fbpx
           
       
           
       
শিরোনাম :
মায়ের ভাষা মাতৃভাষা, আমাদের অহংকার
ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১ ৫:২৭ অপরাহ্ণ

শেখ খালিদ সাইফুল্লাহ।।

প্রত্যেক প্রাণীরই একটি নিজস্ব ভাষা রয়েছে,যে ভাষায় সে মনের ভাব প্রকাশ করে,যার দ্বারা সে দৈনন্দিন সকল কার্য্য সম্পাদন করে৷ তা আবার কেউ ইশারা-ইঙ্গিতে, কেউ আওয়াজ দিয়ে এবং কেউ ধ্বনি বা সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে প্রকাশ করে ৷সৃষ্টির সূচনা থেকে আজ অবধি এভাবেই একে অন্যের সাথে ভাবের আদান-প্রদান চলছে এবং চলতে থাকবে। কিন্তু আদম সন্তানের ভাষা ও মনের ভাব প্রকাশের ধরন বা নমুনা অন্যান্য প্রাণী থেকে ভিন্ন,এটি তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, তাদের শ্রেষ্ঠত্বের বহিঃপ্রকাশ।যাদের রয়েছে নিজস্ব বাকশক্তি, অঞ্চলবেদে ভাব প্রকাশের ভিন্নতা৷

মহান আল্লাহ তা’আলা আদম সন্তানকে ভাষার শিক্ষা দিয়েছেন পরোক্ষভাবে, অন্যের সাহায্যে আর আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-কে তিনি ভাষা শিখিয়েছেন প্রত্যক্ষভাবে, অকৃত্রিম উপায়ে। আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ আদমকে শেখালেন সব বস্তুসামগ্রীর নাম।’ (সুরা বাকারা : ৩১)
আদিকালে মানুষেরা কথা বলতো ইশারা-ইঙ্গিতে,প্রথমে উদ্ভূত শব্দ তারপর ধ্বনি বা আওয়াজ সৃষ্টি করে মনের ভাব প্রকাশ করতো। আর এভাবেই একের পর এক ধ্বনির সংযোগ, আওয়াজের সমন্বয় অতঃপর ধীরে ধীরে ভাষা সৃষ্টি ও আবেগে কথা বলার চর্চা সর্বশেষ ভাষার উৎপত্তি।

মাতৃভাষা মাতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ।একটি শিশু পূর্ণাঙ্গ শিশু হিসেবে জন্মলাভের আগ থেকেই তার মধ্যে মাতৃভাষার ভিত্তি রচিত হতে থাকে, মস্তিষ্কে কোষের সঞ্চালন ও গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যে শিশুটির জন্ম নিতে যাচ্ছে তার সঙ্গে মায়ের চিন্তা ভাবনা আবেগ-অনুভূতির মিশ্রন ও আত্মিক সংযোগ স্থাপিত হয়। শিশু জন্মের পর থেকে দেখে মা তার সঙ্গে কথা বলছে । মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সে বুঝতে পারে মায়ের কোন কোথায় সে হাসবে এবং মায়ের কোন কথায় থাকে আনন্দ দেয়ে,কোন কোথায় সে আপত্তি জানাবে তাও সে বুঝতে পারে।এভাবে উভয়ের মধ্যে গড়ে ওঠে হৃদ্ধতার সম্পর্ক,মাতৃত্বের ভালোবাসা, ভাবের আদান-প্রদান।শিশু কথা বলা শেখার আগ থেকেই কার্যত মনের বিভিন্ন ভাবাবেগ ধ্বনির মাধ্যমে প্রকাশ করতে থাকে।এভাবেই তার মাতৃভাষার প্রীতির প্রকাশ ও মায়ের ভাষাতেই একের পর এক কথা বলার সূচনা।

মানুষের সাথে মাতৃভাষার সম্পর্ক প্রাকৃতিক ও স্বভাবজাত। তাই মানুষ মাতৃভাষার সাহায্যে যত সহজে আপন মনোভাব প্রকাশ করতে পারে তা বিদেশি ভাষার সাহায্যে ততটুকু সম্ভব হয় না।তাই ইসলাম মানুষের এ স্বভাবজাত ধর্মের প্রয়োজনীয়তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করেছে। এজন্য
যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল দুনিয়ায় এসেছেন। তাঁরা নিজ জাতির ভাষায় ধর্ম প্রচার করতেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি সব রাসুলকে তাদের নিজ জাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে তারা পরিষ্কার করে বোঝাতে পারে।’ (সুরা ইব্রাহিম : ৪)

