fbpx
           
       
           
       
ইমাম যুফার রহ.: তাকওয়া ও ফিকহের মাঝে বৈচিত্র
জুলাই ১৩, ২০২১ ৪:২৩ অপরাহ্ণ

জাফর সাদেক আরাফাত ।। গভর্নর ইয়াযিদ ইবনে মুহাল্লাব। বর্তমানে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের বন্দিদের একজন। তাঁর কাছে এসেছেন বিখ্যাত এক ফকীহ। দেখা করার জন্য। ইবনে মুহাল্লাবের পুত্র মাখলাদকে বললন, তোমার বাবার থেকে অনুমতি নিয়ে আসো। আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করব। কিছুক্ষণ বাদে তিনি অনুমতি পেয়ে প্রবেশ করলেন, সম্মানপ্রদর্শন করে বললেন, আমি আপনার জন্য ৫০ টি বোঝাইকৃত মাল পাঠানোর ইচ্ছা করছি।

-বরং আমিই আদেশ দিচ্ছি। এখন আমি এর জন্য দ্বিগুণ প্রতিদান দিব আপনাকে। বিখ্যাত ঐ ফকীহ দৃঢ়তার সাথে জবাব দিলেন,
-আমি কিছুই গ্রহণ করব না। -কেনো, নিবেন না? -আপনি নিজের সম্পদ থেকে যতটুকু ব্যয় করবেন (পারিশ্রমিকের জন্য) তার চেয়ে বরং আমি স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে কাজটি করব। সুতরাং এটার মূল্যায়ন এই বিনিময়ে দ্বারা সম্ভব না।

এরপর তিনি বেরিয়ে গেলেন। কোনো হাদিয়া বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করলেন না। ইবনে মাহলাব এর সাথে হাজ্জাজের বিরোধ বেড়েই চলছিল। অথচ মাহলাব গোত্রের লোকেরা দানদাক্ষিণ্য ও উদারতায় অতি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিল। তার সাথে বনিবনা না হওয়ায় খলীফা আব্দুল মালিকের সন্তুষ্ট ছাড়াই তাকে বন্দি করে।

হ্যাঁ, তিনিই হলেন ইমাম যুফার ইবনে হুযাইল রহ. প্রথম দিকে তিনি হাদীস নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি আবু হানাফি রহ. এর মজলিস থেকে তাফাক্কুফ ফিদ দীন অর্জন করেন। দীনের গভীর সমঝ আল্লাহ তাকে দান করেন। তিনি ১১০ হিজরীতে ইস্পহানে জন্ম গ্রহণ করেন। তখন তার পিতা হুযাইল ইবনে যুফার ইবনে হুযাইল ইস্পাহানের গভর্নর ছিলেন। তাঁর উপনাম আবু হুযাইল।

প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি হাদীসের উপর ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তাঁর হাদীসের উস্তাযদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ। তন্মধ্যে কয়েকজ হলেন, সুলায়মান ইবনে মিহরান রহ., ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আনসারী রহ., আবু আয়্যুব সাখতিয়ানী রহ., ইয়াহইয়া ইবনে আব্দুল্লাহ আততাইমী রহ., যাকারিয়া ইবনে আবি যায়িদা রহ., সাঈদ ইবনে আরুবা রহ. প্রমুখ।

এঁদের হাদীস সিহাহ সিত্তা সহ বিভিন্ন হাদীসের কিতাবে বর্ণিত আছে। যাদের নাম মুহাদ্দিস মহলে বেশ প্রসিদ্ধ। ইমাম যুফার রহ. এর হাদীস সমূহ বিভিন্ন তাবাকাত, তারীখের কিতাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। মুহাদ্দিস হাকেম নাইসাবুরী রহ. তার লিখিত ‘মা’রিফাতু উলূমিল হাদীস কিতাবে উল্লেখ করেছেন, “তাঁর হাদীসের কিতাব দুইটি বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে। একটি হল, ইবনে ওয়াহবের বর্ণনা। আরেকটি হল শাদ্দাদ ইবনে হাকীম এর।

