196555

করোনায় লিভার সিরোসিসের রোগীরা ঝুঁকিতে

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

সারাবিশ্বে বর্তমানে করোনা ভাইরাস আতষ্ক বিরাজ করছে এর বাইরে সমস্যায় আছে লিভারের রোগীদের সংক্রমণজনিত রোগ ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমণ, নিউমোনিয়া ও রেসপিরেটরি ফেইলিওর হয়ে থাকে। এই ভাইরাস লিভারের সরু রক্তনালী ও পিত্তনালীকেও আক্রান্ত করে। কোনো কোনো সময় কভিড-১৯ চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্যও লিভার আক্রান্ত হতে পারে।

আক্রান্তদের ১৪ থেকে ৪৫ ভাগের লিভারের ক্ষতি হতে পারে। তখন লিভারের এসটি, এএলটি ও বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। লিভার থেকে প্রস্তুত অ্যালবুমিনের পরিমাণও কমে গিয়ে রোগী ঝুঁকিতে পড়ে,আজ করোনাকালে ঝুঁকিকে আছে লিভার সিরোসিসের রোগী নিয়ে কলাম লিখেছেন, বাংলাদেশের বিশিষ্ট হোমিও গবেষক ও দৈনিক স্বাস্থ্য তথ্য সম্পাদক ও প্রকাশক, ডা.এম এ মাজেদ তার কলামে লিখেন, লিভার সিরোসিস হলো আঁতকে ওঠার মতো একটি রোগের নাম। সিরোসিস শুনলেই যেন মনে আসে আরেকটি ভয়াবহ রোগের নাম লিভার ক্যান্সার। সিরোসিস আর ক্যান্সার সাধারণ মানুষের কাছে একে অপরের সমার্থক। আসলে ব্যাপারটি কিন্তু ঠিক তা নয়। রোগ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে অনেকে লিভার সিরোসিসকে লিভার ক্যান্সারের সাথে তুলনা করে।

সিরোসিস কি?
সিরোসিস লিভারের একটি ক্রনিক রোগ যাতে লিভারের সাধারণ গঠন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে লিভার হারায় তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা। অনেক ক্ষেত্রেই লিভার সিরোসিস থেকে লিভারে ক্যান্সারও দেখা দিতে পারে। তবে এসব কোন কিছুই হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন স্ট্রোকের মতো সহসা ঘটে না। সিরোসিসের রোগী বহু বছর পর্যন্ত কোন রকম রোগের লক্ষণ ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। ঠিক একইভাবে সিরোসিসের কারণে লিভারে সামান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে অথবা সমস্যাটি হতে পারে অনেক বড়। রোগের লক্ষণ আর কষ্টগুলো দেখা দেয় ডিকম্পেনসেটেড বা অ্যাডভান্সড সিরোসিসের কারণে যখন লিভারে বড় ধরনের গোলযোগ দেখা দেয়।

সিরোসিসের লক্ষণ:
আগেই যেমনটি বলেছি, কম্পেনসেটেড সিরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তির তেমন কোন লক্ষণ থাকে না বললেই চলে। অনেক সময় রোগীরা শারীরিক দুর্বলতা, সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে, দাঁতের মাড়ি বা নাক থেকে রক্ত পড়া, পেটের ডান পাশে ব্যথা, জ্বর-জ্বর ভাব, ঘন-ঘন পেট খারাপ হওয়া ও পাতলা পায়খানা ইত্যাদি সমস্যা অনুভব করতে পারেন। অ্যাডভান্সড সিরোসিস চিত্রটি কিন্তু একদম বদলে যায়। এ সময় পায়ে-পেটে পানি আসে, জন্ডিস হয় এবং রোগী অনেক সময় অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারেন। রক্তবমি ও পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া, ফুসফুসে পানি আসা, কিডনি ফেইলিউর, শরীরের যে কোন জায়গা থেকে রক্ত বের হওয়া ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। আর সিরোসিস ব্যক্তির শীরের সিরোসিস সব চেয়ে আতঙ্কের ও ভয়াবহের তা পরবর্তিতে লিভারে ক্যান্সারে আক্রমণ করতে পরে।

সিরোসিস কেন হয়?

এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় ব্যক্ত করা যাবে না, অঞ্চল, এলাকা ও দেশভেদে সিরোসিসের অনেক ধরনের কারণ থাকতে পারে। ইউরোপ ও আমেরিকার সিরোসিসের প্রধান কারণ অ্যালকোহল আর হেপাটাইটিস সি ভাইরাস। আমরা বাংলাদেশে অনেক রোগীর উপর পর্যবেক্ষণ ও জরিপ করে দেখতে পেয়েছি যে, আমাদের দেশে লিভার সিরোসিসের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস বি ভাইরাস। এর পরের ধাপেই রয়েছে ফ্যাটি লিভার। হেপাটাইটিস সি ভাইরাস ও অ্যালকোহলের স্থান বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ও ফ্যাটি লিভারের অনেক পরে। ফ্যাটি লিভার নানা কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাশ্চাত্যে পরিচালিত গবেষণা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পড়ে দেখা যায় ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত প্রায় ৩০ শতাংশ রোগী পরবর্তীতে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন। আমাদের দেশেও আমরা ফ্যাটি লিভারজনিত কারণে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের রোগী আমাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসে। অতএব সকলকে সাবধানতা অবলম্ব করতে হবে এবং যথাসময় হোমিও চিকিৎসা নিলে রোগী দ্রুত আরোগ্য লাভ করে।

সিরোসিস হলে কি করবেনঃ
সিরোসিসে আক্রান্ত যে কোন ব্যক্তির উচিত দ্রুত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা নেয়া এবং নিয়মিত ওষুধ সেবন করা। যথা সময়ে চিকিৎসা নিলে দ্রুত আরোগ্য হয়ে সুস্থ জীবন করা যায় ও দীর্ঘদিন ভালো থাকা যায়। পাশাপাশি সিরোসিসের কারণ শনাক্ত করে তার চিকিৎসা করলে লিভার খারাপের দিকে যাওয়ার ঝুঁকিও কমে যায়। লিভার সিরোসিস ও এর কারণগুলোর আধুনিক চিকিৎসা আজ আমাদের দেশেই হোমিওপ্যাথিতে সম্ভব। এদেশে যা নেই তা হলো লিভার প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা। বিভিন্ন দেশে এ সুযোগ থাকলেও তা খুব ব্যয়বহুল আর সঙ্গত কারণেই আমাদের দেশের সিংহভাগ রোগীর সাধ্যের বাইরে। তবে আশার কথা এই যে, এদেশে লিভার সিরোসিসের চিকিৎসা বাংলাদেশে সুন্দর ও সফল ভাবে হবে।

লিভার ক্যান্সারের লক্ষণঃ
কখনো কখনো বেশি পেটে ব্যথা অনুভব করলে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে, পেটের ডান পাশে নিয়মিত ব্যথা হলে তা লিভার ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। লিভার ক্যান্সার বোঝার জন্য একজন চিকিৎসক এ লক্ষণটি চিহ্নিত করে।

লিভারে কোনো ফোঁড়া বা পিন্ড দেখা দিতে পারে। পেটের ওপরে বা নিচের ফোঁড়া ও পিন্ডের মতো অংশ দেখা দিতে পারে। এর পাশাপাশি মাঝে মাঝে পেট ভরা থাকতে পারে। এসব লক্ষণ লিভার ক্যান্সার হলে দেখা দেয়। অনেক সময় পেট ফুলে যেতে পারে। তাই পেট ফুলে গেলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ এটি ক্যান্সার কোষের অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে হতে পারে। আর লিভারে তরল পদার্থ জমে যাওয়ার কারণে পেটে বা লিভারের মধ্যে চাপ বৃদ্ধি পায়। এ কারণে লিভারের কর্মক্ষমতা কমে যায় ও লিভারের অকার্যকরিতা দেখা দিতে পারে।

