190291

আমাদের মিডিয়া কেন দরকার?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ।।

পাঠকপ্রিয় নিউজপোর্টাল আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকমে পর পর দু’দিন ‘দিন শেষের সত্য কথা: আমাদের কোনো মিডিয়া নেই’ ও ‘সামর্থ্যবান আলেমরা এগিয়ে এলে বস্তুনিষ্ঠ মিডিয়া গড়া সম্ভব’ শিরোনামে দু’টি মতামতধর্মী নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

লেখার বিষয় প্রসঙ্গে আওয়ার ইসলামের ফেসবুক পেইজসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া প্রতিক্রিয়া বেশ আশাব্যঞ্জক। প্রথমত লেখার বিষয় নিয়ে প্রায় পাঠকই স্বীকার করেছেন, মিডিয়ার প্রয়োজনীয়তা। তবে মিডিয়ার ধরণ, প্রক্রিয়া, পদ্ধতি কিংবা নীতি-আদর্শ ইত্যাদি নিয়েও অনেকে তাদের শঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন।

বোদ্ধা পাঠকদের এই যে, অনুভূতির প্রকাশ সেটা ‘সহমত’ শব্দ দিয়েই প্রকাশ করতে হবে, এটা জরুরি নয়। বরং বিষয়ের গভীরে গিয়ে কোনো আশঙ্কার কথা প্রকাশ, কোনো ধরনের অবজ্ঞাসূচক মন্তব্যও কিন্তু ভাবনার খোরাক জোগায়। সে হিসেবে আলোচ্য দুই লেখার ক্ষেত্রে মতামত দিয়ে অংশ নেওয়াকে ইতিবাচকই বলা যায়।

এবার আসি আলোচনার মূল প্রসঙ্গে। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনে একটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠা। আর সেটা করতে হলে এই শ্রেণির মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া। ওই জায়গাটায় আমাদের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে কীভাবে কাজ করা যায় সেই লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাওয়া।

আমাদের দেশের বিদ্যমান সংবাদমাধ্যমগুলো শুধু একপেশে নয়, একঘেয়ে ও বৈচিত্র্যহীন। এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অথচ পাঠক টানতে কী নেই সংবাদপত্রে? আগে শুধু সংবাদ থাকতো, এখন সংবাদের সঙ্গে সংবাদ বিশ্লেষণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সিনেমা, ফ্যাশন, আইটি ও রান্নাবান্না থেকে শুরু করে কতো কী দেওয়া হচ্ছে! এমনকি ছাত্রদের নোট পর্যন্ত। উদ্দেশ্য পাঠকপ্রিয়তা অর্জন। পাঠকে মনোতুষ্টি আদায় করা।

আগে পত্রিকা ছিল আট পৃষ্ঠার, এখন ষোলো, বিশ, বাইশ, চব্বিশ পৃষ্ঠার। শুধু তাই নয়, পত্রিকার সঙ্গে বিনামূল্যে একাধিক ম্যাগাজিন, সাবলিমেন্ট; যা আগে কেউ কোনোদিন কল্পনা করতো না। তারপরও অভিযোগ, সংবাদপত্রে কিছু নেই, কিছুই থাকে না।

পাঠকের বিতৃষ্ণা বিবেচনার দাবি রাখে। তাই এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও অনুসন্ধান জরুরি। আমরা লেখায় সে কাজটিই করতে চাই। মিথ্যা, ভুল, খণ্ডিত ও মতলবি খবর প্রকাশ করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার বিষয়ে সচেতন করতে চাই। বস্তুনিষ্ঠ খবরের চেয়ে কোনোকালেই সাজগোজ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন, শোবিজ ইত্যাদির খবর গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাছাড়া কিছু ভাড়াটে লেখকের মতামত, মন্তব্য, নিকৃষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, ফালতু সব সম্পাদকীয় মন্তব্য পয়সা দিয়ে কিনে পড়ার কোনো মানে হয় না।

এক জরিপে দেখা গেছে, মোটামুটি পড়তে পারে প্রায় মানুষই হাতের কাছে পেলে পত্রিকা পড়েন। তিনি যে বয়সেরই হোন না কেন। আসলে পাঠক খবর পড়ে না, সে তার সমগোত্রের, একই মতাদর্শের বিষয় সম্পর্কে জানতে চায়। সে হিসেবে আমাদের দেশের পত্রিকাগুলো সাধারণ মানুষের মুখপাত্র হয়ে উঠতে পারেনি।

আরো পড়ুন-

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। দেশের ২০ হাজার কওমি মাদরাসা, চার লাখ মসজিদ, লাখ লাখ মাদরাসার ছাত্র, হাজার হাজার আলেম, ডজনের বেশি নিবন্ধিত ইসলামি রাজনৈতিক দল, ডজনখানেক শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক ও অন্যান্য ইসলামি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য কি কোনো আয়োজন আছে? বিশাল ধর্মীয় বই-পুস্তকে প্রতিবছর প্রকাশ হচ্ছে এটা নিয়ে কোনো আলোচনা আছে?

দিবসভিত্তিক কিছু ধর্মীয় প্রবন্ধ-নিবন্ধ বাদে বিপুল এই জনগোষ্ঠীর জন্য আর কিছু নেই। এই না থাকাটাকে পুঁজি করে এগুলোতে হবে।১৭ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ইসলামিস্টদের এই যে বিপুল আয়োজন, ব্যবস্থাপনা- এসব কি অন্তঃসারশূন্য? কওমি শিক্ষা ব্যবস্থায় কি কোথাও কোনো গবেষণা হয় না? কোথাও কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সফলতা অর্জন করে না? সেসব খবর কোথায়? এ বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে।

আলেমদের সমাজসেবার খবর বলতে গেলে কোনো পত্রিকায় উল্লেখই হয় না। শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু সমাজের বিশাল একটি শ্রেণিকে বিনাবেতনে শিক্ষিত করে তুলছে কওমি ধারার শিক্ষাব্যবস্থা, এ খবর কি কোনো মিডিয়ায় আসে? বিভিন্ন বিষয়ে সরকার জনসচেতনতার জন্য বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করে। পক্ষান্তরে মসজিদের ইমাম-খতিবরা কোনো পারিশ্রমিক কিংবা সম্মানী ছাড়া সমাজের মানুষকে সচেতন করছেন, তাদের মূল্যবোধ জাগ্রত করার কাজ করছেন- এই অবদানের কথা কি উঠে আসে কোনো মিডিয়ায়? ক’জন আলেমের কৃত্বিত্বপূর্ণ জীবনের কথা প্রচারের আলোতে আসে? এর উত্তর, নেই।

সংবাদমাধ্যম তো দেশ ঘুরে প্রকৃত সংবাদ তুলে ধরবে। তার বদলে আমরা নিত্য দিন দেখছি সব বস্তাপচা ও একঘেয়ে খবর। সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে আমাদের সংবাদমাধ্যম যদি এ সত্যগুলো তুলে আনা যায়- তাহলে সমাজের একটা পরিবর্তন ঘটবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার ঘটবে, আমাদের আদর্শ-কর্মপন্থা মানুষের মনে জায়গা করে নেবে। ফলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যপূরণ সহজ হবে।

আর এজন্য দরকার নিরপেক্ষতা আর বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা। এখন প্রশ্ন হলো- এটা চর্চার কোনো ক্ষেত্র কী আমাদের আছে?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ: সাংবাদিক
ওআই/আবদুল্লাহ তামিম

ad