ঝিমঝিম অবস্থায় দাদা চেয়ারে বসে আছেন। তার শরীরটা আজ ভালো না। তবুও তিনি গল্পের আসরে উপস্থিত হয়েছেন। কারণ, এটি কোনো সাধারণ গল্পের আসর নয়; মহানবীর জীবনের গল্পের আসর। অপরদিকে নাতি-নাতনীদের আবদার। তাই ক্লান্ত শরীর নিয়েই তিনি উপস্থিত হয়েছেন।
দাদা মাথাটা উঁচু করে বললেন, "আচ্ছা দাদু ভাইয়েরা, বলো তো, এমন কোনো ঘটনা আছে, যেটা প্রথমে সবাই পরাজয় ভেবেছিল, কিন্তু পরে সেটাই সবচেয়ে বড় বিজয় হয়ে গিয়েছিল?
নাতি-নাতনিরা উত্তর দিল, জানি না তো!
দাদা মৃদু হেসে বললেন, আছে! আজ আমি তোমাদের এমনই এক গল্প শোনাব— "হুদায়বিয়ার সন্ধির গল্প"।
হিজরির ষষ্ঠ বছর। মদিনায় মুসলমানরা তখন অনেকটাই শক্তিশালী ও সুসংগঠিত। কিন্তু তাদের হৃদয়ে একটি কষ্ট ছিল। অনেক দিন হয়ে গেছে, তারা কাবা শরিফ দেখতে পারেন না। আল্লাহর ঘরকে ঘিরে তাওয়াফ করার জন্য তাদের মন ছটফট করত লাগল।
এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে তিনি এবং তাঁর সাহাবিরা নিরাপদে মক্কায় প্রবেশ করেছেন এবং উমরা আদায় করছেন। এই স্বপ্ন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এক সুসংবাদ।
পরদিন নবিজি সাহাবিদের বললেন, "চলো, আমরা উমরা করার উদ্দেশ্যে মক্কার পথে যাই।" সবার মুখ আনন্দে ভরে উঠল।
প্রায় চৌদ্দশো সাহাবি ইহরাম পরে যাত্রা শুরু করলেন। সঙ্গে ছিল কুরবানির উট। তবে একটি বিষয় সবাইকে অবাক করেছিল। তাদের কাছে যুদ্ধের অস্ত্র ছিল না। কারণ, তারা যুদ্ধ করতে যাচ্ছিলেন না। তারা যাচ্ছিলেন শুধু আল্লাহর ঘরের জিয়ারত করতে।
এই খবরটি মক্কার কুরাইশদের কানে পৌঁছাতেই তারা ভয় পেয়ে গেল। তারা সিদ্ধান্ত নিল, "মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের কোনোভাবেই মক্কায় ঢুকতে দেওয়া যাবে না!" এই উদ্দেশ্যে তারা সশস্ত্র সৈন্য পাঠিয়ে মুসলমানদের পথ আটকে দিল।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুদ্ধ করতে চাইলে তখনই যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারত। কিন্তু তিনি জানতেন, শান্তি রক্ষা করাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কাজ। তাই তিনি মক্কার কাছাকাছি হুদায়বিয়া নামের একটি স্থানে অবস্থান নিলেন।
হুদায়বিয়ায় অবস্থান করার সময় নবিজি উসমান ইবনে আফফান (রা.)-কে আলোচনার জন্য মক্কায় পাঠালেন। দিন কেটে গেল, কিন্তু তিনি ফিরলেন না। হঠাৎ একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ল— "উসমান (রা.)-কে হত্যা করা হয়েছে!"
