191892

বিদায় রমযান: আমাদের কিছু করণীয়

আল্লামা শায়খ সাজিদুর রহমান হাফিজাহুল্লাহ।
মুহতামিম, জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শায়খুল হাদিস, জামিয়া ইউনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের তোহফা নিয়ে আমাদের মাঝে এসেছিলো মাহে রমযান। এখন রমযান প্রায় বিদায় নিতে চলেছে। অন্যান্য বছরের রমযানের তুলনায় এবারের রমযান ছিলো ব্যতিক্রম।

মসজিদে উপস্থিত হতে বিধি-নিষেধ ছিলো। খতমে তারাবীহর আনন্দ ও পরিতৃপ্তি থেকে অনেক জায়গায়ই মুসল্লীগণ বঞ্চিত ছিলেন। মানুষজনের গোটা জীবন-যাত্রাতেই ছিলো এক প্রকারের অস্থিরতা। এত সব কিছুর পরেও আল্লাহর অনেক তাওফীকপ্রাপ্ত বান্দা রমযান মাসে অধিক পরিমাণে আমল-ইবাদতের মাধ্যমে নিজেদের আখেরাতের সঞ্চয়কে সমৃদ্ধ করেছেন। দুনিয়ার জীবনেরও সৌভাগ্য অর্জনে সচেষ্ট থেকেছেন।

রমযানে অনেকেই রোযা তো পালন করেছেনই, সেই সাথে ফরয নামাজের পাশাপাশি তাহাজ্জুদ, নফল, ইত্যাদি নামাজের ইহতেমাম করেছেন।
বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতের ইহতেমাম করেছেন। যার যার অবস্থান থেকে ইলমে দ্বীন শেখার বিষয়ে সময় ব্যয় করেছেন। অনেকেই সাধ্যমতো দান-খয়রাত করেছেন। অসহায়-দুস্থ মানুষদের সেবা ও খেদমতে এগিয়ে এসেছেন।

গোটা রমাযান জুড়েই আল্লাহর প্রিয় বান্দারা আরো বিভিন্ন প্রকারের নেক আমলে মনোনিবেশ করেছিলেন। বস্তুতঃ এসবই ছিলো রমযানের বরকত ও কল্যাণ। এখন রমযান যখন আমাদের থেকে বিদায় নিতে চলেছে, তখন আমাদের সবারই করণীয় হলো, আমরা তো জানি না, পরবর্তী রমযান আমরা পাবো কিনা, কীভাবে পাবো; আমরা এই রমযান থেকেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই যে, পরবর্তী গোটা জীবন আমরা দ্বীনের উপর চলার সর্বোত চেষ্টা করে যাবো।

রমযান উপলক্ষে যে সকল নেক কাজে আমরা অভ্যস্ত হয়েছিলাম, সেগুলোর বিষয়ে আমরা যেন উদাসীনতা প্রদর্শন না করি। পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায যেন ইহতেমামের সাথে আদায় করি। এই নামাযের ইহতিমামই আমাদের জন্য গোটা দ্বীনকে আসান বানিয়ে দেবে ইনশাআল্লাহ। তাহাজ্জুদ ও নফলের বিষয়ে আমাদের মধ্যে যে অভ্যস্ততা তৈরী হয়েছিলো, সেটা আমরা ধরে রাখার চেষ্টা করি।

সহীহ মুসলিমের হাদীসে আছে, “সারা বছরই প্রতি রাত্রে শেষ অংশে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শেষ আসমানে নুযূল করে বান্দাদের মাঝে ঘোষণা করতে থাকেন, আছে কি কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী; আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো। আছে কি কোনো রিযিক প্রার্থনাকারী; আমি তাকে রিযিক দান করবো। আছে কি কোনো প্রার্থনাকারী; আমি তাঁর প্রার্থনা কবুল করবো।”
(সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৮১০ ১৮১৩)

এই ঘোষণা সারা বছরই এসে থাকে। তো আমরা নিজেদের দুনিয়া ও আখেরাতকে সাজানোর জন্য তাহাজ্জুদের ইহতেমামের আমরা অভ্যাস করি। কুরআন মাজীদের বেশি বেশি তিলাওয়াত জারী রাখি। কুরআনের সাথে সম্পর্কই হতে পারে আমাদের নাজাত ও মুক্তির পথ। ইলমে দ্বীনের তো কোনো সমাপ্তি নেই।

আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইলমে দ্বীন শেখার বিষয়ে যত্নবান থাকি। আমাদের মনে রাখতে হবে, দ্বীনের সহীহ ইলম ছাড়া দ্বীনের উপর চলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দান-খায়রাতের ক্ষেত্রেও আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করি। আল্লাহই সম্পদে বরকত দান করবেন।

