পাপ ঠিক নেশার মতই, তাই তাওবার ক্ষেত্রে বিলম্ব কাম্য নয়!
অক্টোবর ১০, ২০২১ ৪:৪৯ অপরাহ্ণ

মুহাম্মাদ আবু আখতার।।

পাপে আসক্ত হওয়া নেশাগ্রস্থ হওয়ার মত ভয়ংকর। কেউ বারবার নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন করলে একসময় সে নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তখন সে চাইলেও খুব সহজে তার নেশা ছাড়তে পারে না। পাপের বিষয়টা ঠিক নেশার মতই। কেউ যখন কোন পাপ বারবার করতে থাকে তখন সে একসময় পাপাসক্ত হয়ে পড়ে৷ আর একবার কেউ পাপাসক্ত হয়ে পড়লে খুব সহজে সে পাপ থেকে ফিরে আসতে পারে না৷ পাপ করা তার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়৷

তখন সে পাপ ছাড়তে চাইলেও সহজে ছাড়তে পারে না৷ শয়তান পাপের কাজকে তার কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে৷ তখন পাপকে তার পাপ বলে মনে হয় না৷ পাপের মাঝেই সে সুখ খুঁজে পায়৷ আর পাপ করতে না পারলে তার মাঝে অস্থিরতা ও অশান্তি দেখা দেয়৷ আল্লাহ তায়ালা তার অনুগত বান্দাদের সাথে তাদের তুলনা করে বলেন, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত নিদর্শন অনুসরণ করে, সে কি তার সমান, যার কাছে তার মন্দ কর্ম শোভনীয় করা হয়েছে এবং যে তার খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে। (সুরা মুহাম্মাদঃ ১৪)

আমাদের চারপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকালেই এর বাস্তবতা আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে৷ আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যাদের কাছে নাটক-সিনেমা দেখা এবং গানবাজনা শোনা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে৷ এসবের মাধ্যমে বিবাহ পুর্ব অবৈধ প্রেম-ভালোবাসাকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হয়৷ আর এসব দ্বারা চোখের জেনা, কানের জেনা, মনের জেনা, সময় নষ্ট, চরিত্র নষ্ট, অর্থ নষ্ট ইত্যাদি অনেক গোনাহ হয়৷ অথচ এ সবকে তারা দোষের কিছু মনে করে না৷

বরং তারা এটা আগ্রহভরে উপভোগ করে৷ এতে তারা এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে যা থেকে তাওবা করা তাদের কাছে অনেক কঠিন মনে হয়৷ কেউ এসব ব্যাপারে তাদেরকে উপদেশ দিতে গেলে তাদের কাছে অসহ্য লাগে৷ তেমনিভাবে গাইরে মাহরাম নারী-পুরুষের বেপর্দায় দেখা-সাক্ষাত ও কথাবার্তা বলা অনেকের কাছে দোষের কিছু বলে মনে হয় না৷ বিশেষভাবে দেবর-ভাবী, শালী-দুলাভাই, বেয়াইন-বেয়াইনী, প্রেমিক-প্রেমিকা পরস্পরের সাথে বেপর্দায় দেখাসাক্ষাত করা এবং হাসি-ঠাট্টা করা স্বাভাবিক বিষয় মনে করা হয়৷ এটাকে অনেকের কাছে পাপ বলেই মনে হয় না৷ তাই এ পাপ থেকে তাওবা করার চিন্তাভাবনাও তারা করে না৷

এমনিভাবে যে ব্যক্তি যে পাপ নিয়মিত করতে থাকে সেটা এক সময় তার কাছে আর পাপ বলেই মনে হয় না৷ দীর্ঘদিন নিয়মিত নামাজ আদায় না করার ফলে নামাজ ছাড়লে যে পাপ হয় এ অনুভুতি একসময় লোপ পায়৷ ধনী লোকদের প্রতি বছর জাকাত ঠিকমত আদায় না করতে করতে জাকাত আদায় না করা যে পাপ এ অনুভুতি থাকে না৷ নিয়মিত দাড়ি কাটার ফলে এক মুষ্ঠির কম দাড়ি কাঁটা যে পাপ এটা আর খেয়াল থাকে না৷ এরকম আরো অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে৷

কিন্তু কোন পাপকে পাপ মনে না করা সুস্পষ্টভাবে ঈমানবিরোধী৷ যে পাপী তার পাপ থেকে তাওবা করে না তার অন্তরে এর কুপ্রভাব পড়ে৷ পাপ করতে করতে তার অন্তর এমন কলুষিত হয়ে পড়ে যে, পাপের প্রতি তার কোন ঘৃণাবোধ থাকে না৷ ফলে তার পাপকাজ হতে তাওবার সৌভাগ্য হয় না৷ আর কোন পাপ হতে তাওবা না করলে তার শাস্তি অবধারিত৷ হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “বান্দা যখন একটি গুনাহ করে তখন তার অন্তরের মধ্যে একটি কালো চিহ্ন পড়ে।

অতঃপর যখন সে গুনাহর কাজ পরিহার করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাওবা করে তার অন্তর তখন পরিষ্কার ও দাগমুক্ত হয়ে যায়। সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তার পুরো অন্তর এভাবে কালো দাগে ঢেকে যায়। এটাই সেই মরিচা আল্লাহ তা’আলা যার বর্ণনা করেছেনঃ “কখনো নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের মনে মরিচা ধরিয়েছে৷ (সূরা মুত্বাফফিফীনঃ ১৪)। তিরমিজীঃ৩৩৩৪

