আওয়ার ইসলাম ডেস্ক
স্বপ্নে প্রাপ্ত নির্দেশ অনুসারে আবদুল মুত্তালিব পরদিন সকালে তাঁর একমাত্র পুত্র হারিসকে সঙ্গে নিয়ে জমযম কূপ পুনঃখননের কাজ শুরু করেন। খননকাজের একপর্যায়ে জুরহুম গোত্রের নেতা মুযায কূপে লুকিয়ে রাখা দুটি স্বর্ণের হরিণ এবং কয়েকটি মূল্যবান তরবারি উদ্ধার হয়। এ সংবাদ মুহূর্তেই কুরাইশদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
কুরাইশের নেতারা এসে আবদুল মুত্তালিবকে বললেন, “এই কূপ আমাদের পূর্বপুরুষ হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের স্মৃতিবিজড়িত। আপনি যেমন তাঁর বংশধর, আমরাও তেমনি তাঁর বংশধর। অতএব, এ সম্পদের ওপর আমাদেরও অধিকার রয়েছে। কূপ পুনঃখননের কাজেও আমাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।”
বিরোধ এড়ানোর জন্য আবদুল মুত্তালিব তৎকালীন প্রচলিত রীতি অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে সম্পদ বণ্টনের প্রস্তাব দিলেন। তিনটি নামে তীর নিক্ষেপ করা হবে—কাবা শরিফ, কুরাইশ এবং আবদুল মুত্তালিব। যার নামে যে সম্পদ নির্ধারিত হবে, সেটি তারই প্রাপ্য বলে গণ্য হবে।
সবাই এ প্রস্তাবে সম্মত হলো। নির্ধারিত দিনে কাবা শরিফে উপস্থিত হয়ে তৎকালীন প্রচলিত নিয়মে হুবল মূর্তির সামনে তীর নিক্ষেপ করা হয়। কুরাইশদের নামে নিক্ষিপ্ত তীর কোনো সম্পদের ওপর পড়ল না। আবদুল মুত্তালিবের ভাগে এল স্বর্ণের তরবারিগুলো এবং কাবা শরিফের নামে নির্ধারিত হলো দুটি স্বর্ণের হরিণ।
আবদুল মুত্তালিব নিজের অংশে প্রাপ্ত স্বর্ণের তরবারি বিক্রি করে কাবা শরিফের দরজা সংস্কার করেন। আর স্বর্ণের হরিণ দুটি কাবা শরিফে অলংকার হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। এভাবেই উদ্ধার হওয়া সম্পদ নিয়ে বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি ঘটে।
কিন্তু জমজম কূপের কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ তখনও অব্যাহত ছিল। আবদুল মুত্তালিব উপলব্ধি করলেন, যদি গোত্রের সবাই সমান অংশীদার হয়, তবে জমজম কূপের তত্ত্বাবধান তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। অথচ হাজিদের সেবার স্বার্থে কূপটির সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি ছিল।
দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর উভয় পক্ষ তৃতীয় পক্ষের সালিশ মেনে নিতে সম্মত হয়। সিদ্ধান্ত হলো, বনু সা'দ হুযায়ম গোত্রের এক বিচক্ষণ নারী এ বিরোধের মীমাংসা করবেন। সে সময় তিনি সিরিয়ায় অবস্থান করছিলেন। তাই তাঁর কাছেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
নির্ধারিত দিনে আবদুল মুত্তালিব এবং বিরোধী পক্ষের প্রতিনিধিরা খাদ্য ও পানীয় সঙ্গে নিয়ে সিরিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। কিন্তু দীর্ঘ মরুপথে তাঁদের পানির মজুত শেষ হয়ে গেল। আবদুল মুত্তালিব বিপক্ষ দলের কাছে কিছু পানি চাইলে তারা তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের আশঙ্কা ছিল, নিজেদের পানিই তখন পর্যাপ্ত থাকবে না।
পানির অভাবে মৃত্যুর আশঙ্কা দেখা দিলে আবদুল মুত্তালিব তাঁর সঙ্গীদের প্রত্যেককে একটি করে গর্ত খনন করার নির্দেশ দেন। তাঁর ধারণা ছিল, আল্লাহ চাইলে কোনো একটি গর্ত থেকে পানির উৎস বের হতে পারে; আর তা না হলে অন্তত মৃত্যুর পর প্রত্যেকের জন্য একটি করে কবর প্রস্তুত থাকবে।
সঙ্গীরা নির্দেশমতো গর্ত খনন করলেও কোথাও পানির সন্ধান মিলল না। তখন আবদুল মুত্তালিব বললেন, “এভাবে বসে থেকে মৃত্যুর অপেক্ষা করার কোনো অর্থ নেই। সবাই নিজ নিজ বাহনে আরোহণ করো এবং চারদিকে পানির সন্ধান করো। শেষ চেষ্টা না করে হাল ছেড়ে দেওয়া আমাদের উচিত নয়।”
তিনি নিজের উটটিকে উঠানোর চেষ্টা করলেন। উটটি যেখানে বসে ছিল, সেখানে তার একটি পা বালুর গভীরে ঢুকে গিয়েছিল। উটটি উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেই স্থান থেকে প্রবল বেগে পানির ধারা ফেটে বেরিয়ে এল।
এ অলৌকিক দৃশ্য দেখে আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর সঙ্গীরা আনন্দে “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি উচ্চারণ করতে লাগলেন। সবাই তৃপ্তিসহকারে পানি পান করলেন এবং যাত্রাপথের জন্য নিজেদের মশক পানিতে পূর্ণ করে নিলেন।
এরপর আবদুল মুত্তালিব উদারতার পরিচয় দিয়ে বিরোধী পক্ষকেও সেই পানি থেকে পান করার আমন্ত্রণ জানালেন। অথচ কিছুক্ষণ আগেই তারাই এক ফোঁটা পানি দিতেও অস্বীকার করেছিল। তাঁর মহানুভবতায় তারা গভীরভাবে মুগ্ধ হলো। তারা পানি পান করল, নিজেদের পাত্রও পূর্ণ করে নিল এবং নিজেদের ভুল স্বীকার করে বলল,
“হে আবদুল মুত্তালিব! আমরা বুঝতে পেরেছি, জমজম কূপ পুনঃখননের জন্য আল্লাহ আপনাকেই নির্বাচন করেছেন। এ বিষয়ে আমাদের দাবি তোলা ঠিক হয়নি। আমরা আমাদের দাবি প্রত্যাহার করছি। এখন আর সালিশের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। চলুন, আমরা মক্কায় ফিরে যাই।”
এভাবেই বিরোধের অবসান ঘটে। আবদুল মুত্তালিব মক্কায় ফিরে এসে তাঁর পুত্র হারিসকে সঙ্গে নিয়ে জমজম কূপের পুনঃখনন সম্পন্ন করেন। পুনরায় কূপ থেকে পানির ধারা প্রবাহিত হলে হাজিদের পানির সংকট দূর হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা এভাবেই তাঁর দুশ্চিন্তা দূর করেন এবং তাঁকে জমজম কূপের সেবার মহান দায়িত্ব পালনের তাওফিক দান করেন। পরবর্তীকালে আল্লাহ তাঁর মানত পূরণের ব্যবস্থাও করেন এবং তাঁকে একে একে দশজন পুত্রসন্তান দান করেন।
মূল: মাওলানা আব্দুর রহমান কাওসার মাদানী
অনুবাদ: শরিফ হাসানাত
এসএইচ/