কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অভাবনীয় ব্যবহারে চীনের শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করেছে। বিভিন্ন খাতে এআই এবং রোবটের ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কর্মী চাকরি হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কায় গভীর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন দেশটির বহু পেশাজীবী।
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের কম্পিউটার প্রোগ্রামার ফেই ঝাওজুনের ঘটনাটি এর একটি বাস্তব উদাহরণ। তার নিয়োগকর্তা সম্প্রতি জানতে চেয়েছিলেন, এআই শিগগিরই মানুষের বদলে কোডিংয়ের কাজ করতে পারবে কি না। এর মাত্র দুই সপ্তাহ পর ফেইসহ প্রায় ১৬০ জন কর্মী চাকরি হারান। বর্তমানে শুধু কম্পিউটার প্রোগ্রামিং নয়, বরং স্ক্রিপ্ট লেখা, অনুবাদ, গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন শারীরিক শ্রমেও এআই ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার লাগাতার বাড়ছে। ফলে এসব পেশায় যুক্ত কর্মীদের চাকরি ও আয় নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমনকি খাবার সরবরাহের মতো কাজেও রোবট ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় লাখ লাখ ডেলিভারি কর্মীর জীবিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে চীনা সরকার ‘এআই প্লাস’ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও বিস্তার তরান্বিত করতে নানাভাবে উৎসাহ দিচ্ছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশটির মূল পরিকল্পনাতেও বিভিন্ন শিল্প কারখানায় এআই ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। মূলত প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকহারে বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ সতর্ক করে বলেছেন, এআই সামগ্রিকভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও দেশের কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব কাজ নির্দিষ্ট ও প্রথাগত দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেসব পেশায় কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে চীনে সামগ্রিক নগর বেকারত্বের হার প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি হলেও ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ সমাজের মধ্যে বেকারত্বের হার এর প্রায় তিন গুণ। এমতাবস্থায় এআইয়ের এই দ্রুত বিস্তার তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এআই ও রোবটের ব্যাপক ব্যবহার চীনের অর্থনীতির জন্য কিছু ইতিবাচক সুফলও বয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে এবং কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমছে। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে শ্রমিকের তীব্র ঘাটতি পূরণে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও রোবট বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। তাছাড়া চীনের অনেক কর্মীও এআইকে শুধু হুমকিস্বরূপ দেখছেন না; বরং অনেকেই চাকরি হারানোর পর এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন কোনো ব্যবসা বা স্বাধীনভাবে বিকল্প আয়ের পথ তৈরির চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, এআই মানুষের বিকল্প হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন ধাঁচের কাজের সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে।
টিএইচএ/