fbpx
           
       
           
       
শিরোনাম :
যাকাত মানে করুণা নয়, এটা গরীবের অধিকার!
মে ০৪, ২০২১ ৪:০৯ অপরাহ্ণ

মুফতি নাজমুল হাসান।।

যাকাত ইসলামী শরীয়তে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানের নাম৷ যে পাঁচটি বিষয় ইসলাম ধর্মের স্তম্ভ, তম্মধ্যে যাকাত হল একটি৷ যে ব্যক্তি যাকাতের বিধান অস্বীকার করে শরীয়তের দৃষ্টিতে সে ইসলাম থেকে খারিজ তথা বহিস্কৃত হয়ে যায়৷ ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর রা. যাকাত অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধে তরবারী উত্তোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন৷

ইসলামের এমন গুরুত্বপূর্ণ বিধানটি আদায়ের জন্য রয়েছে বেশ কিছু নিয়ম ও পদ্ধতি৷ ইসলামী শরীয়ত যাকাত প্রদানের যে পদ্ধতি ও রুপরেখা পেশ করেছে, বর্তমান সমাজ তা হতে বেশ দূরে ও ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে৷ যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে বর্তমান সমাজ এমন কিছু পন্থা ও পদ্ধতির প্রচলন ঘটিয়েছে, যা ইসলামী শরীয়তে অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয়৷ শরীয়ত বিবর্জিত এমন কিছু পন্থা ও পদ্ধতির অসারতা নিয়ে নিম্নে আলোকপাত করা হল-

ক. ধনীর বাড়ির আঙিনায় গরিবের দীর্ঘ লাইন
আমাদের দেশে যাকাত গ্রহণের লাইন ধরতে গিয়ে গরীবরা ট্র্যাজেডির শিকারও হন৷ ২০১৫ সালের একটি অনুসন্ধানে দেখা যায় বিগত ৩৫ বছরে যাকাত নিতে গিয়ে আমাদের দেশে গরীব নিহত হয়েছে ২৫৪ জন৷ তাছাড়া ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় যাকাত নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে অন্তত ১০ জন গরীবের মৃত্যু হয়৷

যাকাতের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে অনবগত থাকার কারণেই এসকল মর্মান্তিক ট্রাজেডির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে৷ আমরা মনে করি, যাকাত প্রদান করা মানে গরিবের প্রতি করুণা করা, তাই গরীবরাই ধনীর দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে তা সংগ্রহ করে নিয়ে যাবে – অথচ এটি মোটেও সঠিক নয়৷ যাকাত গরিবের প্রতি করুণা নয়, বরং এটি গরিবের অধিকার৷ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মুত্তাকিরা জান্নাতের ফোয়ারার কাছে থাকবে। তারা গ্রহণ করবে যা তাদের পালনকর্তা তাদের দেবেন। নিশ্চয় ইতিপূর্বে তারা ছিল সত্কর্মপরায়ণ, তারা রাত্রির সামান্য অংশেই নিদ্রা যেত, রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং তাদের ধন-সম্পদে ছিল প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক বা ন্যায্য অধিকার। (সূরা জারিয়াত, আয়াত নং: ১৫-১৯)

আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘তবে তারা স্বতন্ত্র, যারা নামাজ আদায়কারী, যারা তাদের নামাজে সার্বক্ষণিক কায়েম থাকে এবং যাদের ধন-সম্পদে নির্ধারিত হক আছে যাঞ্ছাকারী ও বঞ্চিতের এবং যারা প্রতিফল দিবসকে সত্য বলে বিশ্বাস করে এবং যারা তাদের পালনকর্তার শাস্তি সম্পর্কে ভীত-কম্পিত। (সূরা মাআরিজ, আয়াত নং: ২২-২৭)

ধনীদের উচিত ছিল – নিজেদের সম্পদকে স্বচ্ছ রাখতে এবং জাহান্নামের আযাব থেকে বেঁচে জান্নাত অর্জনের সৌভাগ্য লাভ করতে নিজেরাই গরীবদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাদের প্রাপ্য অধিকার তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া৷ আর এই পন্থাটিই ইসলামী শরীয়তে যাকাত আদায়ের স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতি বলে বিবেচিত৷

খ. যাকাত আদায়ে নিম্নমানের কাপড়
নিম্নমানের কাপড় দিয়ে যাকাত আদায় করা এখন সমাজের একটি মারাত্মক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ গার্মেন্টস গুলো যাকাতের কাপড় বলে যে কাপড়গুলো তৈরি করে, তা তারা অন্যান্য কাপড়ের তুলনায় স্বেচ্ছায় যথেষ্ট নিম্নমানে রেখে তৈরি করে৷ যার ফলে খবর নিলে দেখা যায়, এসকল কাপড়গুলো গরীবরা কয়েক মাসও পরিধান করতে পারে না, কিছু দিন না যেতেই ছিড়ে যায় বা ফেটে যায়৷ দোকানিরাও সারা বছরের অচল কাপড়গুলোকে রমযান আসলে যাকাতের কাপড় হিসেবে আলাদা করে রেখে দেয়৷

অথচ মহান আল্লাহ তা‘আলা নিজের ভালবাসার ও পছন্দের বস্তু দান করার নির্দেশ দিয়েছেন৷ ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা কখনো প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তা ব্যয় করবে, যা তোমরা ভালোবাসো। আর তোমরা যেকোনো বস্তুই ব্যয় করো তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা সে বিষয়ে অবগত।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং: ৯২)

হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আউফ ইবনে মালেক (রা.) বলেন, ‘একবার রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মসজিদে আমাদের কাছে এলেন। তাঁর হাতে একটি লাঠি ছিল। মসজিদে আমাদের এক ব্যক্তি নিকৃষ্ট মানের একগুচ্ছ খেজুর ঝুলিয়ে রেখেছিল। তিনি ওই খেজুরগুচ্ছে লাঠি দিয়ে আঘাত করে বলেন, এর দানকারী ইচ্ছা করলে এর চাইতে উত্তম দান করতে পারত। তিনি আরো বলেন, এর দানকারীকে কিয়ামতের দিন নিকৃষ্ট ফল খেতে হবে।’ – (আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৬০৮)

গ. যাকাত প্রদানের ফটোসেশন
রোযাদার গরীবদের কষ্ট দিয়ে দীর্ঘ লম্বা লাইনে দাঁড় করিয়ে যাকাত প্রদানের যে ফটোসেশন সমাজের বিত্তবানরা প্রচলন করে আসছে, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গর্হিত ও ভয়াবহ গোনাহের কাজ৷ লোক দেখানো এমন ফটোসেশনের যাকাত আল্লাহর দরবারে কবূল হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই নেই৷ শুধু যাকাত নয়, লোক দেখানো কোনো ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবূল হয় না৷ হাদীস শরীফে এসেছে, আল্লাহ তা‘আলা কেয়ামতের দিন বান্দার আমলের প্রতিদান প্রদানের সময় বলবেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে যাদের দেখাতে তাদের কাছে যাও। দেখো তাদের কাছে তোমাদের কোনো প্রতিদান আছে কি না?’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২২৫২৮)

লেখক: সদস্য, কুমিল্লা জেলা যুব উলামা পরিষদ

-এটি

সর্বশেষ সব সংবাদ