বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
ইসলামি বইমেলায় লিটলম্যাগ কর্নার নিয়ে অনিশ্চয়তায় ক্ষুব্ধ তরুণ লেখকরা এসএসসির পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশ, ফেল থেকে পাশ ৪ হাজার ৫৮৫ জন ইরানের দক্ষিণ উপকূলে রাতভর দফায় দফায় বিস্ফোরণ খায়বার বিজয়—অন্যায়ের দুর্গে ন্যায়ের পতাকা ‘কৃত্রিমতার সময়ে নবীজি (সা.)-এর অকৃত্রিম জীবনই বড় শিক্ষা’ সংসদে নামাজ কায়েম ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকাত চালুর দাবি সেনাবাহিনীর ফিল্ড ফায়ারিংয়ে হতাহতের ঘটনায় ইসলামী আন্দোলনের শোক মেখলের মাওলানা উসমান ফয়েজীর সুস্থতায় বিশেষ দোয়ার আহ্বান হাটহাজারীর মুহতামিমের ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর নামাজের সময়সূচি ওমরাহ পালন শেষে মদিনায় বাংলাদেশি নারীর মৃত্যু

খায়বার বিজয়—অন্যায়ের দুর্গে ন্যায়ের পতাকা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

সন্ধ্যায় উঠোনে বসে আছে নাতি-নাতনিরা। আকাশে একফালি চাঁদ। সবাই অপেক্ষা করছে দাদার জন্য। তিনি নামায পড়ে এসে পান খেতে রুমে ঢুকেছেন।

দাদা চেয়ারে বসে মৃদু হেসে বললেন, আচ্ছা বলো তো, যদি কোনো শত্রু সামনে থেকে যুদ্ধ না করে, লুকিয়ে লুকিয়ে বারবার ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে কী করা উচিত?

একজন নাতি বলল, দাদা, তাকে তো থামাতেই হবে!

দাদা মাথা নেড়ে বললেন, ঠিক তাই। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর চারদিকে কিছুটা শান্তি ফিরে এসেছিল। মানুষ আবার ইসলামের কথা শুনতে শুরু করেছিল। কিন্তু মদিনার উত্তরে ছিল খায়বার। সেখানে বসবাসকারী কিছু ইহুদি গোত্র বহুদিন ধরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করে আসছিল। তারা শত্রুদের উসকে দিত, যুদ্ধের জন্য অর্থ ও অস্ত্র দিত, এমনকি খন্দকের যুদ্ধেও তাদের ভূমিকা ছিল। তাই মুসলমানদের নিরাপত্তার জন্য এই হুমকি দূর করা খুবই জরুরি হয়ে উঠেছিল।

দাদা একটু থেমে বললেন, মনে রেখো, ইসলাম কখনো অন্যের সম্পদ দখল করার জন্য যুদ্ধ করেনি। কিন্তু মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষা করা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দাদা আবার বলতে শুরু করলেন, সপ্তম হিজরির কথা। এক সকালে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রায় চৌদ্দশো সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে খায়বারের দিকে রওনা হলেন।

পথটা ছিল দীর্ঘ। মরুভূমির উত্তপ্ত বালু, দিনের তীব্র রোদ আর রাতের হিমেল বাতাস— সবকিছু সহ্য করেই সাহাবিরা এগিয়ে চললেন। খায়বারে পৌঁছে তারা দেখলেন, একটির পর একটি বিশাল দুর্গ। উঁচু প্রাচীর, মজবুত দরজা— দেখলেই মনে হয়, এগুলো জয় করা যেন অসম্ভব।

এক নাতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, দাদা, তারা কি ভয় পেয়েছিলেন?

দাদা মুচকি হেসে বললেন, যার হৃদয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা থাকে, তার কাছে বড় দুর্গও ছোট হয়ে যায়।

দাদা এবার কণ্ঠে একটু আবেগ এনে বললেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, 'আগামীকাল আমি এমন একজনের হাতে পতাকা দেব, যিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসেন, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলও তাঁকে ভালোবাসেন। তাঁর হাতেই আল্লাহ বিজয় দান করবেন।' এই কথা শুনে প্রত্যেক সাহাবির মনে একটাই আশা— যদি সেই সৌভাগ্য আমার হতো!

