|| সাইফুদ্দীন গাজী ||
ইসলামে নতুনভাবে প্রবেশ করা, অথবা জন্মগত মুসলিমদের দীনের দিকে প্রত্যাবর্তন করার রুট অনেক হতে পারে। সঠিক পথ তো সঠিক, কিন্তু কোনো অমুসলিম যদি সত্যসন্ধান করতে গিয়ে অজ্ঞতাবসত শিয়া মতবাদ, বেরলভী চিন্তা, এমনকি কাদিয়ানী ধর্মমতও গ্রহণ করে, সেক্ষেত্রে তাদেরকে বেশি দোষ দেওয়ার সুযোগ নেই। সাময়িকভাবে একে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এক্ষেত্রে ওই নওমুসলিমের কাজ হলো, এই রুটেই থেমে না-যাওয়া এবং তার সত্যসন্ধান অব্যহত রাখা। আর দাঈদের কাজ হল প্রকৃত সত্য তার সামনে প্রজ্ঞার সাথে উপস্থাপন করা।
জন্মগত মুসলিমদের মধ্যে যারা দীনীশিক্ষার অভাবে কিংবা বৈরি পরিবেশের প্রভাবে বিপথগামী হয়ে গেছে, এমনকি ধর্মহীন ও নাস্তিক হয়ে গেছে, তাদের দীনে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রের অনেকগুলো রুট খোলা রয়েছে। সেটা কোনো পীর-মাশায়েখের বয়ান ও সুহবতে হতে পারে, কারও ওয়াজ বা লেকচার শুনা, দীনী বইপত্র পড়া, দাওয়াত ও তাবলীগের যাওয়া, জামাত-শিবিরে যোগ দেওয়া, ইত্যাদি।
বিশেষকরে দীন থেকে দূরে থাকা জেনারেল শিক্ষিতদের দীনের ঘরে ফেরার ক্ষেত্রে বিশ্ব ও স্থানীয় পরিসরে তাবলীগী জামাআত, এবং বাংলাদেশ পরিসরে শিবির-জামাত অনন্য দুটি ধারা।
আমাদের জানামতে কলেজ-ভার্সিটির বহু শিক্ষিত-শিক্ষার্থী জামাত-শিবিরের মাধ্যমে ‘হেদায়াত’ পেয়েছে। বহু নাস্তিক ও বামপন্থী আস্তিক হয়েছে ও তাওহীদ পেয়েছে। এক্ষেত্রে বাম-রামপন্থীদের ওপর জামাতশিবিরের দাওয়াতী কাজ অনস্বীকার্য, এটা আপনাকে মানতেই হবে। আর এক্ষেত্রে তাবলীগী জামাআতের অনন্যতা ও উচ্চতা তো সবাইকে ছাড়িয়ে, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে ইসলামের পরিচয়, প্রাথমিক ও মৌলিক বিষয়াদির ধারণা লাভ পর্যন্তই একথাগুলোর সত্যতা ঠিক আছে, সর্বক্ষেত্রে নয়।
আমরা মনে করি- জামাতশিবির বলুন আর তাবলীগ-জামাত বলুন, এটি দীনে প্রবেশ বা প্রত্যাবর্তনে একটি করিডোর মাত্র, এগুলো দীনের শেষ মনযিল নয়। শেষ মনযিল হল দীনের গভীর বুঝ অর্জন করা ও আল্লাহর ভয়ে ভীত হওয়া এবং আখেরাতমুখী জীবনযাপন করা এবং অন্যদের আখেরাতের বিষয়ে সতর্ক করা। সূরা তাওবা ১১২ নম্বর আয়াত, সূরা ফাতিরের ২৮ নম্বর আয়াতসহ অসংখ্য দলীল এক্ষেত্রে স্পষ্ট।
আর ইসলামী জ্ঞানচর্চার শেষ মনযিল হল ইলমকে তার মূল সূত্র হতে শিক্ষালাভ করা, তথা আরবী থেকে কুরআন হাদীস ও ফিকহ বুঝতে পারা এবং তাতে রুসূখ বা দৃঢ়তা অর্জন করা।
