191831

কুরআনের এক মহান খাদেম মাওলানা কারী বেলায়েত হুসাইন রহ.

জহির উদ্দিন বাবর।।

মহাগ্রন্থ আল কুরআনের খেদমতে বিশেষ অবদান রেখে যারা ‘স্বর্ণমানব’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন তাদেরই একজন হজরত মাওলানা কারী বেলায়েত হুসাইন রহ.। পবিত্র কুরআনের খেদমতকে তিনি জীবনের মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে কুরআনের বিশুদ্ধ তেলাওয়াত ও এর চর্চা জারি করার পেছনে বিশাল ভূমিকা তাঁর। সর্বমহলে স্বীকৃত নূরানী পদ্ধতির আবিষ্কারক তিনি। নিজ হাতে গড়েছেন কুরআনের অগণিত শিক্ষক। দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাঁর লাখো ছাত্র।

একজীবনে তিনি কুরআনের যে খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন তাকে ‘নীরব বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। দ্বিতীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে কুরআনের মহান খেদমতের জন্য তাঁর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার কথা থাকলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি। তবে দীনের মুখলেস এই খাদেম পার্থিব কোনো চাওয়া-পাওয়ার জন্য এই খেদমত আঞ্জাম দেননি, মাওলা পাকের দরবারে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর জীবনের পবিত্র মিশন। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁকে উত্তম বদলা দেবেন।

জন্ম ও প্রাথমিক পড়াশোনা

মাওলানা কারী বেলায়েত হুসাইন রহ.-এর জন্ম ১৯১০ সালে চাঁদপুরের শাহরস্তিতে। তাঁর বাবার নাম মুন্সি আবদুল জলীল, মায়ের নাম সাইয়েদা খাতুন। তাঁর বয়স যখন তিন বছর তখন বাবা ইন্তেকাল করেন। আর মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি হারান মাকে।

তাঁর কোনো ভাই ছিলেন না। বড় দুই বোন ছিলেন। ছোট বোন তাঁর থেকে ১৮ বছরের বড় ছিলেন। বোনদের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। শিশুকালে বাবা-মাকে হারিয়ে তিনি অভিভাবকশূন্যতায় ভুগেন। কারী বেলায়েত রহ.-এর বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে বড় আলেম বানানো। কিন্তু সে স্বপ্ন তিনি পূরণ করতে পারেননি। কারী সাহেবের চাচা ঢাকার চকবাজারের বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। মা-বাবার ইন্তেকালের পর এই শিশুকে তিনি নিয়ে আসেন। কারী সাহেব চাচার দোকানে চাকরি শুরু করেন। এখানে দুই বছর চাকরি করেন।

তাঁর বয়স তখন সাত বছর। একবার তিনি বাড়ি গেলে বড় বোন তাকে বললেন, আব্বা তোমাকে আলেম বানানোর নিয়ত করেছিলেন, কিন্তু চাচার কাছে থাকলে তো তুমি আলেম হতে পারবে না। তখন কারী বেলায়েত রহ. বলেন, আমিও তো পড়তে চাই। কিন্তু চাচার এখানে থেকে তা সম্ভব হবে না। তাই তিনি এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলেন চাচার দোকান থেকে চলে যাবেন।

এবার উঠলেন এক খালার বাড়িতে। তাঁর খালু ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তিনি এটা ভালো চোখে নেননি। বললেন, আমার বাড়িতে থাকলে গরু-ছাগল চড়াতে হবে। অবসর সময় পেলে পড়াশোনা করবে। একদিন তার খালাতো ভাইয়েরা পড়ছিলেন। এ সময় একজন ভুল পড়লেন। তখন কারী সাহেব ভুল ধরিয়ে দিলেন। এটা দেখে খালু বিস্মিত হলেন। ভাবলেন, এই ছেলে পড়াশোনা না করেও এভাবে ভুল ধরতে পারলো! নিশ্চয় সে অনেক মেধাবী। তাই তিনি বললেন, ঠিক আছে তুমিও পড়ো। স্কুলে যাবার সময় ছাগল মাঠে দিয়ে যাবে আবার আসার সময় নিয়ে আসবে। এভাবে ছয় মাস কাটলো।