পরদিন সবাই অপেক্ষা করছেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ডাকলেন, আলী কোথায়?

সাহাবিরা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, তাঁর চোখে ব্যথা।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে ডেকে আনলেন। তারপর তাঁর চোখে নিজের মুবারক লালা লাগিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় হযরত আলী (রা.)-এর চোখ সঙ্গে সঙ্গেই ভালো হয়ে গেল।

নাতিরা বিস্ময়ে বলল, সুবহানাল্লাহ!

দাদা হেসে বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ যাকে সাহায্য করেন, তার জন্য অসম্ভব বলে কিছু থাকে না। হযরত আলী (রা.) হাতে তুলে নিলেন ইসলামের পতাকা। তিনি সাহস, ধৈর্য আর আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। একটির পর একটি দুর্গ মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসতে লাগল।

দাদা বললেন, মনে রেখো, এই বিজয় কিন্তু শুধুমাত্র তরবারির ছিল না। এটি ছিল ঈমান, ধৈর্য, শৃঙ্খলা আর আল্লাহর সাহায্যের বিজয়। আল্লাহ শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের বিজয় দান করলেন।

এক নাতনি জিজ্ঞেস করল, দাদা, এরপর কি সবাইকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল?

দাদা মাথা নেড়ে বললেন, না দাদু, এটাই তো ইসলামের সৌন্দর্য। যারা আত্মসমর্পণ করেছিল, তাদের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত চুক্তি করা হলো। তাদের কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো।

প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার। ঘৃণা নয়, মানবিকতা। এই আচরণ দেখে অনেক মানুষ বুঝতে পারল, ইসলাম শক্তির জোরে নয়; ন্যায় ও দয়ার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করে।

দাদা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, খায়বার বিজয়ের পর মদিনার উত্তর দিকের বড় হুমকি দূর হয়ে গেল। মুসলমানরা আরও নিরাপদ হলো। ইসলামের প্রভাবও আরবজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মানুষ বুঝতে শুরু করল, ইসলাম অন্যায় দখল বা প্রতিশোধের শিক্ষা দেয় না। ইসলাম শেখায় সত্য, ন্যায়, শান্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা।

দাদা এবার নাতিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, খায়বারের বিজয় শুধু একটি যুদ্ধের গল্প নয়; এটি ন্যায়ের পতাকা উঁচু করে ধরার গল্প।

দাদা গল্প শেষ করে বললেন, আচ্ছা, আজকের গল্প থেকে আমরা কী শিখলাম?

নাতি-নাতনিরা চুপচাপ।

তারপর তিনি নিজেই উত্তর দিলেন—

# অন্যায় ও ষড়যন্ত্র যত শক্তিশালীই হোক, সত্য ও ন্যায় শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়।

# আল্লাহর ওপর ভরসা, ধৈর্য ও সাহস সফলতার প্রধান চাবিকাঠি।

# বিজয়ের পর প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার ও ক্ষমাশীলতাই একজন মুমিনের প্রকৃত চরিত্র।

# যোগ্যতা, ঈমান ও আন্তরিকতার মর্যাদা আল্লাহ অবশ্যই দান করেন।

দাদা আবার মুচকি হেসে বললেন, এই জন্যই বাচ্চারা, আমরা শুধু খায়বারের বিজয়কে মনে রাখি না; মনে রাখি সেই বিজয়ের মাধ্যমে শেখা ন্যায়, দয়া আর আল্লাহর ওপর অটুট ভরসার শিক্ষা।

নাতি-নাতনিরা ইনশাআল্লাহ বলে ওঠে গেল। আগামীকালের গল্পের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

 

গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব:২৩)

লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী

চলবে....

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