বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬ ।। ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ২৩ সফর ১৪৪৮

শিরোনাম :
হজ নিয়ে বিনামূল্যে আল ওয়াসির জুম মিট-আপ ১৫ আগস্ট ফাস্ট ফুডের নেতিবাচক প্রভাব দাম্পত্য জীবনেও পড়তে পারে: মাওলানা তারিক জামিল ৩০০ টাকায় ওমরাহ! গ্যাস-বিদ্যুৎসহ জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকার ব্যর্থ: খেলাফত মজলিস পশ্চিমবঙ্গে ১২৭৯টি মসজিদ থেকে মাইক ও লাউড স্পিকার অপসারণ ১৫ আগস্টের জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলন সফল করতে সাভারে মতবিনিময় সভা নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির নির্দেশনা জমিয়তের যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ভাণ্ডার নিয়ে তথ্য ফাঁস, ক্ষুব্ধ ট্রাম্পের কড়া বার্তা আধুনিকতার নামে আমরা কী হারাচ্ছি? ক্যাম্পাসে সব ছাত্রসংগঠনের কর্মসূচি স্থগিতের আহ্বান জবি ছাত্রদলের

আধুনিকতার নামে আমরা কী হারাচ্ছি?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

|| শরিফ হাসানাত ||  

আধুনিকতা মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করেছে—এ কথা অস্বীকার করার জো নেই। আজ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা যায়। চিকিৎসা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এসেছে অভাবনীয় উন্নতি। ইসলামও জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণা ও মুফিদ তথ্য প্রযুক্তির বিরোধিতা করে না। আল্লাহ তাআলা মানুষকে পৃথিবী অন্বেষণ, চিন্তা ও জ্ঞান অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন।

মানুষের হাতে হাতে এখন স্মার্টফোন আছে, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে খুশগল্প করার সময় নেই। হাজারো অনলাইন বন্ধু আছে, অথচ মনের কথা বলার মতো একজন বিশ্বস্ত মানুষও অনেকের নেই। বিশাল অট্টালিকা-ভবন নির্মাণ হচ্ছে, কেমন জানি ছোট হয়ে যাচ্ছে পরিবারিক বন্ধন। সন্তান একই ঘরে থেকেও বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে অনলাইন বা গেম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এ কথা সত্য, আধুনিকতা আমাদের সংযুক্ত করেছে, কিন্তু সবসময় কাছাকাছি আনতে পারেনি।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কে স্থাপনে। কর্মব্যস্ততা, বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জালে অনেকের জীবনে নামাজের সময় সংকুচিত হয়ে এসেছে। কুরআন তিলাওয়াতের বদলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিংয়ে। অতৃপ্ত হৃদয় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষের প্রশংসা কুড়ানোতে, অথচ আল্লাহর রেজামন্দি অর্জনের চিন্তা অনেকের জীবন থেকে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন,“জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮)

মানুষ আগের চেয়ে এগিয়ে আরাম-আয়েশে আসক্ত। মানসিক শান্তির খোঁজে ভীষণ অস্থির। এসব আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—শুধু বাহ্যিক উন্নতিই কি প্রকৃত উন্নতি?

আধুনিকতার আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যবোধের পরিবর্তন। অনেক ক্ষেত্রে ভদ্রতার চেয়ে জনপ্রিয়তা, চরিত্রের চেয়ে চেহারা, সততার চেয়ে সাফল্য এবং নীতির চেয়ে সুবিধাবাদকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একজন মানুষ কতটা সৎ—তার চেয়ে কতজন তাকে অনুসরণ করছে, সেটাই যেন বড় হয়ে উঠেছে।

পরিবার থেকেও দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে ইসলামী ও ইলমী পরিবেশ। একসময় সন্ধ্যা নামলেই একসঙ্গে বসা, গল্প ও পারিবারিক আলোচনা হতো নিত্য। আর এখন অনেক পরিবারে একই ছাদের নিচে বসবাস করেও নিজ নিজ মোবাইলে ব্যস্ত। ফলে কেবল সম্পর্ক নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মূল্যবোধের যে শিক্ষা প্রবাহিত হতো, সেটিও নিদারুন দুর্বল হয়ে পড়ছে।  

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং অবিশ্বাসীর জন্য জান্নাত।” (সহিহ মুসলিম)

এই হাদিসে দুনিয়ার সব উপভোগ ত্যাগ করতে বলেনি।  একজন মুমিন তার প্রবৃত্তিকে আল্লাহর বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। আধুনিকতার নামে যদি আমরা সীমাহীন ভোগবাদকে সাদরে গ্রহণ করি, তবে জীবনের আসল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

তবে আধুনিকতা মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ নয়; ক্ষতি হলো এমন জীবনধারা, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের ওপর কর্তৃত্ব ফলায়, মানুষ প্রযুক্তির ওপর নয়। একজন মুসলমানের হাতে স্মার্টফোন দাওয়াতের মাধ্যমও হতে পারে, আবার গুনাহের দ্বারও হতে পারে। ইন্টারনেট জ্ঞান অর্জনের পথও হতে পারে, আবার বিভ্রান্তিরও কারণ হতে পারে। তাই সমস্যার মূল প্রযুক্তি নয়; এর ব্যবহার।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,“দুনিয়ায় তোমার প্রাপ্য অংশ ভুলে যেয়ো না।”(সূরা আল-কাসাস, ২৮:৭৭)

একই আয়াতে আখিরাতকে প্রাধাণ্য দেওয়ারও নির্দেশ রয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম এমন এক ভারসাম্যের ধর্ম, যেখানে ইহকালের উন্নতি ও পরকালের প্রস্তুতি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক।

আমাদের এমন এক আধুনিকতা প্রয়োজন, যা কেড়ে নেবে না চরিত্রের মাধুর্য; এমন এক প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা, যা ভেঙে দেবে না পারিবারিক বন্ধন; এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা মানুষকে সরিয়ে দেবে না আল্লাহর প্রেমের নূর থেকে। কারণ সভ্যতা যেমন গড়ে ওঠে উঁচু দালানের জৌলুসে, তেমনি উঁচু চরিত্রের মাধুর্যেই। প্রকৃত আধুনিকতা হলো এমন জীবন, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি ঈমান, নীতি-নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন ও উত্তম মানবিকতাও সমানভাবে বিকশিত হয়।

আমরা কতটা আধুনিক হয়েছি সে প্রশ্ন দূরে থাক। আধুনিক হতে গিয়ে আমরা কতটা মানুষ, কতটা মুমিন এবং কতটা নৈতিক থাকতে পেরেছি। এই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। মহান আল্লাহ আমাদের জীবনকে ঈমানী নূরে আলোকিত করুক, নববী আদর্শে জীবন গড়ার তাওফিক দান করুক। আমীন।

লেখক: আলেম ও কবি 

এসএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