হযরত মুসা (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ভাষা ছিল ইবরানি। তাই তাওরাত নাজিল হয়েছে ইবরানি ভাষায়। হযরত দাউদ (আ.)-এর কওমের ভাষা ছিল ইউনানি। তাই জাবুর কিতাব নাজিল হয়েছে ইউনানি ভাষায়। হযরত ঈসা (আ.)-এর গোত্রের ভাষা ছিল সুরিয়ানি। তাই এ ভাষায় ইনজিল কিতাব নাজিল হয়। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের ভাষা ছিল আরবি। তাই আরবি ভাষায় কোরআন নাজিল হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলা কুরআন শরীফে বলেন- আমি কোরআন আরবী ভাষায় নাযিল করেছি যাতে তোমরা সহজে বুঝতে সক্ষম হয়।

ভাষা প্রকাশের রূপ রয়েছে দুটি একটি হলো মৌখিক আর অপরটি হলো লৌখিক, যেমনিভাবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে মনের ভাব প্রকাশের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা ও শিক্ষা রয়েছে,তেমনি ভাবে লিখিত পদ্ধতিটিও আল্লাহর শেখানো। আল্লাহ বলেন, ‘পড়ো, তোমার প্রভু মহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।’ (সুরা আলাক : ৩-৪)
লক্ষণীয় বিষয় হলো বর্ণিত আয়াতগুলোয় কোথাও কোনো বিশেষ ভাষার কথা বলা হয়নি। তাই সব ভাষাই আল্লাহর নিয়ামত। আদি পিতা আদমের সন্তান হয়েও মানুষের যেমন গোত্র-গাত্রবর্ণ, স্বর ও সুরের পার্থক্য আছে, তেমনি রয়েছে ভাষার ভিন্নতাও।

ভাষার এ বৈচিত্রতা মহান আল্লাহর এক অনুপম নিদর্শন। পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে এক নিদর্শন এই যে, নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। ’ –সূরা রুম: ২২

ইসলাম মাতৃভাষার প্রতি খুব-ই গুরুত্বশীল বিধায় আরবের বিভিন্ন পঠনরীতিতে কোরআন পাঠ করার অনুমতি দেয়ে। এ জন্য কোরআন পাঠে ‘সাত কিরাত’ (সাত পঠনরীতি) প্রচলিত আছে।

সুতরাং সর্বযুগে অঞ্চল বেধে ভাষার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে,শিশু তার মায়ের কাছ থেকে প্রথমে ভাষার চর্চা শুরু করে৷ মায়ের ভাষাই তার নিজের ভাষা,যে ভাষায় সে কথা বলতে শুরু করে, যা হচ্ছে তার মনের আবেগ ও অনুভূতি৷ যা নিয়ে সে গর্ব করে ৷সত্যিই মাতৃভাষা একটি গর্বের বিষয়, আমাদের অহংকার।নিজ মাতৃভাষা সম্পর্কে গর্ব করে মহানবী (সা.) বলতেন, ‘আরবদের মধ্যে আমার ভাষা সর্বাধিক সুললিত। তোমাদের চেয়েও আমার ভাষা অধিকতর মার্জিত ও সুললিত।’ (আল-মুজাম : হা. ২৩৪৫)। তিনি আরো বলেন-তোমরা আরবি ভাষা কে তিনটি কারণে ভালোবাসো; এক. আমি আরবি ভাষাভাষী। দুই. আল্লাহর পবিত্র কোরআন শরীফ আরবি ভাষায় অবতীর্ণ। তিন. জান্নাতবাসীদের ভাষাও হবে আরবী।এখানে লক্ষণীয় বিষয় এই যে, মহানবী তার মাতৃভাষা আরবীকে খুবই ভালবাসতেন এবং মাতৃভাষা আরবী হওয়াকে তিনি গর্ববোধ করতেন বিদায় প্রথমেই তিনি তাঁর মাতৃভাষার কথা উল্লেখ করেছেন।

জেনে রাখা দরকার ইসলামে কোন ভাষাই বিজাতীয় নয়।সব ভাষাই আল্লাহর সৃষ্টি এবং তার অন্যতম নিয়ামত। তাই আমরা কোন ভাষার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করব না, সেটা চায় আরবি হোক , উর্দু হোক অথবা ইংরেজি হোক। তবে অন্যান্য ভাষায় গুরুত্বারোপে মাতৃভাষাকে হেয় প্রতিপন্ন করা কখনোই সমিচীন নয়। বর্তমান যুগে বিশ্বের আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি, প্রয়োজনের খাতিরে ইংরেজি চর্চা করতে পারেন, না হলে সমাজে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল ।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আজ আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বসবাস করি। স্বাধীনতার পিছনে যেসব প্রধান কারণ রয়েছে,তার অন্যতম একটি হচ্ছে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি আমাদের ভাষার অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল।আমাদের বাক স্বাধীনতা খর্ব করতে চেয়েছিল৷ মরিয়া হয়ে উঠেছিল উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে। তাদের এই অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে বাংলাভাষা ভাষীরা গড়ে তুলেন তীব্র আন্দোলন। কিন্তু বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে মুখরিত করে তুলেন রাজপথ।