মুজাহাদানা জিন্দেগি
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বারোপাইয়া গ্রামে মাওলানা ক্বারী সিরাজুল ইসলাম সাহেবের একটি মাদরাসা ছিল। এই মাদরাসার সন্ধান পেয়ে কারী সাহেব সেখানে চলে গেলেন। হুজুররা খুব মহব্বতের সাথে একটি লজিংয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। কিন্তু লজিংয়ে তো পড়াতে হবে। আর তিনি তো পড়াশোনা জানেন না। তাই কারী সিরাজুল ইসলাম বললেন, ‘বেলায়েত! শোনো, আমার কাছ থেকে প্রতিদিন যাই পড়বা তাই গিয়ে তোমার লজিং বাড়িতে বাচ্চাদের পড়াইবা। আর এখানে কিতাবের সবক ধরবা।’

এই মাদরাসায় তিনি কাফিয়া পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। ফাঁকে ফাঁকে ওই সময়েই তিনি দর্জি কাজ শিখে নেন। রমজানে মাদরাসা ছুটি থাকতো। এই সময়ে তিনি কাটিং মাস্টারি করে সারা বছরের খরচ যোগাতেন। তাঁর জীবনে শত কষ্ট সত্ত্বেও তিনি জাকাত-ফেতরা গ্রহণ করেননি। মাদরাসার ফ্রি খাবার তিনি কখনও খাননি।

দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত বড় কাটারা মাদরাসায়
ঢাকার আশরাফুল উলূম বড়কাটারা মাদরাসা তখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাত্র। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এবার তাহলে বড়কাটারায় চলে যাই। তিনি বারোপাইয়া মাদরাসা থেকে বড়কাটারা মাদরাসায় চলে এলেন। এখানে এসেই পেয়ে গেলেন বিখ্যাত ব্যক্তিদের। শামছুল হক ফরিদপুরী রহ., হাফেজ্জী হুজুর রহ., পীরজি হুজুর রহ.সহ সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেমদের সোহবত পেয়ে ধন্য হলেন।

রমজানে কাটিং মাস্টারি করে জমানো যে টাকা নিয়ে এসেছিলেন তা তিন-চার মাস যেতেই শেষ হয়ে গেল। মাদরাসায় তখন টাকা দিয়ে খেতে হতো। টাকা শেষ হওয়ায় তিনি পড়লেন কষ্টে। নদীর ওপার কালিগঞ্জে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে একটা লজিংয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া হলো মাদরাসা থেকে। প্রতিদিন সকালে লজিং থেকে হেঁটে হেঁটে মাদরাসায় এসে সবকে অংশগ্রহণ করতেন এবং আবার চলে যেতেন। লজিং বাড়ির মসজিদে তাঁকে নামাজ পড়াতে হতো। জোহর বাদে চার ওয়াক্ত এবং জুমার নামাজ পড়াতেন। বেতনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, শুধু খাওয়া-থাকার বিনিময়ে।

একবার ঘটল এক ঘটনা। রমজানের ঈদ কাছাকাছি। এক নামাজের পর তিনি মসজিদে বসে আছেন। এমন সময় মসজিদের মুতাওয়াল্লি একটি তালিকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনাদের এখনও যাদের ফেতরার টাকা বাকি আছে দিয়ে দেন। কারী বেলায়েত রহ. উঠে বললেন, কিসের জন্য এই টাকা! মুতাওয়াল্লি বললেন, আপনার বোঝার দরকার নেই। আমরা প্রতি বছরই ফেতরার টাকা উঠিয়ে ইমাম সাহেবকে দিয়ে থাকি। এ সময় কারী সাহেব বললেন, তালিকাটা আমার হাতে দিন। তিনি তালিকাটি হাতে নিয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিলেন। মুতাওয়াল্লি রাগে গজগজ করে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘থাক থাক, আপনারা যারা যারা আমার কাছে ফেতরার টাকা দিয়েছেন সবাই নিয়ে নেবেন। আমগো ইমাম সাব বড় লোক; তিনি ফেতরার টাকা খান না।’ অথচ তার অবস্থা তখন খুবই শোচনীয় ছিল। গায়ে দেয়ার মতো ভালো জামা পর্যন্ত ছিল না।

