fbpx
           
       
           
       
পাকিস্তানিরা একে অপরকে কুপোকাত করতেই ব্যস্ত
জুন ১৬, ২০১৬ ৯:০৩ অপরাহ্ণ
People gather near a national flag during a ceremony to celebrate the country's 69th Independence Day at the mausoleum of Muhammad Ali Jinnah in Karachi, Pakistan, August 14, 2015. Jinnah is generally regarded as the founder of Pakistan. REUTERS/Akhtar Soomro

People gather near a national flag during a ceremony to celebrate the country’s 69th Independence Day at the mausoleum of Muhammad Ali Jinnah in Karachi, Pakistan, August 14, 2015. Jinnah is generally regarded as the founder of Pakistan. REUTERS/Akhtar Soomro

হামিদ মীর

পাকিস্তান ও আমেরিকার মাঝে ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতা উত্তেজনার সীমা ছুঁতে চলেছে। আমেরিকা ড্রোন হামলার পরিধি উপজাতীয় অঞ্চল ও খায়বার-পাখতুনখাওয়া থেকে বাড়িয়ে বেলুচিস্তান পর্যন্ত বিস্তার ঘটিয়েছে এবং এটা পাঞ্জাব পর্যন্তও পৌঁছতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মুখপাত্র দাবী করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অনুমতি নিয়েই পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের আহমদওয়াল এলাকায় আফগান তালেবান নেতা মোল্লা আখতার মনসুরকে ড্রোন হামলার নিশানা বানানো হয়েছে। আফগান তালেবান মোল্লা আখতার মনসুরের মৃত্যুর দাবী প্রত্যাখ্যান করলেও মার্কিন কর্তৃপক্ষের জোরালো দাবী, মোল্লা আখতার মনসুর মারা গেছেন। নুশকির কাছে আহমদওয়াল এলাকায় একটি গাড়ির ওপর মার্কিন ড্রোন হামলার ফলে দুজন ব্যক্তি মারা যান। গাড়ির চালকের নাম মুহাম্মদ আজম। আর ওই গাড়িতে ভ্রমণরত যাত্রীর মালপত্র থেকে পাওয়া পাসপোর্টে নাম লেখা ছিল ওলী মুহাম্মদ, যিনি কেল্লা আব্দুল্লাহর অধিবাসী। গাড়িতে মোল্লা আখতার মনসুর সফর করছিলেন কিনা তা সুনিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, তবে আমেরিকার কাছে এ খবর রয়েছে, মোল্লা আখতার মনসুর পাকিস্তানে গা-ঢাকা দিয়ে আছেন। আমরা জানি না, আমেরিকা এ হামলা পাকিস্তানের ইচ্ছায় করেছে কি না, তবে আমেরিকার তো এ অনুমান থাকার কথা, মোল্লা আখতার মনসুরের ওপর হামলার পর আফগান তালেবানকে আলোচনার টেবিলে আনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আফগান তালেবানকে আলোচনার টেবিলে আনার প্রচেষ্টা ২০১০ সাল থেকে অব্যাহত রয়েছে। ওই প্রচেষ্টার মধ্যে আফগান তালেবানের কিছু নেতার সাথে কঠোর ব্যবহারও করা হয়, যার ওপর তারা অসন্তুষ্ট হয়েছে। মোল্লা আব্দুল গনী বেরাদারের গ্রেফতারিতে তাইয়েব আগা নারাজ হয়ে পাকিস্তান ছেড়ে চলে যান। মোল্লা ওমরের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী মোল্লা উবায়দুল্লাহ আখুন্দ ও উস্তাদ ইয়াসিরের মৃত্যু পাকিস্তানের জেলখানাতে হয়েছে, যা আফগান তালেবান ও পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গের মাঝে বেশ ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করে। ২০১৩ সালের নভেম্বরে সিরাজুদ্দীন হক্কানির ভাই নাসিরুদ্দীন হক্কানিকে ইসলামাবাদের বারাকাহু এলাকায় হত্যা করা হয়, যার পরে হক্কানি নেটওয়ার্ক ও পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গের মাঝে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ বেড়ে গেছে। তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আমেরিকাকে এ প্রতিক্রিয়া জানানো হচ্ছে যে, আফগানে শান্তির চাবি আমাদের হাতে। মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের মৃত্যুর পর মোল্লা আখতার মনসুর আফগান সরকারের সাথে আলোচনার ব্যাপারে চূড়ান্ত কঠোর অবস্থান অবলম্বন করেন। ওই কঠোর অবস্থানের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল আইসিসের এই প্রোপাগান্ডা যে, আখতার মনসুর পাকিস্তানের মাধ্যমে আমেরিকার সাথে দরকষাকষি করতে চাচ্ছেন। মোল্লা আখতার মনসুর তালেবানের নেতৃত্বে আসার পরপরই আলোচনার পরিবর্তে পশ্চিম ও দক্ষিণ আফগানিস্তানে নিজের অবস্থান শক্ত করার প্রতি মনোযোগ দেন। এতে তিনি যথেষ্ট সফল হন। অপরদিকে তিনি ইরানের সাথেও সম্পর্ক তৈরি করেন। কেননা ইরান সরকারকে আইসিসের বিরুদ্ধে আফগান তালেবানের সাথে সহযোগিতার প্রতি প্রস্তুত দেখা যাচ্ছিল।

