আওয়ার ইসলাম ডেস্ক
ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যে জমজম কূপের বহু নাম ও উপাধির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রতিটি নামই এর বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য, মর্যাদা বা বরকতের দিক নির্দেশ করে। নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাম, তাদের অর্থ ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।
১. زمزم (জমজম)
অর্থ: প্রাচুর্যময় পানি, অবিরাম প্রবাহ। জমজম এই বরকতময় পানির সর্বাধিক পরিচিত নাম। প্রচুর পরিমাণে পানি প্রবাহিত হওয়ার কারণেই এ নামকরণ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
২. بركة (বারাকাহ/বরকত)
অর্থ: বরকতময়, কল্যাণময়। জমজমের পানি আল্লাহর বিশেষ বরকতের উৎস। তাই এর একটি নাম ‘বারাকাহ’।
৩. سيدة (সাঈয়্যিদাহ)
অর্থ: সব পানির নেত্রী বা শ্রেষ্ঠ। পৃথিবীর পানিসমূহের মধ্যে এর বিশেষ মর্যাদা থাকায় এ নাম ব্যবহৃত হয়েছে।
৪. نافعة (নাফিয়াহ)
অর্থ: উপকারী, কল্যাণকর। আল্লাহর ইচ্ছায় এ পানি পান করে মানুষ নানাবিধ উপকার লাভ করে।
৫. طاهرة (তাহিরাহ)
অর্থ: পবিত্র, নির্মল। জমজমের পানি বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন হওয়ায় এ নামকরণ।
৬. ظاهرة (জাহিরাহ)
অর্থ: প্রকাশিত, সুস্পষ্ট। এর উৎস, প্রবাহ ও উপকারিতা সুস্পষ্ট হওয়ায় এ নাম ব্যবহৃত হয়েছে।
৭. طيبة (তইয়্যিবাহ)
অর্থ: পবিত্র ও উৎকৃষ্ট। মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে এ পানি প্রবাহিত হওয়ায় এটি এ নামে পরিচিত।
৮. شفاء (শিফা)
অর্থ: আরোগ্য। আল্লাহর ইচ্ছায় জমজমের পানি রোগমুক্তির কারণ হতে পারে।
৯. حرمية (হারমিয়্যাহ)
অর্থ: হারাম শরিফের পানি। যেহেতু এর উৎস মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে, তাই এ নাম।
১০. مربية (মারবিয়্যাহ)
অর্থ: পুষ্টিদায়িনী। এ পানি শরীরকে শক্তি ও পুষ্টি জোগায়।
১১. رواء (রাওআ)
অর্থ: তৃষ্ণা নিবারণকারী। এ পানি পান করে মানুষ পরিপূর্ণ তৃপ্তি লাভ করে।
১২. مظنونة (মাযনূনা)
অর্থ: মূল্যবান ও যত্নে সংরক্ষিত। জমজমের বিশেষ মর্যাদার কারণে এ নাম ব্যবহৃত হয়েছে।
১৩. عون (আওন)
অর্থ: সাহায্য, সহযোগিতা। হজরত হাজেরা আলাইহাস সালাম ও হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের জন্য এটি ছিল আল্লাহর বিশেষ সাহায্য।
১৪. معذبة (মা‘যাবাহ)
অর্থ: সুমিষ্ট ও সুস্বাদু। জমজমের পানির স্বাদ ও প্রশান্তির দিকটি এ নামে প্রকাশ পেয়েছে।
১৫. سالمة (সালিমাহ)
অর্থ: নিরাপদ, সুস্থতাদায়ক। এ পানি কল্যাণ ও নিরাপত্তার প্রতীক।
১৬. شبعة (শুবআ)
অর্থ: তৃপ্তিদায়ক। এ পানি ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নিবারণে সহায়ক।
১৭. كافية (কাফিয়াহ)
অর্থ: যথেষ্ট, পরিপূর্ণকারী। সৎ নিয়তে পান করলে আল্লাহর ইচ্ছায় মানুষের প্রয়োজন পূরণে সহায়ক হয়।
১৮. عافية (আফিয়াহ)
অর্থ: সুস্থতা ও নিরাপত্তা। এ পানি সুস্থতা লাভের অন্যতম মাধ্যম।
১৯. مؤنسة (মুআন্নাসাহ)
অর্থ: শক্তি ও সাহস দানকারী। জমজম মানুষের দেহ ও মনে শক্তি সঞ্চার করে।
২০. طعام الأبرار (তা'আমুল আবরার)
অর্থ: পুণ্যবানদের খাদ্য। নেককার ব্যক্তিরা বিশেষ নিয়তে এ পানি পান করেন।
২১. مغذية (মাগযিয়াহ)