তাঁর হাদীসে ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন হলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ., ওয়াকি’ ইবনুল জাররাহ রহ., সুফিয়ান ইবনে উওয়াইনা রহ. প্রমুখ। মুহাদ্দিস আবু বকর ইবনে আবি শায়বা রহ. বলেন, “যুফার রহ. হলেন সমকালীন আলেমদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ফকীহ।

ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এবং ইমাম যুফার রহ. উভয়ের মাঝে প্রতিযোগিতা হত। প্রায় সময়ই তারা মুনাযারা করতেন। কিন্তু যুফার রহ. ছিলেন বেশি অগ্রসর ব্যক্তি।

আসাদ ইবনে আমর রহ. কে শাদ্দাদ ইবনে হাকীম রহ. জিজ্ঞেস করলেন, তাঁদের উভয়ের মাঝে বড় ফকীহ কে? তিনি বললেন, যুফার রহ. হলেন অধিক তাকওয়ার অধিকারী। শাদ্দাদ বললেন, আমি ফিকহ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছি। তিনি বললেন, তাকওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির মর্যাদা আরো বৃদ্ধি পায়।

তাঁর খোদাভীতির কথা অনেক। যেমন অনেক বার তাকে কাযীর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য বাধ্য করা হয়েছিল। এমনকি বারবার তাঁর ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবারই তিনি কিছু দিন আত্মগোপন থেকে আবার ফিরে আসতেন। পুনরায় বাড়ি মেরামত করতেন। ফিকহ এবং তাকওয়া-ইবাদতের মাঝে সমন্বয় সাধনে অনন্য ছিলেন।

তাঁর সম্পর্কে একটি অনর্থক অপবাদ দেওয়া হয় যে, তিনি ফিকহের ইমাম ছিলেন ঠিক। কিন্তু তিনি বেশি কিয়াস অর্থাৎ যুক্তিদর্শন দ্বারা দলীল উপস্থাপন করতেন। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁর মত তাকওয়াবান ব্যক্তির ব্যাপারে এমন অমূলক ধারণা অবান্তর।

বরং তিনি কুরআন সুন্নাহ থেকে আহরিত কিয়াসকে দলীল মনে করতেন। বস্তুতঃ আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেছেন, ইমাম যুফার রহ. প্রায়শই বলতেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের নিকট ‘আসার’ (রাসূলের হাদীস বা সাহাবীদের ফতোয়া) থাকবে আমরা কিয়াসকে গ্রহণ করব না। এরপরও যদি আসার না পাই তাহলে কিয়াস দিয়ে দলীল দিব।

ইমাম ওয়াকি” ইবনুল জাররাহ রহ. তো বলতেন, ” আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর উত্তম প্রতিনিধি বানিয়েছেন। যদিও আমি তাঁর সান্নিধ্য পাইনি। তদুপরি আপনার কারণে সেই হাসরত ও দুঃখকষ্ট লাঘব হয়ে গেছে।

জীবনের সায়াহ্নে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. তাঁর শিয়রে উপস্থিত ছিলেন। যুফার রহ. তাঁকে অসিয়ত করলেন, এখানে কিছু জিনিসপত্র আছে। এগুলোর মালিক আমার স্ত্রী। আর তিনশত রৌপ্য মূদ্রা এগুলো আমার ভাতিজা পাবে। এছাড়া আমার থেকেও কেউ কিছু পাবে না। আমিও কারো থেকে কিছু পাই না। আমি ঋণমুক্ত। সম্পূর্ণ দায়মুক্ত। এরপর তিনি ১৫৮ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন।

হায়াত পেয়েছিলেন মাত্র ৪৮ বছর। তাঁর মৃত্যুর পর ঘরে সাকুল্যে তিন দিরহামের আসবাবপত্র ছিল। এমনই ছিলো আমাদের সালাফদের সাধাসিধা জীবন। যুহদ এবং তাকওয়া তারা বৈচিত্র্যময় চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন বরেণ্য ও অনুসরীয় ব্যক্তি। সিরাতে মুস্তাকীম— সরল পথের যুগপৎ পথিকৃৎ।

ওআই/আবদুল্লাহ তামিম/কাজী আবদুল্লাহ

সর্বশেষ সব সংবাদ