ভূখণ্ডে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আফগান তালেবানের জন্য পাকিস্তানের সকল কথা মানা সম্ভব ছিল না। তবে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ জানি না কেন এ কথা মনে করেন, আফগান তালেবান তাদের পকেটে রয়েছে। পাকিস্তানের যে সব বিদেশী হর্তাকর্তাদের সাথে আফগান তালেবানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, ওই সম্পর্কও কাজে আসেনি। আর যখন আফগান তালেবান আলোচনায় অংশীদার হতে অপারগতা প্রকাশ করল, তখন আমেরিকা পাকিস্তানকে এফ ১৬ বিমান সরবরাহে বাধা প্রদান শুরু করল। এ ব্যাপারে আমেরিকার ভূমিকা হাস্যকর।

কিছুদিন আগে মার্কিন সেনাবাহিনী পশ্চিম আফগানিস্তানের পাকতিকা এলাকায় এক অভিযানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা গিলানির পুত্র আলী হায়দার গিলানিকে উদ্ধার করে। ওই অভিযানের পর পাকিস্তান ও আমেরিকার সম্পর্কের মাঝে উন্নতি হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু মার্কিন সেনাবাহিনী আলী হায়দার গিলানির মাধ্যমে যে তথ্য পেয়েছে, তা মার্কিন সরকারের দুশ্চিন্তা বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলী হায়দার গিলানিকে ২০১৩ সালের মে মাসে মুলতান থেকে অপহরণ করে ফয়সালাবাদে নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানে তাকে কয়েক সপ্তাহ রাখা হয়। ফয়সালাবাদ থেকে তাকে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে পৌঁছানো হয়। যখন অপারেশন ‘যারবে আযব’ শুরু হয়, আলী হায়দার গিলানি তখন ওখানেই ছিলেন। তাকে খালিদ সাঈদ সাজনা (খান সাঈদ সাজনা)-এর গ্রুপ বন্দী করে রেখেছিল। সাজনা গ্রুপকে মোল্লা ফজলুল্লাহর গ্র“পের বিরোধী এবং হক্কানি নেটওয়ার্কের ঘনিষ্ঠ ভাবা হয়। ওই গ্র“পের হাকিমুল্লাহ মেহসুদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী শাহরিয়ার মেহসুদের ওপর বেশ ঝড় বয়ে যায়। ওই গ্রুপ আলী হায়দার গিলানি ছাড়া মার্কিন নাগরিক ওয়ারেন ওয়াইনস্টাইনকেও বন্দী করে রেখেছিল। আলী হায়দার গিলানি আমাকে বলেন, ওয়ারেন ওয়াইনস্টাইনকে লাহোর থেকে অপহরণ করে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি মুসলমান হয়েছিলেন। তাকে চাচা ইসহাক বলে ডাকা হতো। ২০১৫ এর জানুয়ারি মাসে এক ড্রোন হামলায় ওয়ারেন ওয়াইনস্টাইন মারা যান। হামলার সময় আলী হায়দার গিলানি তার পাশেই ছিলেন। তবে তিনি সৌভাগ্যবশত বেঁচে যান। অপহরণকারীরা আলী হায়দার গিলানির ওপর কোনো অত্যাচার করেনি। বরং খালেদ সাঈদ সাজনা বহুবার আলী হায়দার গিলানির সাথে ক্রিকেটও খেলেছেন। ২০১৬ সালের মার্চে আলী হায়দার গিলানিকে আফগানিস্তান স্থানান্তর করা হয়। আফগানিস্তান স্থানান্তরের কয়েক সপ্তাহ পর এক রাতে অপহরণকারীরা আলী হায়দার গিলানিকে জানায়, মার্কিন সৈন্য তাদের ওপর হামলা করতে আসছে। অপহরণকারীরা কয়েক লক্ষ ইউরোর নোট একটি ব্যাগে নিয়ে পালানোর সময় মার্কিনিরা তাদের টার্গেট করে এবং আলী হায়দার গিলানিকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়ার পর আলী হায়দার গিলানি আশ্চর্য হয়ে মার্কিনিদের জিজ্ঞাসা করেন, তার অপহরণকারীরা হামলার আগাম সংবাদ কীভাবে পেল? মার্কিনিদেরও জানা নেই, তাদের অভিযানের সংবাদ সাজনা গ্র“পের কাছে কীভাবে পৌঁছল? পাকিস্তানে সাজনা গ্র“পের এমন গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক আছে, যাদেরকে আমেরিকা সন্ত্রাসী মনে করে। বেলুচিস্তানের নুশকি এলাকায় ড্রোন হামলার পর আমেরিকার হামলার গতি পাঞ্জাবের দিকেও মোড় নিতে পারে। আমেরিকা ও ভারতের মাঝে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তানের জন্য সমস্যার বড় বড় পাহাড় দাঁড় করিয়ে দিতে পারে, অথচ পাকিস্তানিরা একে অপরকে কুপোকাত করতে ব্যস্ত।

হামিদ মীর : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং থেকে ভাষান্তর করেছেন ইমতিয়াজ বিন মাহতাব

সর্বশেষ সব সংবাদ