপাড়া নেত্রকোনা) ঈদগাহ মাঠে ছোট ছেলে হাফেজ মাওলানা মিজানুর রহমান সাহেবের ইমামতিতে জানাযা সম্পন্ন হয়। জানাযা শেষে ঈদগাহ মাঠের অদূরে পূর্ব দিকে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

হিজরি বর্ষ হিসেবে সপ্তাহ খানিক হল নানাভাই রহিমাহুল্লাহর মৃত্যুর একবছর পার হয়েছে। সময় কতো দ্রুত চলে যায়। নানাভাই চলে যাওয়ায় আমার হৃদয়ে যে শূন্যতার হাহাকার  তৈরী হয়েছে তা কোনভাবে দূর হওয়ার নয়। আমার মননে,চিন্তা চেতনায় তিনি সতত বিরাজ করেন। আমার কাজে কর্মে অনুপ্রেরণা জোগান। জীবদ্দশায় কদিন পরপরই ফোন করে উৎসাহ দিতেন। বলতেন, ভাই! কাজ করে যাও। এখনই সময় কাজ করার, দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যাওয়ার। আমি তাহাজ্জুদে তোমার জন্য দুআ করছি। আল্লাহ তোমাকে অনেক বড় বানাবেন...। আমাকে ভুলে যেওনা। আমার জন্য দুআ করো। আল্লাহ যেন কবরে হাশরে আমাকে ক্ষমা দেন।"

নানাভাই! আপনাকে আমি ভুলিনি। আপনার স্নেহ মায়া-মমতা,  ভালোবাসা ও হৃদয় বিদগ্ধ দোয়ার সৌরভ বয়ে বেড়াচ্ছি। আপনাকে ভুলা সম্ভব না। আমার চেতনাজুড়ে আপনাকে সব সময় অনুভব করি। আমার প্রতিটি নেক আমল আপনার জন্য সদাকায়ে জারিয়া ইনশাআল্লাহ। আপনি আমার হাতে কলম তুলে দিয়েছিলেন। বয়ান বক্তৃতায়ও আপনি অনুপ্রেরণা জোগাতেন। আপনার অনুপ্রেরণা ও দুআ নিয়েই আল্লাহর উপর ভরসা করে পথ চলছি। আপনার বিদায়ের পর প্রায়ই সব কিছু শূন্য শূন্য লাগে। তখন আপনার জন্য ঈসালে সওয়াব করি। দুআ করি। তখন সাথে সাথে এক আশ্চর্য ভালো লাগা কাজ করে।  এক বছরে বেশ কয়েকটি কুরআন খতম আপনার জন্য হাদিয়া করেছি। তাহাজ্জুদে দুআ করছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সেগুলো আপনার কাছে পৌঁছেছে। আমাদের আশা ও প্রবল ধারণামতে আপনি জান্নাতের উদ্যানে আছেন। স্বপ্নে আমি এর খানিকটা ইঙ্গিতও পেয়েছি।

ইনশাআল্লাহ, অচিরেই আপনার সাথে জান্নাতুল ফিরদাউসের কোন এক নহরের পাশে দেখা হবে।  গল্পে গল্পে মেতে ওঠা সেই মুহুর্তগুলো দারুণ কাটবে।

আল্লাহ, আমার প্রিয় নানাভাইকে আপনি রহমতের চাদরে ঢেকে নিন।  নেক আমলগুলো কবুল করুন। কবরকে জান্নাতুল ফিরদাউসের বাগানে পরিণত করে দিন। আমীন। 

লেখক: মুহাদ্দিস, খতীব, কলামিস্ট, আলোচক

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