এই দূর্বার আন্দোলনে শামিল হয়ে মায়ের ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত উৎসর্গ করেন এদেশের বহু ছাত্র-জনতা।এভাবে মাতৃভাষার জন্য রক্তদান বা শাহাদত বরণের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার দীপ্ত শপথে উৎসর্গকৃত তাজা রক্তের বদৌলতে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করে এবং রক্তে রঞ্জিত ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় ভূষিত হয়।

আজ আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা,যা বিশ্বের প্রায় ২৫ কোটি মানুষেরও মুখের ভাষা। পরিসংখ্যানের দিক থেকে আমাদের ভাষা চতুর্থ বৃহত্তম মাতৃভাষা।

কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য; যে লক্ষ্য,চেতনা ও আবেগ নিয়ে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল, আন্দোলনের এতো বছর পরও এই সময়ে সেই চেতনার প্রতিফলন তথা মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি।যে আবেগ ও প্রেরণা নিয়ে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল,মাতৃভাষা বাংলার প্রতি নবপ্রজন্মের সেই ভালোবাসা নেই বলে মনে হচ্ছে। বাংলা ভাষা অনেকের কাছে প্রায় উপেক্ষার পাত্র হয়ে আছে। একশ্রেণীর আধুনিক শিক্ষকমহল আধুনিক শিক্ষিত মাতৃভাষায় অভিজ্ঞ হলেও মাতৃভাষা সর্বত্র ব্যবহার করতে লজ্জাবোধ করেন, তাই কথার ফাঁকে ফাঁকে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। তাদের দৃষ্টিতে ইংরেজি হচ্ছে আধুনিকতার নিদর্শন।

উচ্চবিত্তরা তাদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এটিকে অনেকে এক ধরণের আভিজাত্য বলে মনে করছেন। ফলে নব প্রজন্ম আজ মা-বাবার চেয়ে মাম্মী ডেড্ডীর ভাষাই মডার্ন বা স্ট্যান্ডার্ড কালচার বলে মনে করে।অপরদিকে তাদের স্ত্রীরা হিন্দি সিরিয়াল আর শিশুরা হিন্দি ড্রামা সিরিজ নিয়ে মাতোয়ারা থাকেন। হিন্দি গান ও নাচ ছাড়া তাদের কোনো অনুষ্ঠানই যেন জমে না। ফলে প্রজন্ম হিন্দি কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে এবং অনেকেই আজ বাংলায় কথা বলতে লয্যাবোধ করে৷ আবার একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এলেই দেখা যায় মাতৃভাষার প্রতি ওদের যত মায়াকান্না।আজ অফিস-আদালত ক্লিনিক হাসপাতাল শিক্ষাঙ্গনসহ সর্বত্র ইংরেজি আর ইংরেজি।বিদ্যালয় থেকে নিয়ে বিশ্ব বিদ্যালয় পর্যন্ত যেখানে শিক্ষার সাথে মাতৃভাষার চর্চা হওয়ার কথা সেগুলুতে চলছে ভিনদেশী অপসংস্কৃতির চর্চা হরদম৷এ ছিল কি আমাদের সেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের রক্তের মর্যাদা?

বাংলা ভাষার প্রতি এ রকম উদাসীনতা মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা ও ভাষা শহীদের আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন করার শামিল নয় কি? এ জন্য কি ভিনদেশী ভাষা ও বিজাতীয় সংস্কৃতিকে ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা চালুকারী অতি প্রগতিবাদীরা দায়ী নয়?

তাই আসুন! ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত এই মাসে শপথ নেই, মায়ের ভাষাকে ভিনদেশী আগ্রাসনমুক্ত করার। পরিহার করি ভিনদেশী ভাষাকে ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা। রুখে দাঁড়াই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে। মাতৃভাষার বিশুদ্ধ চর্চা ও প্রয়োগে সচেষ্ট হই।

পরিশেষে,ভাষা আন্দোলনের এই গৌরবোজ্জ্বল রক্তিম ইতিহাস জাতিকে অনুপ্রাণিত করবে যুগ থেকে যুগান্তরে এটি আমাদের প্রত্যাশা।সেই সঙ্গে যারা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে শাহাদাৎবরণ করেছেন মহান প্রভুর কাছে তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

লেখক: শিক্ষক,ঢাকা দক্ষিণ দারুল উলুম হুসাইনিয়া মাদ্রাসা, সিলেট।

-এটি

সর্বশেষ সব সংবাদ