খবরটি শুনে সাহাবিদের হৃদয় কেঁপে উঠল। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি গাছের নিচে বসলেন। একজন একজন করে সাহাবিরা তাঁর হাতে হাত রেখে শপথ করতে লাগলেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনার সঙ্গে থাকব।"
কী অসাধারণ দৃশ্য ছিল সেটি! এই শপথই ইতিহাসে বাইআতুর রিদওয়ান নামে অমর হয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর জানা গেল, খবরটি সত্য নয়। উসমান (রা.) নিরাপদেই আছেন। সবাই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন।
এরপর কুরাইশদের প্রতিনিধি সুহাইল ইবনে আমর এসে আলোচনায় বসলেন। দীর্ঘ আলোচনা শেষে একটি শান্তিচুক্তি হলো। কিন্তু শর্তগুলো শুনে সাহাবিদের মন ভারী হয়ে গেল। তাদের শর্ত ছিল- 'এই বছর উমরা করা যাবে না। মদিনায় ফিরে যেতে হবে। আগামী বছর এসে মাত্র তিন দিন অবস্থান করে উমরা করা যাবে।'
আরও একটি শর্ত ছিল— 'মক্কা থেকে কেউ মদিনায় চলে এলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু মদিনা থেকে কেউ মক্কায় গেলে তাকে ফেরত দেওয়া হবে না।'
বাহ্যিকভাবে সব শর্তই মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনে হচ্ছিল। এজন্য সাহাবিদের অনেকেই কষ্ট পেলেন। বিশেষ করে উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) নিজের আবেগ লুকাতে পারলেন না। তিনি জানতে চাইলেন, "আমরা কি সত্যের ওপর নই? তাহলে এমন শর্ত কেন মেনে নিচ্ছি?"
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শান্ত কণ্ঠে সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন, "আমি আল্লাহর রাসুল। তিনি কখনো আমাকে পরিত্যাগ করবেন না।"
সাহাবিরা তখন পুরো বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তবুও তারা প্রিয়নবীর সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন।
মদিনায় ফেরার পথে আল্লাহ তাআলা সূরা ফাতাহ নাজিল করলেন। সেখানে এই সন্ধিকে বলা হলো— "সুস্পষ্ট বিজয়।"
সাহাবিরা অবাক হয়ে গেলেন। যে চুক্তিকে তারা পরাজয় মনে করেছিলেন, আল্লাহ সেটাকেই বিজয় ঘোষণা করেছেন! ধীরে ধীরে তারা বুঝতে শুরু করলেন, আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বড়।
শান্তি চুক্তির মধ্যেই এলো সবচেয়ে বড় বিজয়। যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেল। মানুষ নিরাপদে একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে লাগল। মুসলমানরা শান্তিপূর্ণভাবে পুরো পৃথিবীতে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে পারলেন।
অসংখ্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেন। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই ইসলামের প্রসার এত বেড়ে গেল, যা আগের বহু বছরের চেয়েও বেশি ছিল। আর এই হুদায়বিয়ার সন্ধিই পরে মক্কা বিজয়ের পথ খুলে দিল।
দাদা একটু থেমে বললেন, দেখলে দাদু ভাইয়েরা? আমরা মানুষ শুধু আজকের দিনটা দেখি। কিন্তু আল্লাহ ভবিষ্যৎও দেখেন। তাই তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা রাখাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
নাতি-নাতনিরা মুগ্ধ হয়ে গল্প শুনছিল। তাদের একজন আস্তে করে বলল, দাদা, সত্যিই তো! সব পরাজয় আসলে পরাজয় নয়।
দাদা হেসে বললেন, ঠিক তাই। কখনো কখনো ধৈর্যই মানুষের সবচেয়ে বড় বিজয় এনে দেয়। এবার বলো তো, এই গল্প থেকে আমরা কী শিখলাম!
নাতি-নাতনিরা কোন উত্তর দিতে পারল না। দাদা বললেন, শোন তাহলে- আমরা আজকের গল্প থেকে শিখলাম-
# দূরদর্শী নেতৃত্ব তাৎক্ষণিক আবেগের চেয়ে অনেক বেশি ফলপ্রসূ।
# শান্তি প্রতিষ্ঠা অনেক সময় যুদ্ধের চেয়েও বড় বিজয় এনে দেয়।
# আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
# ধৈর্য ও সংযমের ফল শেষ পর্যন্ত কল্যাণকর হয়।
# বাহ্যিকভাবে পরাজয় মনে হলেও, আল্লাহ চাইলে সেটিই মহান বিজয়ে পরিণত হতে পারে।
এগুলো তোমরা মনে রাখবে তো ইনশাআল্লাহ। নাতি-নাতনিরা বলল, ইনশাআল্লাহ মনে রাখব। তাহলে ওঠা যাক। আমি রাতভর আগামীকালের গল্প রেডি করি।
গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ২২)
লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী
চলবে....
আইও/