আর এ দুটি জিনিস অর্জিত হয় আহলে ইলম ও আল্লাহওয়ালাদের সুহবতগ্রহণের মাধ্যমে এবং সালাফে সালেহীনের নিয়মে উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে ইলমগ্রহণ করার মাধ্যমে। যতক্ষণ পর্যন্ত কারও হেদায়াত বা পথপ্রাপ্তি ইলম ও বসীরতসমৃদ্ধ না হবে এবং ইলমের মূলসিলসিলার সাথে যুক্ত না হবে; ততক্ষণ এ পথপ্রাপ্তির স্থায়িত্বে আস্থা নেই এবং তাতে পূর্ণতা নাই।
এক্ষেত্রে শিবির থেকে তাবলীগজামাত ব্যতিক্রম। তাবলীগ নিজে যে একটি রুট মাত্র, পরিপূর্ণ একেডেমি নয়, সেটা তার উপলব্ধিতে আছে। যে কারণে দাওয়াত-তাবলীগ তার মূলনীতিতে এ অনস্বীকার্য বিষয়কে শুধু স্বীকার করেই ক্ষান্ত করেনি, বরং জন্মলগ্ন হতেই তারা নিজেদের মধ্যে এবং গণপরিসরে ব্যাপক চর্চা করে আসছে ও মানুষজনকে দাওয়াত দিচ্ছে- ইলম শিখতে হবে উলামায়ে কেরাম থেকে। তাদের ছয়উসুলের একটি অংশই আছে ফতওয়া ও মাসায়েল উলামায়ে কেরামের কাছ থেকে গ্রহণ করা। আত্মশুদ্ধি করতে হলে কোনো হাক্কানী বুযুর্গের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লে সেখানে যেতে হবে। আহলে ইলম ও আহলে দিল যারা, তাদের কাছ থেকে তালীম ও তারবিয়াত গ্রহণ করতে হবে। তাঁদেরকে যথাযথ তাজীম ও মান্য করতে হবে। তাবলীগে এসবের হরহামেশা চর্চা হয়। বরং তারা সাধারণ লোকদের ধরে ধরে আলিমদের হাতে তুলে দিতে চায়, কিংবা আলিমদেরকে সাধারণের কাছাকাছি আনতে চায়, যেন তার পক্ষে দীন শেখা সহজ হয়।
প্রথমদিককার প্রত্যেকটি তাবলীগী সাথীর মধ্যে এ নীতির চর্চা পুরো মাত্রায় বিদ্যমান ছিল। যদ্দরুণ বৃদ্ধবয়সেও মাদরাসায় ভর্তি হয়ে স্বয়ং আলেম হয়ে যাওয়া, পিতাপুত্র একসাথে মাদরাসায় পড়া, ঘরে ঘরে আলিম হাফিয তৈরি হওয়ার হার অনেকগুণ বেশি ছিল। মাদরাসাগুলোতে তালিবে ইলমের আগমণের ধারা ব্যাপক ছিল। তাবলীগী সাথীরা হেদায়াত পাওয়ার পর সন্তানদের মাদরাসায় দেয়নি, কিংবা দেওয়ার চেষ্টা করেনি; এরূপ ঘটনা খুব বিরল। বর্তমানে এ হার পরিমাণে কমে গেলেও এরা এখনো অন্যদের চেয়ে অগ্রসর। মাওলানা সা’দ সাহেব সদলবলে আলিমগণ থেকে দূরে সরে পড়ার ঘটনা তাবলীগের ইতিহাসে এক নজীরবিহীন ঘটনা। এটা তাবলীগের মূলনীতি ও ঐতিহ্য পরিপন্থী তৎপরতা।
তাবলীগের এখন তৃতীয় জেনারেশন চলছে। প্রথম জেনারেশন সাধারণ মানুষ বা জেনারেল শিক্ষিত থাকলেও তারা ভালো দীনদার আমলদার মুত্তাকী ছিল। তাদের অধঃস্তন ২য় ও ৩য় জেনারেশনের বেশিরভাগ অবশ্যই আলিম হাফিয মুফতী মুহাদ্দিস হয়েছে, অল্পকিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। এই সুফলের কারণ ছিল- তাবলীগের দাওয়াপদ্ধতির বিশুদ্ধতা এবং দীন শেখার সঠিকসূত্রে নিজেদের যুক্তকরণ।