অর্থ: পুষ্টিদায়ক। জমজমের পানি খাদ্যের বিকল্প হিসেবেও উপকারী হতে পারে।
২২. شراب الأبرار (শারাবুল আবরার)
অর্থ: পুণ্যবানদের পানীয়। এ পানি আত্মিক প্রশান্তি ও আনন্দের উৎস।
২৩. مجلية البصر (মুজলিয়াতুল বাসার)
অর্থ: দৃষ্টিশক্তির উপকারকারী। আল্লাহর ইচ্ছায় এ পানি কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে।
২৪. صافية (সাফিয়াহ)
অর্থ: নির্মল, স্বচ্ছ। জমজমের পানি বিশুদ্ধতার প্রতীক।
২৫. همزة جبريل (হামযাতু জিবরাঈল)
হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে এ পানির উৎস প্রকাশিত হওয়ার স্মারক হিসেবে এ নাম ব্যবহৃত হয়।
২৬. وطأة جبريل (ওয়াতআতু জিবরাঈল)
হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামের পদস্পর্শের স্মৃতিবাহী একটি নাম।
২৭. سقاية الحجاج (সিকায়াতুল হুজ্জাজ)
অর্থ: হাজিদের পানীয়। যুগে যুগে হাজিদের তৃষ্ণা নিবারণ করেছে জমজম।
২৮. بشرى (বুশরা)
অর্থ: সুসংবাদ। হজরত হাজেরা আলাইহাস সালামের দুঃসময়ে এ পানির আবির্ভাব ছিল মহান আল্লাহর সুসংবাদ।
২৯. عاصمة (আসিমাহ)
অর্থ: রক্ষাকারিণী। এ পানি কল্যাণ ও নিরাপত্তার প্রতীক।
৩০. غياث (গিয়াস)
অর্থ: সাহায্যকারী, উদ্ধারকারী। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে অসহায় মা ও সন্তানের জন্য বিশেষ সাহায্য।
৩১. ماثورة العباس (মা'ছুরাতুল আব্বাস)
হযরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে জমজমের সেবার ঐতিহাসিক সম্পর্কের স্মারক হিসেবে এ নাম ব্যবহৃত হয়।
৩২. مفدى (মিফদা)
অর্থ: সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ। জমজমের উচ্চ মর্যাদার কারণে এ নাম প্রচলিত হয়েছে।
৩৩. نقرة الغراب الأعصم (নুকরাতুল গুরাবিল আ'সাম)
এ নামটির সঙ্গে হজরত আবদুল মুত্তালিবের স্বপ্নে জমজম কূপের অবস্থান নির্দেশের ঘটনাটি সম্পৃক্ত। স্বপ্নে তিনি কূপের অবস্থান জানতে চাইলে তাঁকে এমন একটি স্থানের নিদর্শন দেওয়া হয়, যেখানে পিঁপড়ার আনাগোনা রয়েছে এবং ‘গুরাবুন আ'সাম (غراب أعصم)’-এর উল্লেখ করা হয়।
আরবি ভাষায় ‘গুরাবুন আ'সাম’ বলতে এমন কাককে বোঝায়, যার শরীরের কোনো অংশ—বিশেষত পা, ডানা বা উদর—সাদা বর্ণের হয়। কোনো কোনো ভাষাবিদ এর অর্থ সাদা পেটবিশিষ্ট কাক বলেছেন, আবার অন্যদের মতে এর অর্থ সাদা পা বা সাদা চিহ্নযুক্ত কাক। আরবি অভিধানে ‘আ'সাম’ শব্দের আরও ব্যাখ্যা হিসেবে লাল ঠোঁট ও লাল পা-যুক্ত কাকের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ইমাম গাযযালী (রহিমাহুল্লাহ) ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন-এ উদ্ধৃত একটি হাদিসের আলোচনায় ‘গুরাবুন আ'সাম’ শব্দটির প্রসঙ্গ এনেছেন। সে হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুণ্যবতী ও উত্তম চরিত্রের নারীর বিরলতার উপমা দিতে ‘গুরাবুন আ'সাম’-এর উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, যেমন সাদা চিহ্নবিশিষ্ট কাক অত্যন্ত বিরল, তেমনি উত্তম চরিত্রের নারীও বিরল ও মহামূল্যবান।
কোনো কোনো ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় জমজম কূপের অবস্থান নির্দেশকারী নিদর্শনের সঙ্গে এই ‘গুরাবুন আ'সাম’-এর সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল: মাওলানা আব্দুর রহমান কাওসার মাদানী
অনুবাদ: শরিফ হাসানাত
এসএইচ/