কর্মজীবনের শুরুর কথা
কারী বেলায়েত রহ. ১৯৪৮ সালে দাওরায়ে হাদিস ফারেগ হন। শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. ফারেগিনদের উদ্দেশ্যে শেষ নসিহতে বলেছিলেন ‘ফারেগ হয়ে সবাই শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত থাকবে।’ ছাত্ররা সবাই বিদায় হয়ে চলে গেল। তিনি ফরিদপুরী রহ. এর কাছে গিয়ে বললেন, ‘হজরত! আপনি তো সবাইকে পড়ানোর নসিহত করেছেন, আমারও তো পড়াতে ইচ্ছে হয় কিন্ত আমি তো কোনো কিতাব বুঝি নাই, আমি কেমনে পড়ামু। আমাকে যদি কাজে লাগাতে হয়, তাহলে আমাকে আবার পড়াতে হবে।’ ফরিদপুরী রহ. জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তোমার মতো একটা ছেলেকেই তো আমি খুঁজছি। যেখানে ছাত্ররা সময় দিতে প্রস্তুত না, তুমি সময় চেয়ে নিচ্ছো। তোমাকে দিয়েই আসলে অনেক কাজ করা যাবে। তুমি চলো আমার সাথে।’

মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. কারী সাহেবকে সাথে নিয়ে গেলেন তার প্রতিষ্ঠিত গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদরাসায়। তিনদিন মেহমান হিসেবে থাকলেন। তিন দিন পর মাদরাসার মুহতামিমকে ডেকে ফরিদপুরী রহ. বললেন ‘তুমি এই ছেলেটার সাথে কথাবার্তা বলে তাকে কাজে লাগাও’। মুহতামিম সাহেব কারী সাহেবকে বললেন ‘আপনাকে আমরা আমাদের মাদরাসায় রেখে দিতে চাই, আপনার তাকাযা কেমন, কী রকম দিতে হবে আপনাকে? বললে ভালো হতো।’ তখন কারী সাহেব বললেন ‘আমি তো বুঝি না, কী বলছেন আপনি; আমি তো এখানে পড়তে এসেছি; পড়াতে নই।’

মুহতামিম সাহেব ছদর সাহেবের কাছে তা বললে তিনি বললেন, ঠিক আছে, তাকে ডাকো। ছদর সাহেব তাঁকে পড়াতে বললে তিনি বললেন, ‘আমি তো পারি না’। ছদর সাহেব তখন বললেন ‘তুমি আমার কাছ থেকে সবক শিখবা তারপর পড়াইবা। মসজিদের ইমামতিও করবা, জুমা পড়াইবা, খুতবা কী পড়বা সেটাও আমাকে শুনাইবা’। এখানে তিনি দুই বছর ছিলেন।

মুহতামিম হিসেবে চাঁদপুরে
ছদর সাহেব হুজুরের কাছে চাঁদপুরের জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম জাফরাবাদ মাদরাসার জন্য একজন মুহতামিমের আবেদন করা হলো। তিনি বললেন ‘বেলায়েত! আল্লাহর হাওলা করে তুমি জাফরাবাদ মাদরাসার মুহতামিমেরর দায়িত্ব নাও’। ছদর সাহেব কারী বেলায়েত রহ.কে জাফরাবাদে পাঠিয়ে দিলেন। এখানে তিনি কিছুদিন থাকার পর এখানকার শিক্ষকরা লিখিতভাবে ছদর সাহেব হুজুরের কাছে একটা অভিযোগ পাঠালেন। তারা লিখলেন- ‘আমাদের মুহতামিম সাহেব ক্লাস নেবেন দাওরায়ে হাদিস বা এর উপরের। কিন্তু তিনি উপরের ক্লাস তো নেনই না, সারাদিন বাচ্চাদের ক্লাস নিয়ে বসে থাকেন’। এ চিঠির খবর জানতে পেরে কারী সাহেব ছদর সাহেব হুজুরের কাছে চিঠি লিখলেন- ‘এখানে আরও যোগ্য লোক দেন, যারা বড়দের পড়াতে পারবেন, আমার তো বাচ্চাদের দিকে ঝোঁক বেশি। বাচ্চাদের পড়াইতেই আমার ভালো লাগে বেশি। আমি আল্লাহর ওয়াস্তে আপনার কাছ থেকে ইস্তফা চাচ্ছি’।

