বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


শরীয়তের আলোকে ঈদুল আজহার দিনের করণীয় ও বর্জনীয়

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| মুফতি: তাফাজ্জুল হক || 

পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মের অনুসারী, প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব একটি ধর্মীয় উৎসব রয়েছে। সেই উৎসবের মাধ্যমে তারা যেমন আনন্দ প্রকাশ করে, তেমনি নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়ও তুলে ধরে। খ্রিস্টানদের ক্রিসমাস ডে, হিন্দুদের হোলি ও দীপাবলি এবং পারসিদের নওরোজ ও মেহেরজান তাদের ধর্মীয় উৎসবের জানান দেয়।

অন্যদিকে মুসলমানদের ঈদ অন্যান্য ধর্ম ও জাতির উৎসব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্য বহন করে। অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে যেখানে অবাধ ভোগ-বিলাস ও অশ্লীলতার প্রাধান্য দেখা যায়, সেখানে মুসলমানদের ঈদের মূল লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ অর্জন করা।

মুসলমানদের ঈদের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর আনুগত্য, নববী আদর্শ, ত্যাগ ও কোরবানির চেতনা, দরিদ্রপ্রীতি এবং মানবিক সহমর্মিতা। পশু কোরবানি করা মূলত ইসলামের বিধান পালন করার জন্য নিজের প্রবৃত্তি ও কামনাকে কোরবানি করার প্রতীক।

এই দিনটি কীভাবে গুজরান করা উচিত, আসুন শরিয়তের আলোকে কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় জেনে নিই।

করণীয় কাজ:
১. ঈদের নামাজের আগে ভালোভাবে গোসল করা।
ইবন আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন গোসল করতেন। 
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৩১৫ )

২. ভালো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা। 
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন, রাসূল (ﷺ) ঈদের দিন লাল রঙের চাদর পরতেন।
(মাআরিফুল হাদীস, হাদীস নং ৪৩৩)

৩.ঈদুল আজহার দিন ঈদের নামাজের পরে খাওয়া।
হযরত বুরায়দা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: নবী কারীম ﷺ ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খাওয়া পর্যন্ত ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হতেন না এবং ঈদুল আযহার দিন নামাজ আদায় না করা পর্যন্ত কিছু খেতেন না। _ (তিরমিযী ,হাদীস নং ৫৪২)

৪. এক পথ দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া, অন্য পথে ফিরে আসা।
 জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন এক পথ দিয়ে যেতেন এবং ভিন্ন পথ দিয়ে ফিরতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯৮৬ )

৫. ইদগাহে যাওয়ার সময় উচ্চস্বরে বেশি পরিমাণে তাকবিরে তাশরিক বলা। তা হলো, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
হানাশ বিন মু‘তামির রাহ. বলেন, আমি আলী রা.-কে ঈদুল আজহায় তাকবীর বলতে বলতে ময়দানে আসতে দেখেছি। (সুনানে দারাকুতনী ২/৪৪)

৬. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া ও পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরা। 
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন এবং পায়ে হেঁটে ঈদগাহ থেকে ফিরতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১২৯৫ )

৭.ঈদের দিন একে অপরের সাথে দেখা হলে শুভেচ্ছা বিনিময় করা।
জুবায়ের ইবনে নুফাইর রাহ. বলেন, সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন- تَقَبّلَ اللّهُ مِنّا وَمِنْكَ. আল্লাহ কবুল করুন আমাদের পক্ষ হতে ও আপনার পক্ষ হতে। (ফাতহুল বারী ২/৫১৭ )

৮ . সকাল সকাল ঈদগাহে যাওয়া।
তাবেয়ী ইয়াযীদ ইবনে খুমাইর রাহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর রা. ঈদুল ফিতর অথবা ঈদুল আযহার দিন লোকদের সাথে ঈদের নামায পড়ার জন্য ঈদগাহে গেলেন। ইমামের আসতে বিলম্ব হলে তিনি এর প্রতিবাদ করে বললেন, এ সময় তো আমরা (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে) নামায পড়ে ফারেগ হয়ে যেতাম। (বর্ণনাকারী বলেন) আর এটা নফলের (অর্থাৎ চাশতের) সময় ছিল।
( সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১১৩৫ )

৯. প্রথমে ঈদের নামাজ আদায় করা তারপর কোরবানী করা।
বারা ইবনে আযীব রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশে খুতবা দিলেন। তাতে বললেন, আমাদের এই দিবসে প্রথম কাজ নামাজ আদায় করা, এরপর কোরবানি করা। সুতরাং যে এভাবে করবে তার কাজ আমাদের তরীকা মতো হবে। আর যে আগেই জবেহ করেছে (তার কাজ তরীকা মতো হয়নি অতএব) তা পরিবারের জন্য প্রস্তুতকৃত গোশত, (আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত) কুরবানী নয়। 
(সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৯৬৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৯৬১)

১০.বর্জ্য পরিষ্কার করে ফেলা।
কোরবানির পশুর বর্জ্য রাস্তাঘাট বা গলিতে না ফেলে নির্দিষ্ট ডাস্টবিন বা নির্ধারিত স্থানে ফেলতে হবে, যাতে সহজে পরিষ্কার করা যায়। পশুর খাবার বা অন্যান্য আবর্জনাও রাস্তায় না ফেলে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা উচিত। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।

