|| মুফতি এনায়েতুল্লাহ ||
শিক্ষার্থী-শিক্ষক, আলেম-উলামা, মসজিদের ইমাম-খতিব, বক্তা-মুফাসসির কিংবা পেশাজীবী সবাই যার যার মতাদর্শ অনুসারে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত থাকবেন বা সচেতন থাকবেন। এটা কোনো অযৌক্তিক বিষয় নয়। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন যেন নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন না ঘটায় বা বিঘ্ন ঘটার কারণ না হয়- সেদিকে কঠোরভাবে খেয়াল রাখতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে।
বিষয়টি উত্থাপনের কারণ হলো- সমাজের শ্রদ্ধাভাজন আলেম-উলমাদের নৈতিকতা এবং আমানতদারিতার বিষয়টিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া।
কারণ, আমাদের দেশে এমনিতে ‘ফুলটাইম পলিটিশিয়ান’-এর দেখা মেলে না। আর ইসলামি দলে তো ‘ফুলটাইম পলিটিশিয়ান’ নেই। ইসলামি দলের নেতারা কেউ মাদরাসার শিক্ষক-পরিচালক-প্রিন্সিপাল ও অধ্যক্ষ, কেউ মসজিদের ইমাম-খতিব, কেউ ওয়ায়েজ-বক্তা-মুফাসসির, আবার কেউ ব্যবসায়ী। অর্থাৎ জীবিকা অর্জনের জন্য কারও কোনো কোনো পেশা রয়েছে। এর পাশাপাশি তিনি রাজনীতি করেন। কিন্তু সেই রাজনীতিতে কোনো দাগ লাগুক তা আমরা চাই না।
প্রায়ই দেখা যায়, বিভিন্ন ইসলামি দল তাদের কর্মসূচি পালন করছেন কর্মদিবসে। অর্থাৎ যে সময়টা মাদরাসায় ক্লাস হওয়ার কথা। এখন ওই কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে একজন মাদরাসার শিক্ষক-পরিচালক-প্রিন্সিপাল ও অধ্যক্ষের দায়িত্বপালনকারী রাজনীতিককে ওইদিন অবশ্যই ছুটি কাটাতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, তিনি কি প্রতিষ্ঠান থেকে ছুটি নিয়ে কর্মসূচিতে আসেন, না অন্য কোনোভাবে ম্যানেজ করেন?
যদি ছুটি নিয়ে আসেন, ভালো। আর ম্যানেজ করলে এটা অবশ্যই অনৈতিক কাজ। আর কোনো ইসলামি রাজনৈতিক নেতা কিংবা কর্মী-সমর্থকদের কাছ থেকে এমন কাজ আমরা আশা করি না।
আরেকটি বিষয়, প্রায়ই দেখা যায়- বিভিন্ন মাদরাসার অফিস-মিলনায়তন কিংবা কক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের মিটিং করছেন, কিংবা কোনো কর্মসূচি পালন করছেন। নৈতিকতার দিক থেকে এটা কতটুকু ঠিক সেটাও মাথায় রাখা দরকার। আবারও বলি প্রশ্নগুলো ছোট কিন্তু নৈতিকতার দিক থেকে আমানতদারিতার ক্ষেত্রে অবশ্যই ছোট নয়।
রাজনীতি, আলেমদের কথাবার্তা, চাল-চলন অবশ্যই অন্য দশজনের মতো হবে না। আমাদের আকাবির আলেমরা মাদরাসার কাজের বাইরে মাদরাসার বাতিও নিজ কাজে ব্যয় করতেন না। বিশ্রামের সময় ফ্যানও বন্ধ রাখতেন। সেখানে মাদরাসায় রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন, মিটিং-বৈঠকে মাদরাসার আসবাব ব্যবহার, জনবল ব্যবহার- কতটা সিদ্ধ তা অবশ্যই ভাবনার দাবি রাখে।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা পেশাজীবীরা রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট থাকবেন কিংবা কতটা থাকবেন এটা নিয়ে বিভিন্ন মহলে একটি আলোচনা আছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেহেতু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রায় সকল কাজকেই প্রভাবিত করে, সেহেতু শিক্ষার্থী-শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী সবাই যার যার মতাদর্শ অনুসারে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত থাকবেন বা সচেতন থাকবেন এটা কোনো অযৌক্তিক বিষয় নয়। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন না ঘটায় বা বিঘ্ন ঘটার কারণ না হয়, সেটি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দেখুন, প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন খুব সম্ভবত প্রত্যেকটি খাতে সামগ্রিকভাবে সারা বাংলাদেশে এখন সময়ের একটি কঠিন দাবি।
তবে এই গুণগত পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে, সবাইকে রাজনীতিবিদ হতে হবে? সবাই রাজনীতিবিদ হলে, তবে দেশ চলবে কীভাবে?
হ্যাঁ, বাংলাদেশে দিন দিন এক অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি গভীরভাবে শেকড় গেড়ে বসছে- সবাই রাজনীতিবিদ হতে চায়, আর রাজনীতিই যেন জীবনের একমাত্র ‘টার্গেট।’ স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, পেশাজীবী, আমলা, শ্রমজীবী, এমনকি বস্তিবাসীও কেউ বাদ যাচ্ছে না এই প্রবণতা থেকে। দুই থেকে তিন বন্ধুর আড্ডাতেও চলে আসে রাজনীতির প্রসঙ্গ। রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ফেসবুক লাইভ বা টিকটক ভিডিও- রাজনীতিই মূল বিষয়।
রাজনীতির এমন ভয়াবহ ছোঁয়া থেকে আলেম-উলামারাও বাদ যায়নি। যেহেতু তারা রাজনীতিতে আসছেন, সুতরাং প্রশ্ন ওঠবে, কথা আসবে। তাই শুরু থেকেই সতর্কতা কাম্য।
লেখক: সিনিয়র আলেম সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
এসএইচ/