এই গোটা একমাস আমরা রোযা পালন করেছি। সবাই আমরা যার যার তাওফীক মতো রোযার ঈমানী ও আখলাকী যত ফায়দা আছে, রোযার আত্মিক ও দৈহিক যত উপকার আছে, আমরা অর্জন করেছি। এই ফায়দা ও উপকারগুলো সামনে রেখে আমরা সারা বছরই হাদীস শরীফে যেসব দিনে নফল রোযার কথা এসেছে, সেই রোযাগুলোর বিষয়ে আমরা যত্নবান হতে পারি।

সপ্তাহের প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবারের রোযা, মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোযা, তাছাড়া আশুরার রোযা, আরাফার দিনের রোযা ইত্যাদি রোযাগুলোর বিষয়ে আমরা যত্নবান হতে পারি।

এক মাস রোযা পালনের পর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আনন্দের নিদর্শন হিসাবে আমাদেরকে ঈদ দান করেছেন। সেই ঈদের বিষয়ে ইসলামে শরীয়তে বিস্তারিত বিধান বর্ণিত হয়েছে। আমরা তো ঈদে কত রকম কর্মকাণ্ড করে থাকি, যেগুলো হয়তো শরীয়ত সমর্থন করে না। সে বড় দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক প্রসঙ্গ।

যাই হোক, ইসলামী শরীয়তে রোযার ঈদের অন্যতম বিধান হলো, ছদকাতুল ফিতর। নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে ছদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। এবছর আমাদের ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার জন্য উলামায়ে কেরাম জনপ্রতি সর্বনিম্ন ষাট টাকা হিসাব করেছেন।

ইসলামে এই ছদকাতুল ফিতরের বিধান দান করার তাৎপর্য কী, এক হাদীস শরীফে পরিষ্কার বিবরণ এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন,

فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ. مَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلاَةِ فَهِىَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ، وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلاَةِ فَهِىَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ.

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদকাতুল ফিতর আবশ্যক করে দিয়েছেন অনর্থক কথাবার্তা ও অশ্লীল কাজকর্ম থেকে রোযার পবিত্রতা সাধনের জন্য এবং অসহায়-দুস্থদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৬১১)

এখানে পরিষ্কারভাবেই বিশেষভাবে দুটি উপকারিতা ও তাৎপর্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথমত, অনর্থক কথাবার্তা ও অশ্লীল কাজকর্মের কারণে রোযার যথাযথ হক আদায়ে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি তৈরী হয়, সেগুলোর কাফফারা আবার এর মাধ্যমে সমাজের অসহায়-দুস্থতের মুখে খাবার তুলে দেওয়ারও এক প্রকার ব্যবস্থা হয়।

এই জন্য সবারই করণীয়, এই বিধানের বিষয়ে উদাসীনতা না করা। ঈদের দিন আসার আগে আগেই যেন ছদকাতুল ফিতর আদায় করে দেওয়া হয়। যাতে করে ঈদগাহে উপস্থিত হওয়ার আগে নিজের রোযাকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে নেওয়া যায় এবং গরীব মানুষও যেন ঈদের উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারে।

এক হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “مَنْ صَامَ رَمَضَانَ، ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ، كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ “.

যে ব্যক্তি রমযানের রোযা করলো এরপরে শাওয়ালে ছয়টি রোযা রাখলো, সে সারা বছর রোযা রাখার সওয়াব লাভ করবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৮১৫)

দেখুন আল্লাহ কত বড় মেহেরবান! রমযান কখনো ২৯ দিনে গেলেও আল্লাহ পাক আপন মেহেরবানীতে ত্রিশদিনের সওয়াবই বান্দাকে দেন। এরপরে শাওয়ালের ছয় রোযাকে যদি যোগ করা হয় তাহলে হয় মোট ছত্রিশ রোযা।

এবার আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের রীতি দেখুন, প্রতিটি রোযার দশগুণ সওয়াব বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাহলে ৩৬ এর দশগুণ হলো ৩৬০। আর চাঁদের হিসাবে বছর তো ৩৬০ দিনের কমই হয়ে থাকে।

সুতরাং কোনো ব্যক্তি রমযানের রোযা ও শাওয়ালের ৬ রোযা পালন করলে সে সারা বছরের রোযা রাখারই সওয়াব অর্জন করবে। আমরা কেউই যেন আল্লাহ পাকের এত বড় দান গ্রহণ করা থেকে পিছিয়ে না থাকি।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে ভরপুর তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক: মুহতামিম, জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শায়খুল হাদিস, জামিয়া ইউনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

-এটি

আপনার বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন- 01640523566