সেখান থেকে বাড়ি এসে উঠলেন। ওয়ারিস সূত্রে যে জমি পেলেন তার কিছু জায়গা বন্ধক রেখে এলাকার ও নিজের জায়গা মিলিয়ে মাদরাসা খুলে নিজের খেয়ে পড়াতে লাগলেন। যেভাবে পড়ালে বাচ্চারা কুরআনুল কারিম শুদ্ধ করে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ইলমে ফরিজাহ (ইসলামের আবশ্যকীয় জ্ঞান) অর্জন হবে সেভাবে নিজের মতো করে পড়াতে লাগলেন। ১৯৬০ সালে চাঁদপুর গনী হাই স্কুলের মসজিদে প্রথম মুআল্লিম ট্রেনিং শুরু করেন।

হাফেজ্জী হুজুরের সান্নিধ্যে
কয়েক বছর সেখানে দায়িত্ব পালনের পর হাফেজ্জী হুজুর রহ. তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। স্বাধীনতার আগে হাফেজ্জী হুজুর যখন ফরিদাবাদ মাদরাসার মুহতামিম ছিলেন তখন কারী বেলায়েত রহ. ছিলেন সেখানকার মক্তব বিভাগের জিম্মাদার। তখন হাফেজ্জী হুজুর কামরাঙ্গীচরে কিছু পান। সেখানে মাদরাসায়ে নূরিয়ার প্রতিষ্ঠালগ্নে জিম্মাদারির দায়িত্ব পালন করেন কারী বেলায়েত রহ.। তিনি তখন থাকতেন গেন্ডারিয়ার মীরের বাগ। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে প্রায় কোমর পানি ভেঙে তিনি কামরাঙ্গীচরে যেতেন। এ সময় হাফেজ্জী হুজুর রহ. চার মাসের জন্য বায়তুল মুকাদ্দাস সফরে যান। হাফেজ্জী হুজুরের অবর্তমানে কারী বেলায়েত রহ. মাদরাসার সার্বিক উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন এবং হুজুরের দর্শন, উম্মতের দরদ এবং ফিকির নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। স্বাধীনতার আগপর্যন্ত তিনি কামরাঙ্গীচর মাদরাসায় ছিলেন। পরে বিভিন্ন বিরোধের কারণে এক পর্যায়ে তিনি কামরাঙ্গীচর থেকে চলে আসেন।

একদিন হাফেজ্জী হুজুর রহ. তাঁকে বলেছিলেন- তুমি বিকল্প ইসলামী প্রাইমারির ব্যবস্থা কর। এরও আগে ছদর সাহেব রহ. তাঁকে বোর্ডে লিখে পড়ানোর কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করা যায় কি না তা নিয়ে চিন্তা করতে বলেছিলেন। মূলত এই দুই বুজুর্গের প্রেরণায় তিনি প্রাইমারির বিকল্প হিসেবে নূরানী পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। কামরাঙ্গীচর থেকে বেরিয়ে তিনি প্রায় দুই তিন বছর বিভিন্ন স্থানে তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে কুরআন শেখাতে থাকেন।

একদিন হাফেজ্জী হুজুর রহ. নাসায়ী শরিফের ফাজায়েলে কুরআন অধ্যায় পড়াচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি আক্ষেপ করে বললেন, বেলায়েত আমাকে ছেড়ে চলে গেছে! সেই ক্লাসের ছাত্র ছিলেন কারী বেলায়েত সাহেবের ভাগিনা মাওলানা জাফর সাহেব। তিনি হাফেজ্জী হুজুরকে বললেন, হুজুর! আমি কি মামাকে নিয়ে আসবো? হাফেজ্জী হুজুর বললেন, নিয়ে এসো। কিন্তু কারী সাহেব কোথায় আছেন জানা নেই। তাই তিনি তার মামীর কাছে গেলেন। কারী সাহেবের স্ত্রী জানালেন, নোয়াখালীর চৌমুহনী মসজিদের ইমাম সাহেব এ ব্যাপারে বলতে পারবেন। জাফর সাহেব গেলেন সেই ইমাম সাহেবের কাছে। ইমাম সাহেব জানালেন, নোয়াখালীর শরীফপুরে তিনি আছেন। সেখানে গিয়ে সব খুলে বলার পর কারী সাহেব হাফেজ্জী হুজুরের কাছে চলে এলেন। হাফেজ্জী হুজুর তাঁকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। অনেক আদর-আপ্যায়ন করলেন। তাঁকে আবার কামরাঙ্গীচর মাদরাসার দায়িত্ব নিতে বললেন। কিন্তু তিনি তাতে অপারগতা পেশ করলেন। পরে হাফেজ্জী হুজুরের পরামর্শে বিভিন্ন স্থানে নূরানী ট্রেনিং করাতে থাকলেন। শুধু রমজানে কামরাঙ্গীচরে ট্রেনিং করাতেন।

