মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী
ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ কমাতে প্রচলিত আইন বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর শরয়ি আইন নিয়ে নানা আলোচনা ও পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব আলোচনা শরয়ি আইন বাস্তবায়নের আন্তরিক মানসিকতা থেকে নয়; বরং প্রচলিত বিচারব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ার পর যখন শরয়ি আইনের অপরিহার্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তখন শরয়ি আইনকেও অকার্যকর প্রমাণ করার উদ্দেশ্যেই নানা আলোচনা উত্থাপন করা হচ্ছে।
দুঃখজনকভাবে, যারা শরয়ি আইনের পক্ষে কথা বলেন, তাদের অনেকেই শরিয়তের প্রকৃত অবস্থান, বিচারব্যবস্থার কাঠামো এবং অপরাধ দমনে এর কার্যকারিতা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ফলে সাধারণ মানুষের মনেও শরয়ি আইন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। অথচ এসব প্রশ্ন নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে ইসলামবিদ্বেষীদের তৈরি করা প্রশ্নগুলোই ধীরে ধীরে ইসলাম সম্পর্কে কম জানাশোনা মুসলমানদের ভেতরে প্রবেশ করেছে। আর যেহেতু আলেমদের সঙ্গে তাদের জ্ঞানের ব্যবধান রয়েছে, তাই জানার উদ্দেশ্যের চেয়ে বিতর্কের পরিবেশই বেশি তৈরি হচ্ছে।
প্রথমেই বুঝতে হবে, প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় ফৌজদারি অপরাধের বিচার একই দণ্ডবিধির আওতায় করা হয়। কিন্তু ইসলামি বিচারব্যবস্থায় শাস্তিকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে—
১. কিসাস
২. হুদূদ
৩. তা‘জীর।
আমরা সাধারণত প্রথম দুই প্রকারের নামই শুনে থাকি। ফলে অনেক সময় সন্দেহের নিরসন করতে পারি না কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি; বিশেষ করে হুদূদ নিয়ে। অথচ হুদূদ হলো দৃষ্টান্তমূলক ও নির্ধারিত কঠোর শাস্তি। এজন্য এর প্রমাণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত কঠোর শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। আর একবার তা প্রমাণিত হয়ে গেলে কোনো বিচারক, শাসক বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির এখতিয়ার থাকে না যে সেখানে নিজের ইচ্ছামতো কম-বেশি করবে।
এখানে প্রশ্ন তোলা হয়, ধর্ষণ বা ব্যভিচারের ক্ষেত্রে যেহেতু চারজন সাক্ষীর কথা বলা হয়েছে, তাহলে তো বাস্তবে কখনোই এ শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব নয়! কারণ কেউ কি চারজন সাক্ষী দাঁড় করিয়ে ব্যভিচার বা ধর্ষণ করে?
কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, আজ যেমন কেউ চারজন সাক্ষীর সামনে দাঁড়িয়ে এ অপরাধ করে না, শরিয়তের বিধান নাজিল হওয়ার সময়ও কেউ এমন করত না। তারপরও সে যুগে ধর্ষণ ও ব্যভিচারের বিচার হয়েছে এবং অপরাধীরা শাস্তিও পেয়েছে। তাহলে চারজন সাক্ষীর বিষয়টিকে বিচারের অন্তরায় মনে করার কারণ কী?
আসলে চারজন সাক্ষীর প্রসঙ্গ কোথায় এসেছে, সেটাই আগে বুঝতে হবে। কুরআনে ব্যভিচারের শাস্তির আলোচনা এবং চার সাক্ষীর আলোচনা একই ধারাবাহিকতায় এসেছে। তবে চারজন সাক্ষীর কথা বিশেষভাবে অপবাদ ও অভিযোগ প্রমাণের প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে—
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ
অর্থাৎ, “যারা সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না…”
অর্থাৎ চারজন সাক্ষীর শর্ত মূলত ব্যভিচারের অপবাদের পথ রোধ করে সামাজিক মর্যাদা রক্ষার জন্য, যাতে মানুষ হালকাভাবে কারও চরিত্রহনন করতে না পারে।
এর অর্থ এই নয় যে চারজন সাক্ষী না পাওয়া গেলে ধর্ষণ বা ব্যভিচারের বিচারই হবে না। বরং তখন হুদূদের নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর না হলেও বিচার হবে ইসলামি দণ্ডবিধির তৃতীয় বিভাগ ‘তা‘জীর’-এর মাধ্যমে। আর তা‘জীরকে লঘু শাস্তি মনে করার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধের ধরন ও ভয়াবহতা বিবেচনায় অনেক ক্ষেত্রে তা‘জীরের আওতায় সর্বোচ্চ শাস্তিও দেওয়া যেতে পারে।
খাইরুল কুরুন তথা শ্রেষ্ঠ যুগে ধর্ষণ ও ব্যভিচারের বহু বিচার স্বীকারোক্তির মাধ্যমে হয়েছে। মানুষ আখিরাতের শাস্তির ভয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করত। বর্তমান যুগেও আমরা দেখি, আদালতে জবানবন্দিমূলক স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে বাস্তবতার নিরিখে ‘কারাইন’ তথা পারিপার্শ্বিক ও পরিস্থিতিগত প্রমাণ গুরুত্ব পেতে থাকে। বর্তমান বিচারব্যবস্থাতেও ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিএনএ টেস্ট, মেডিকেল সার্টিফিকেট, ডিজিটাল আলামত ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়।
ইসলামিবিচারব্যবস্থাতেও কারাইন তথা পরিস্থিতিগত প্রমাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন আলামত, বাস্তবতা ও পারিপার্শ্বিক বিষয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিচারকার্য পরিচালিত হতো এবং তা‘জীরমূলক শাস্তি প্রদান করা হতো।
এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, ভিকটিম সাক্ষী না পেলে কি আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারবে?
অবশ্যই পারবে। কারাইন তথা পারিপার্শ্বিক ও পরিস্থিতিগত প্রমাণ থাকলে অভিযোগ উত্থাপন করা যাবে। একেবারে কোনো আলামত বা সূত্র ছাড়া যেমন বর্তমান আদালতেও অভিযোগ গ্রহণ করা হয় না, তেমনি ইসলামি বিচারব্যবস্থাতেও অভিযোগের পেছনে কিছু বাস্তব ভিত্তি, আলামত বা প্রমাণ থাকতে হবে।
এখানে আরেকটি প্রশ্ন আসে, তাহলে শরয়ি আইনের বিশেষত্ব কোথায়?
মনে রাখতে হবে, শরয়ি আইন কোনো বিচ্ছিন্ন শাস্তির নাম নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। এখানে একজন মানুষ অপরাধী হয়ে ওঠার কারণ, সমাজব্যবস্থা, নৈতিকতা, পারিবারিক পরিবেশ, বিচারকের ন্যায়পরায়ণতা, সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি— সবকিছু একসাথে বিবেচনা করা হয়। আর এ সামগ্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
শরয়ি আইনে ধর্ষণের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি ধর্ষিতার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রয়েছে। পক্ষান্তরে প্রচলিত আইনে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি থাকলেও তা বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই দৃষ্টান্তমূলক হয়ে ওঠে, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ষিতার ন্যায্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও উপেক্ষিত থাকে।
সবকিছু মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বের বিচারব্যবস্থার বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, সব ধরনের অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে শরয়ি আইন একটি কার্যকর, ভারসাম্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা।
লেখক: মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট; মুহাদ্দিস, জামিয়া কোরআনিয়া লালবাগ
আরএইচ/