১১. আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া ।
ঈদের দিন আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া ও তাদের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া কর্তব্য। পাশাপাশি প্রতিবেশীরও খোঁজখবর নেওয়া।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"এবং আল্লাহর ইবাদত কর ও তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না। পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর। আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গে বসা (বা দাঁড়ানো) ব্যক্তি, পথচারী এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও (সদ্ব্যবহার কর)। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন দর্পিত অহংকারীকে পছন্দ করেন না।"
(আন নিসা -আয়াত ৩৬)

১২. এতিম ও অভাবীকে পানাহার করানো। ঈদের দিন এতিমের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের খাবার খাওয়ানো এবং সম্ভব হলে তাদের নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করে দেয়া উচিত। 
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ‘তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।’ (সুরা দাহর : ৮)

১৩. মনোমালিন্য দূরীকরণ : জীবন চলার পথে ঝগড়া - বিবাদ- বিসংবাদ হতে পারে। ঈদের সময় পারস্পরিক মনোমালিন্য দূর করে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার উত্তম সময়। 
রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে, তার ভাইয়ের সাথে তিনদিনের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে। তাদের অবস্থা এমন যে, দেখা-সাক্ষাৎ হলে একজন অন্যজনকে এড়িয়ে চলে। এ দু’জনের মাঝে ওই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যে আগে সালাম দেয়।’ 
(সহিহ মুসলিম : হাদিস নং:৬৬৯৭)

১৪. আনন্দ প্রকাশ করা : ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে সুষ্ঠু বিনোদনের সুযোগ রয়েছে। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) ঈদের দিন আমার ঘরে এলেন, তখন আমার কাছে দু’জন কিশোরী বুয়াস যুদ্ধের বীরদের স্মরণে গান গাচ্ছিল। তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না। এরই মধ্যে আবু বকর (রা.) ঘরে প্রবেশ করে এ বলে আমাকে ধমকাতে লাগলেন যে, নবীজি (সা.)-এর ঘরে শয়তানের বাঁশি? রাসুল (সা.) তার কথা শুনে বললেন, ‘ওদের গাইতে দাও হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর এটি আমাদের ঈদের দিন।’ (সহিহ বোখারি : হাদিস নং:৯৫২)

বর্জনীয় কাজ:

১.ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম।
 রাসুল (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। 
আবু সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দু’দিন অর্থাৎ ঈদূল ফিতরের দিন এবং কুরবানীর দিন রোজা পালন করতে নিষেধ করেছেন।
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৪৫)

২. ঈদের নামাজ না পড়ে আনন্দ-ফুর্তি করা হারাম । কারণ , ঈদের নামাজ ওয়াজিব। অনেকে ঈদের আনন্দে মশগুল হয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিধান, সেমাই, ফিরনি ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ঈদের নামাজ আদায় করার কথা ভুলে যায়। অথচ এই দিনে ঈদের নামাজ ও কোরবানি করাই হচ্ছে মুসলমানদের মূল কাজ।

৩.কোরবানির গোশত,চামড়া কোনো কিছু বিক্রি করা যাবে না। বিক্রি করলে নিজে উপকৃত হওয়া যাবে না। সদাকাহ করে দিতে হবে। এমনকি কসাইকে পারিশ্রমিকস্বরূপ গোশত দেওয়া যাবে না। তবে সাধারণভাবে তাকে খেতে দেওয়ায় অসুবিধা নেই।
হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে নির্দেশ দিলেন যে, আমি যেন তাঁর কুরবানীর উটসমূহ দেখাশুনা করি এবং এগুলোর গোশত, চামড়া ইত্যাদি গরীবদের মধ্যে সদাকাহ করে দেই। আর কসাইকে যেন (পারিশ্রমিক হিসাবে) এখান থেকে কিছু না দেই। তিনি বলেছিলেন যে, আমরা তাদের পারিশ্রমিক নিজের পক্ষ থেকে আদায় করে দিব।
(মা'আরিফুল হাদীস, হাদীস নং ১৬৬)

৪. গান-বাজনা, মদ পান,জুয়া খেলা, ঢোল বাজানো নিষিদ্ধ।
হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ্ তা'আলা মদ্যপান করা, জুয়া খেলা এবং ঢোল বাজানো হারাম করেছেন এবং বলেছেন, প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তু হারাম।
(মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ৪৫০৩)

৫.অপচয়-অপব্যয় করা যাবে না।
 ঈদের কেনাকাটা থেকে শুরু করে এ উপলক্ষ্যে সবকিছুতেই অপচয়-অপব্যয় করা হয়। অথচ আল্লাহ তা'আলা বলেন, ‘তোমরা কোনোভাবেই অপব্যয় করো না, নিশ্চয় অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।’
(সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত: ২৬-২৭)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, ‘তোমরা পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না।’ (সুরা আরাফ : আয়াত:৩১)

লেখক: সাবেক মুহাদ্দিস, জামিয়া কাসিমিয়া মহাখালী টিএন্ডটি কলোনি ঢাকা।
ফিকহ ও ইফতা, মারকাজুল ফিকরিল ইসলামী বাংলাদেশ বসুন্ধরা ঢাকা।

এমএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