কুরআনের মিশন বাস্তবায়নে
১৯৭৯ সালের কথা। কিশোরগঞ্জে নিউ মোবারক হোটেলের মালিক হাজী মফিজ সাহেবের অনুরোধে তিনি শোলাকিয়ায় বাগে জান্নাত মাদরাসা গড়ে তুলেন। তিনি সেখানে কিছুদিন ছিলেন। পরে তাঁর বিশেষ শাগরেদ কারী রহমতুল্লাহ সাহেবকে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেন। ১৯৮০ সালের দিকে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। হাজী আবদুল মালেক সাহেব তাঁর চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করেন। হাফেজ্জী হুজুর তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যান এবং দীর্ঘ সময় কথা বলেন। সুস্থ হওয়ার পর তিনি হজে যান। হজ থেকে ফিরে আসার পর হাফেজ্জী হুজুর তাঁকে একটি মারকাজ করার নির্দেশ দেন। তখন তিনি বলেন, আমি জায়গা পাবো কোথায়? হাফেজ্জী হুজুর বললেন, আমি জায়গার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। পরে হাজী সিরাজদ্দৌলা সাহেবকে জায়গা দিতে বললেন। হাজী সাহেব মোহাম্মদপুরে জায়গার ব্যবস্থা করে দিলেন।

তখন থেকে হাজী আবদুল মালেক সাহেবের সহযোগিতায় সুন্দরভাবে চলছিল মারকাজ। ১৯৮৪ সালে নূরানী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে নূরানী সিলেবাসে প্রাথমিক পর্যায়ের বাংলা-ইংরেজি ঢোকানোর প্রস্তাব করেন কারী বেলায়েত রহ.। এট নিয়ে মতভিন্নতা দেখা দেয়। পরে তিনি মোহাম্মদী হাউজিংয়ে আলাদা মারকাজ গড়ে তোলেন। ১৯৮৪ সাল থেকে সেখানেই চলে আসছে মারকাজের কার্যক্রম। মাঝে ২০০১ সালে একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় চার মাস বন্ধ ছিল এই মারকাজ। এখন কাজলায় হাজী ইবরাহীম সাহেবের দেয়া পৌনে তিন বিঘা জমির ওপর মারকাজ গড়ে উঠছে।

কারী বেলায়েত রহ.-এর প্রথম সারির শিষ্যদের অন্যতম হলেন মাওলানা কারী রহমতুল্লাহ, মাওলানা হুসাইন আহমদ, মাওলানা হেলালুদ্দীন, মুফতী জাফর আহমদ, মাওলানা আবু সাঈদ, মাওলানা কারী কেফায়েতুল্লাহ, মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী প্রমুখ।

মাওলার ডাকে সাড়া

কারী বেলায়েত রহ. দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভোগার পর ২৮ রমযানুল মুবারক ১৪৩৮ হি:, ১০ আষার ১৪২৪ বাংলা, ২৪ জুন ২০১৭ ইংরেজি শনিবার দুপুরে মাওলার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং চাঁদপুরের শাহরস্তির গ্রামের বাড়িতে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর ছয় ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলে-মেয়েসহ পরিবারের সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

কারী বেলায়েত রহ. অত্যন্ত সাদাসিধে ও শুভ্র চরিত্রের মানুষ ছিলেন। জীবনভর কুরআনের খাদেম হিসেবেই নিজেকে পরিচয় দিতেন।

কুরআনের খেদমতেই নিয়োজিত ছিলেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে। হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. ছিলেন তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু। হাফেজ্জী হুজুরের কাছ থেকে খেলাফতও লাভ করেছিলেন। আধ্যাত্মিক লাইনেও মানুষ তাঁর দ্বারা উপকৃত হয়েছেন। আল্লাহ তাঁর যাবতীয় খেদতম কবুল করুন। তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। আমিন।

-এটি

Please follow and like us:
error1
Tweet 20
fb-share-icon20

ad