তাই আমাদের দ্বারা যেকোন পাপ সংঘটিত হলে অন্তরে পাপের মরিচা দূরীভুত করার জন্য আমাদের দ্রুত তাওবা করা উচিত৷ এ ব্যাপারে সামান্যতম অবহেলা করা মোটেও ঠিক নয়৷ পাপ যত বেশি হোক না কেন আমরা যদি খালেসভাবে তাওবা করি তাহলে আশা করা যায় তিনি ক্ষমা করবেন ইনশাআল্লাহ। আর তাওবা না করে অনবরত পাপ করতে থাকলে পরে আল্লাহ তায়ালার খাস রহমত ব্যতিত তাওবার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

আমাদের সমাজে অনেক যুবক এ আশায় পাপ করে যে, মৃত্যুর আগে বৃদ্ধাবস্থায় তাওবা করে ভালো মানুষ হয়ে যাবে৷ কিন্তু তাওবা ভাগ্যে জুটবে কিনা কিংবা তাওবার সুযোগ হলেও সেসময় তা কবুল হবে কিনা এ চিন্তা করে না৷ আবার অনেকে তাওবা করা মৃত্যুর পুর্ব মহুর্তের কাজ বলে মনে করে৷ তাই অনেক এলাকায় দেখা যায়, কেউ মৃত্যুর নিকটবর্তী হলে তাওবা করানোর জন্য হুজুর ডেকে আনা হয়৷ অথচ তার সারা জীবন কেটেছে আল্লাহর নাফরমানীতে৷ সুস্থাবস্থায় কখনো তার মনে এক মহুর্তের জন্য তাওবা করার খেয়ালও হয় নি৷ তাদের অবস্থা ফেরআউনের মত৷ ফেরআউন সারাজীবন আল্লাহর নাফরমানী করেছে৷ হজরত মুসা (আ.) এর অনেক মুজিজা দেখেও ঈমান কবুল করে নি৷ বরং মুসা (আ.) কে যাদুকর বলে হেয় করেছিল৷

আর বনী ইসরাইলের যারা ঈমান এনেছিল তাদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছিল৷ কিন্তু যখন নীলনদে ডুবে মৃত্যুর উপক্রম হয় তখন সে তার ঈমানের কথা ঘোষণা দেয়৷ কিন্তু এসময় তার ঈমান গ্রহণযোগ্য হয় নি৷ আল্লাহ তায়ালা এ ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, “আর বনী-ইসরাঈলকে আমি নদী পার করে দিয়েছি।

তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছে ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনী, দুরাচার ও বাড়াবাড়ির উদ্দেশে। এমনকি যখন তারা ডুবতে আরম্ভ করল, তখন সে বলল, এবার বিশ্বাস করছি যে, তিনি ছাড়া কোন মা’বুদ নেই যার উপর ঈমান এনেছে বনী ইসরাঈল। বস্তুতঃ আমিও তাঁরই অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত। (আল্লাহ তার এ কথার জবাবে বলেন) এখন একথা বলছ! অথচ তুমি ইতিপূর্বে নাফরমানী করছিলে এবং পথভ্রষ্টদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলে। (সুরা ইউনুসঃ ৯০-৯১)

মৃত্যুর পূর্ব মহুর্তে ফেরআউনের তাওবা আল্লাহ তায়ালা কবুল করেননি। তার ঘটনা থেকে তাওবায় বিলম্বকারী সমস্ত গোনাহগারদের শিক্ষা নেয়া উচিত। কেননা কার মৃত্যু কখন আসবে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আর মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হওয়ার পর কারো তাওবা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

কার তাওবা কবুল হবে এবং কার তাওবা কবুল হবে না এ ব্যাপারে ইসলামের মূলনীতি বর্ণনা করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, অবশ্যই আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন, যারা ভূলবশতঃ মন্দ কাজ করে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তাওবা করে, এরাই হল সেসব লোক যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, মহাবিজ্ঞ।

আর এমন লোকদের জন্য কোন তাওবা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমন কি যখন তাদের কারো মাথার উপর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকে যে, আমি এখন তাওবা করছি। আর তাওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে৷ আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি। (সুরা নিসাঃ ১৭-১৮)

উপরোক্ত আয়াত দুটি অনুযায়ী, যারা শয়তানের ধোঁকায় নফসের তাড়নায় পড়ে ভুলবশতঃ পাপ করার পর অনতিবলম্বে তাদের ভুল বুঝতে পেরে তাওবা করবে আল্লাহ তায়ালা তাদের তাওবা কবুল করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন৷ কিন্তু যারা তাওবাবিহীন সারা জীবন পাপ করার পর মৃত্যুর মুখোমুখী হওয়ার সময় তাওবা করে এবং যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তাদের তাওবা আল্লাহ তায়ালা কবুল করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন৷ সুতরাং যারা মৃত্যুর আগে বৃদ্ধ বয়সে তাওবা করার আশায় যৌবনকালে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী না করে বিভিন্ন পাপ কাজ লিপ্ত হয় তারা শয়তানের কঠিন ধোঁকায় পড়ে আছে৷ কুরআন হাদীস হতে শিক্ষা নিয়ে অতি শীঘ্রই তাওবা করে আল্লাহ তায়ালার পথে ফিরে আসা তাদের একান্ত কর্তব্য।

লেখক: শিক্ষার্থী (আলকোরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ) ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

-এটি

সর্বশেষ সব সংবাদ