এ বিপরীত হল জামাত-শিবির। বহুলোক এপথে দীনের সন্ধান পেয়েছে, বহু বাম ডানে এসেছে, বহু নাস্তিক আস্তিক হয়েছে, কিন্তু তাদের বিপুল অংশ পুরোপুরি আগের জীবন বদলাতে পারেনি। পশ্চিমা লাইফস্টাইল পুরোপুরি চেঞ্জ করতে পারেনি। তাদের সন্তানদের মাদরাসায় দিয়েছে, কিংবা হাফিয আলিম বানিয়েছে, এরূপ সংখ্যা তাদের মধ্যে খুবই কম। মেয়েদেরকে আলিম দেখে পাত্রস্থ করেছে, তা আরও বিরল।
অধিকন্তু আলিমদের মধ্যে যারা এ দলভুক্ত হয়েছে, তাদের অনেকেই আর সন্তানদের ইলমের পথে দেয়নি। বরং তাদের অনেকেই মনে করে মাদরাসায় পড়িয়ে তার বাবা তাকে ঠকিয়েছে। (একথাগুলো স্বচক্ষে দেখে ও স্বকর্ণে শুনে বলছি, আনুমানিক নয়)
এটি এ দলের একটি অন্ধকার দিক। কারণ, এ দলের চিন্তা বেশিরভাগ দুনিয়ামুখী, আখেরাত মুখী নয়। অর্থমুখী, ইলমমুখী নয়। থিওরিমুখী, প্রেকটিসমুখী নয়। ক্ষমতামুখী, ইবাদত আমলমুখী নয়। এখানে নবাগতদের ব্রেইনসেট খানিক বদল হলেও মাইণ্ডসেট তেমন বদলে না। আর জানা কথা, মনের পরিশুদ্ধি ছাড়া পরিপূর্ণ উন্নতি সম্ভব নয়। এরা বিশ্বাস করে পশ্চিমা জীবনধারাতেই সফলতা, শুধু এতে সামান্য ইসলাম বা ইসলামী লেভেল ও শ্লোগান যোগ করলেই হল। অথচ ব্যাপারটা এমন নয়।
ইসলামের শাস্ত্রীয় জ্ঞানচর্চায় তারা অনেক বেশি দুর্বল। ইসলামী একাডেমিক লাইনে আলিয়াধারাই তাদের আশ্রয়স্থল। একে তারা ফলো ও প্রমোট করে। আর সবাই জানে বর্তমান আলিয়াধারা শাস্ত্রীয় শিক্ষা ও আমল-আখলাকের লাইনে কতটা নড়বড়ে।
ভার্সিটিতে যারা জামাতশিবিরকে ইসলামের প্রতিনিধি ভেবে অনুসরণ করে, তারা সম্ভাবনাময় ছেলেগুলোকে ওই করিডোরেই থামিয়ে দেয়, সামনে এগিয়ে দেয় না। দীন ও ইলমের পথে যে সামনে অনেক পথ বাকি রয়ে গেছে, তারা সেটা বলে না। দলের কিছু পরিকল্পিত বইপত্রে এবং কতক মোটিভেশনাল লেকচারেই তাদের আটকে রাখে। উলামায়ে কেরামের কাছে যাওয়ার সুযোগ দেয় না, কিংবা যেতে উদ্বুদ্ধ করে না। উলামাদের তাজীম তাকরীম তো দূরে থাক, বরং এমন সবকথা তারা নিজেদের মহলে আলোচনা করে, যদ্দরুণ এ নবীণ ছেলেরা একসময় ইলম ও আলিমবিদ্বেষী হয়ে ওঠে। এখানে তারা আলিমদেরকে তুচ্ছ এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করতে শেখে। নিজেদেরকে মেধাবী এবং আলিমদেরকে বোকা মনে করতে থাকে। যে কারণে সঠিক মাসআলাকে তারা ‘ফতওয়াবাজি’ এবং আলিমদেরকে তারা ‘ফতওয়াবাজ’ বলে গালাগাল করে। প্রকৃত দীন ও ইলমচর্চাকারীদেরকে তারা বেকডেটেড, পশ্চাদপদ, মোল্লা, মৌ-লোভী বলে তিরস্কার করে। শাস্ত্রের ওপর শাস্ত্রজ্ঞের স্বীকৃত অথরিটি এবং ইলমের ওপর আলিমের স্বীকৃত অথরিটিকে ওরা ‘পোপবাদ’ ‘মোল্লাতন্ত্র’ বলে কটাক্ষ করে। এই হল ওদের ইলম ও দীনচর্চার হাকীকত।
