শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬ ।। ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২ ।। ২৫ রমজান ১৪৪৭

শিরোনাম :

কালেকশন ইস্যুতে কওমিদের মানসিক ডিলেমা!

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

ইমরান হোসাইন নাঈম

তখন আমি বারিধারা মাদরাসায় পড়ি। সালানা পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ছুটির আগে সব তলবাকে নিয়ে একটি বার্ষিক মজলিস বসল। হুজুররা এলেন। সবাই কমবেশি নসিহাত করলেন। সবার শেষে কথা বললেন মাওলানা নাজমুল সাহেব।

তখন বারিধারা মাদরাসার কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছিল। মাদরাসার ওপর ছিল বিশাল ঋণের বোঝা– প্রায় দুই আড়াই কোটি টাকা। সেই প্রসঙ্গেই নাজমুল সাহেব কথা বলছিলেন। ছাত্রদের কষ্টের কথাও তিনি উল্লেখ করলেন।

সে বছরের প্রথম প্রায় ছয় মাস মাদরাসার খানাদানার অবস্থা ছিল দুর্বল। মেশকাতের জামাত ছিল দোতলায়; তৃতীয় তলা তখনো হয়নি। সময়টা ছিল প্রচণ্ড গরমের মৌসুম। কিন্তু একটি ফ্যানও ছিল না আমাদের জামাতে। পরে আমরা ছাত্ররা কিছু টাকা তুলে অর্ধেক ফ্যান কিনেছিলাম।

তবু বাস্তবতা হলো—মাদরাসায় পড়তে আমাদের একটি টাকাও খরচ হতো না। থাকা, খাওয়া, পড়া—সবই ছিল সম্পূর্ণ ফ্রি। তা সত্ত্বেও নাজমুল সাহেব ছাত্রদের কষ্টের কথা বললেন। সেই সঙ্গে বললেন, মানুষের কাছ থেকে কালেকশন করতে গিয়ে তাদের কতটা কষ্ট সহ্য করতে হয়। কয়েকটি বাস্তব ঘটনাও তিনি শোনালেন।

তার কথা শেষ হলে এক ছাত্র অনুমতি নিয়ে দাঁড়াল। সে বলল:

‘হুজুর, আপনারা যদি আমাদের জন্য এত কষ্ট না করতেন, তাহলে আমাদের মতো গরিব ঘরের সন্তানরা কখনো পড়াশোনা করতে পারতাম না। আপনাদের এই ঋণ…।’

কথা বলতে বলতে সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। পুরো মজলিসে নেমে এল গভীর নীরবতা। সেই নীরবতা ভাঙলেন আমাদের মুহসিন ওস্তাদ মাওলানা নাজমুর হক কাসেমি (দা:বা:)।

তার কথায় পুরো মজলিস স্তব্ধ হয়ে ছিল। যে উপলব্ধির কথা সে বলেছিল—আজ হঠাৎ গজিয়ে ওঠা অনেক ‘পশ কওমিয়ান’-এর হৃদয় থেকে সেই উপলব্ধিটাই হারিয়ে গেছে।

২/ আজ দেখা যাচ্ছে, কওমি মাদরাসার কালেকশন নিয়ে কওমি মাদরাসারই কিছু ছাত্র দেদারসে কটূক্তি করছে।

তাদের অকাট্য যুক্তি—

যদি কালেকশন করেই মাদরাসা চালাতে হয়, তাহলে মাদরাসা খোলারই বা কী দরকার?

এই যুক্তি যদি সত্যি ধরা হয়, তাহলে হাটহাজারী, যাত্রাবাড়ি, বারিধারা—এমন বড় বড় মাদরাসাও কি চলতে পারবে? উত্তর স্পষ্ট: পারবে না।

আর যদি মাদরাসাগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের লাখ লাখ গরিব পরিবারের সন্তানের পড়াশোনার কী হবে? তাদের দায়িত্ব কি কেউ নেবে?

মজার বিষয় হলো, মাদরাসার কালেকশন নিয়ে প্রশ্ন তোলা বড় অংশই কিন্তু মাদরাসায় ফ্রি পড়েছে ও খেয়েছে। অনেকে এখনো রানিং স্টুডেন্ট। মাদরাসায় বিনা খরচে থেকে, খেয়ে, পড়াশোনা করে—শুয়ে শুয়ে পোস্ট করে কালেকশনের বিরুদ্ধে।

বাস্তবতা হলো, কওমি মাদরাসাগুলো বাংলাদেশের সমাজে বিশাল এক সামাজিক ভূমিকা পালন করছে।

বর্তমানে টাকা খরচ করে ভালো মানের শিক্ষা পাওয়া মধ্যবিত্তের জন্যও কঠিন হয়ে গেছে; গরিবের সন্তানদের কথা তো হিসাবেরই বাইরে। সেখানে কওমি মাদরাসাগুলো লাখো গরিবের সন্তানকে শিক্ষা দিচ্ছে এবং তাদের হাফেজ, আলেম ও মুফতি হিসেবে গড়ে তুলছে। সমাজে আজ তাদের সম্মানও আলাদা মাত্রার।

কওমি মাদরাসাগুলো না থাকলে—আলেম তো দূরের কথা—অনেকেই হয়তো অশিক্ষিত শ্রমিক হিসেবেই থেকে যেত।

এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাও চলে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে অনেকেই এক ধরনের ‘পশ’ ভাব নেয়। অথচ তারাও পড়াশোনা করে সরকারি কালেকশনের টাকায়—অর্থাৎ জনগণের ট্যাক্সের টাকায়।

সেই সরকারি অনুদান বন্ধ হয়ে গেলে হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর পড়াশোনাই বন্ধ হয়ে যাবে। মাগনা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবার শখ ছুটে যাবে।

৩/ আজ কওমিয়ানদের একটি অংশের মধ্যে এক ধরনের মানসিক ডায়লামা বা হীনমন্যতা দেখা যাচ্ছে। মাদরাসার কোনো সিস্টেমই তাদের আর ভালো লাগে না—মাহফিল ভালো লাগে না, কড়া নিয়ম ভালো লাগে না। বিশেষ করে কালেকশনের কারণে তাদের সম্মান যায় যায় অবস্থা। সমাজে নাকি তাদের মুখ দেখানোই কঠিন হয়ে গেছে।

অথচ বাস্তবতা হলো—এই কালেকশন না থাকলে কওমি মাদরাসার লাখো ছাত্র, যাদের অনেকেই আজ লজ্জায় মুখ লুকায়(?), তারা কোনো শিক্ষাই পেত না। যে সমাজ কালেকশন নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সেই সমাজও তাদের শিক্ষার দায়িত্ব নিতে কখনোই এগিয়ে আসত না।

এই বাস্তবতা ভুলে যাওয়া আসলে এক ধরনের নৈতিক অকৃতজ্ঞতা ও নেমকহারামি।

কওমিয়ানরা আসলে পড়েছে এক মানসিক ডিলেমায় বা উভয় সংকটে। মাদরাসাওয়ালারা কালেকশন করলেও খারাপ। আবার বেশি টাকা নিলেও খারাপ। তখন ঠিক এরাই প্রশ্ন তুলে বললে, মাদরাসার নামে ব্যবসা শুরু করেছে। সুতরাং মাদরাসাগুলো বন্ধ করে দিলেই বুঝি এই নেমকহারামদের কলিজা ঠান্ডা হবে।

লেখক: তরুণ আলেম, লেখক ও অনুবাদক

আরএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