জন্ডিসে আক্রন্ত হলে তা লিভার ক্যান্সারের লক্ষণ হিসেবে ধরা যায় না। জন্ডিস কিছু কিছু সময় লিভার ড্যামেজের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবেও দেখা দিতে পারে। যা পরবর্তিতে লিভারে ক্যান্সারে পরিণত হতে পারে। ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া ও প্রসাব গাড় হলে কখনই অবহেলা করা উচিত নয়। যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।অবসাদ লিভারের ক্যান্সারের সঠিক কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। কিন্তু অনেক সময় বিশ্রাম নেওয়ার পরও অনেক বেশি ক্লান্তি অনুভব করা বা অল্প পরিশ্রমে বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়লে অবহেলা করা উচিত নয়। এগুলো পাশাপাশি যদি যদি পেটে ব্যথা বা জ্বর থাকে তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অনেক সময় সাধারণ কারণে বা ইনফেকশনের কারণে জ্বর হতে পারে। পেটে ফুলে থাকা বা পেট ব্যথার সঙ্গে যদি জ্বর জ্বর অনুভূত হয় তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ক্ষুদা কমে যাওয়া বা পেট ভরা ভরা অনুভর করা লিভার ক্যান্সারের লক্ষণ প্রকাশ করে থাকে। ক্ষুদা কমে গেলে শরীরের ওজন কমে যায়। শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের না হলে লিভারের কাজে বাধা সৃষ্টি হয়। তাই লিভার ক্যান্সার হতে পারে।

এছাড়াও নারীদের থেকে পুরুষের লিভার ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। ক্রোনিক ইনফেকশন বা হেপাটাইটিস বি বা সি থাকলে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। লিভারের অনেক বেশি আয়রন জমা হলেও ক্যান্সারের ঝুকি বেড়ে যায়।

লিভার সিরোসিস রোগীদের জন্য কিছু পরামর্শঃ-
অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান লিভার সিরোসিসের অন্যতম কারণ।সাধারণত ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করলে লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি থাকে। লিভারে প্রদাহ সিরোসিসের আরেকটি কারণ। সাধারণত এ,বি, সি ভাইরাসের আক্রমন করলে লিভার সিরেসিস হতে পারে।এগুলো রক্তদান বা গ্রহণের সময় শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এ কারণে রক্ত দেওয়া বা নেওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা করা উচিত। মসলাদার, জাঙ্কফুড, প্রক্রিয়াজাত খাওয়া এড়িয়ে চলুন। রাস্তাঘাটে সহজপ্রাপ্য খাবার না খাওয়াই ভাল। বরং দৈনিক খাদ্য তালিকায় বেশি করে শাকসবজি রাখুন এবং কম তেলযুক্ত খাবার খান।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে ২ থেকে ৩ বার কফি খান তাদের লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি অন্যান্যদের তুলনায় কম থাকে। কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন শরীরের টক্সিনকে বের করতে সাহায্য করে। তাই প্রতি দিন খাদ্য তালিকায় কিছুটা কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন রাখুন। শরীরের কোথাও ব্যথা বাড়লেই তা সহ্য না করে যখন তখন ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা লিভারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। ব্যথানাশক ওষুধে ব্যবহৃত নানা উপাদান লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে লিভারের ক্ষতি করে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন। কেউ হেপাটাইসিস বি বা সি তে আক্রান্ত হলে স্ক্রিনিং করুন। লিভার সিরোসিস প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে তা অনেকক্ষেত্রে নিরাময় করা সম্ভব।

হোমিও সমাধানঃ- রোগ নয় রোগিকে চিকিৎসা করা হয়, এই জন্য লিভার সিরোসিসের প্রাথমিক ও মারত্মক লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় লিভার সিরোসিসের রোগিকে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করলে আল্লাহর রহমতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাতে সম্ভব।

লেখক,সম্পাদক ও প্রকাশক,দৈনিক স্বাস্থ্য তথ্য স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা, হিউম্যান রাইটস রিভিউ সোসাইটি কেন্দ্রীয় কমিটি কো-চেয়ারম্যান,হোমিওবিজ্ঞান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

-এটি

ads