তবে সবাই একরমক নয়, সবখানেই কিছুসংখ্যক ব্যতিক্রম থাকে, বংশগত ভদ্রতা, পারিবারিক শিক্ষা ও খোদাদাদ বুঝবুদ্ধির কারণে।
এসবের মূল কারণ হল ওখানে দাওয়াপদ্ধতি সঠিকপথে পরিচালিত নয়। তাদের ইলম ও জ্ঞানচর্চা সালাফের তরীকায় নয়। ওদের মধ্যে খুব কম লোকের ভাগ্যেই আলিম ও মুআল্লিমের সম্মুখে আদবসহকারে ইলম শেখার সুযোগ জুটেছে। বরং উলামায়ে কেরামের সুহবতে বা তত্ত্বাবধানে তারা দীন ও ইলমের চর্চার প্রয়োজনই বোধ করে না। তারা আহলুল্লাহর সুহবতে যাওয়া দরকার মনে করে না। বরং কিছু অনুদিত বইপত্রকে জ্ঞানচর্চার শেষ মনে করে। অথেনটিক সোর্স ও মূলটেক্সট থেকে ইলমচর্চার স্বাদ তারা কখনো পায়নি। যেকারণে দীনের দিকে তাদের অগ্রযাত্রা দলের বৃত্তেই আটকে থাকে। দীনের গভীর বুঝের মণিমুক্তা তাদের মনের কোটরে জন্ম নেয়ার সুযোগ পায় না। যেকারণে শতবর্ষ পার হয়ে গেলেও তারা ইলমের কোনো সিলসিলা বা ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে পারেনি। বরং এক্ষেত্রে তারা আরও বেশি দীন ও ইলম থেকে সরে পড়ছে।
বিষয়টি বুঝতে পারলেই আপনি অনুধাবন করতে পারবেন, ওরা কেন শাহবাগীদের ভাষায় আলিমদের গালাগাল করে। কেন তারা ফকীহ আবদুল মালেকের মত বিদ্বান বুযুর্গকে সহ্য করতে পারে না। কেন তারা আলিমদের সামান্য দোষ পেলেই ইউরেকা বলে লাফিয়ে ওঠে।
আরও অনুধাবন করতে পারবেন, দীনে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে তাবলীগের অনন্যতা কোথায় এবং বর্তমানে তাবলীগী সাথীরা পিছিয়ে পড়ার কারণ কি।
এককথায়, তাবলীগ বলুন আর শিবির বলুন, অথবা পীরমুরিদি বা ইসলামী সাহিত্যচর্চা বলুন, এগুলো স্রেফ দীনে প্রবেশের করিডোর মাত্র, একাডেমি নয়। নয় এটি দীনের পথে অগ্রযাত্রার শেষ মনযিল। বরং শেষ মনযিল হল ইলম আমল, রুসুখ, তাকওয়া ও তাফাক্কুহ ফিদদীন।
এর জন্যে আপনাকে ইলমের ঐতিহ্যগতধারা অনুসরণ করে আহলেযিকর থেকে ইলম গ্রহণ করতে হবে। আহলুল্লাদের সুহবতে যেতে হবে। মূলটেক্সট থেকে ইলমচর্চা করতে হবে। অথবা যারা ইলমের মূলের সাথে সম্পৃক্ত, তাদের পরামর্শে নিজেকে পরিচালিত করতে হবে। নতুবা আপনার পরিবর্তন হবে সাময়িক, যদিও আপনার ব্যবহার হয় অমায়িক। আপনার জ্ঞান হবে অশুদ্ধ কিংবা অপূর্ণ, যদিও মেধায় ও চালাকিতে আপনি অনন্য।
মনে রাখবেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এক জিনিস, আর মেধা ও চালাকি আরেক জিনিস। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার জ্ঞান প্রজ্ঞা ও খোদাভীতিতে, চতুরতা ও চালাকিতে নয়, নয় চাপাবাজিতেও।
লেখক: আলেম লেখক ও মাদরাসা শিক্ষক
জেডএম/
