মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬ ।। ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ২২ মহর্‌রম ১৪৪৮


পান্তাভাতের সেই থালায় লুকিয়ে ছিল এক বিশাল হৃদয়


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহীত

|| শায়খ আহমাদুল্লাহ ||

মাদরাসা জীবনের এক লজিংবাড়িতে পেঁয়াজ-মরিচ আর পান্তাভাত ছিল আমার নিয়মিত খাবার।

আজ চারিদিকে যখন বৈষয়িকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা আর স্বার্থপরতার মন খারাপ করা নানান গল্প শুনি, তখন শৈশবের সেই স্মৃতিটা বারবার মনে পড়ে যায়।

স্মৃতিটি একই সাথে করুণ আবার মধুরও।

আমার বয়স তখন এগারো-বারো। ওই অল্প বয়সে নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার দোয়ালিয়া গ্রামের একটি মাদরাসায় ভর্তি হয়েছি। কিতাব বিভাগের একেবারে প্রথম দিকের ক্লাসে পড়ি।

সে সময় গ্রামাঞ্চলে ছাত্রদের লজিং রাখার চল ছিল। তখন আমিও একটা বাড়িতে লজিং থাকা শুরু করি।

মাদরাসার খাবারের খরচ জোগানোর সামর্থ্য আমার বাবার ছিল। কিন্তু বোর্ডিংয়ের খাবারের তুলনায় লজিং বাড়ির খাবার কিছুটা ভালো হওয়ায় আমার এই লজিং থাকার সিদ্ধান্ত।

সেকালে যারা ছাত্রদেরকে লজিং রাখতেন, তারা যে খুব অবস্থাপন্ন ছিলেন, তা কিন্তু নয়। বরং বাবা-মার আদর ফেলে দূর থেকে পড়তে আসা একটা নাবালেগ ছেলের খাবারের দায়িত্ব নেয়াকে তারা নিজেদের কর্তব্য মনে করতেন। কাজটাকে তারা ভালোও বাসতেন।

লজিংয়ে পালাক্রমে কয়েকটি পরিবার থেকে আমার খাবারের ব্যবস্থা হতো। একটি পরিবারের কথা স্মরণ হলে এখনো আমার মন খারাপ হয়।

পরিবারটি ছিল অত্যন্ত গরিব। বাঁশের বেড়া দেয়া একচালা টিনের ঘর ছিল তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই। একটু জোরে বাতাস হলেই পুরো ঘর নড়বড় করত।

দিনের বেলা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢুকত সূর্যের আলো। এমন বহুবার হয়েছে, আমি ঘরের মেঝেয় বসে ভাত খাচ্ছি আর আমার মুখের ওপর এসে পড়েছে রোদের কিরণ।

ঘরের আসবাবপত্র বলতে ছিল বাঁশের খুঁটির ওপর কাঠের পাটাতন দেয়া চৌকি। ঘরের কোনায় কাঠের তাকের ওপর রাখা হতো থালা-বাসন, রশির সাথে ঝুলত কাপড়-চোপড়।

এই পরিবারটির কাছে যখন আমার খাবারের পালা আসত, পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে পান্তাভাতের থালা সাজিয়ে দিত। আর সাথে থাকত বাড়ির পোষা মুরগির ডিম ভাজি। হলুদ রঙের ডিম ভাজিটি সাদা পান্তার পটভূমিকায় প্লেট জুড়ে ফুলের মতো ফুটে থাকত।

তখন না বুঝলেও এখন বুঝি, এই ডিম গরিব সেই পরিবারটির আয়ের অন্যতম উৎস ছিল।

আজ হতে বহু বছর আগে অচেনা এক মাদরাসা-বালকের জন্য হতদরিদ্র পরিবারটি যে দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন, ভাবলে এখন হৃদয় বিগলিত হয়।

এই পরিণত বয়সে এসে এখন উপলব্ধি করতে পারি, গরিব হলেও তাদের হৃদয়টা ছিল বড়। সেই বড় হৃদয় তাদেরকে অমন দুঃসাহসী হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল।

আজ আমরা, গ্রাম বলুন কিংবা শহর, অর্থনৈতিকভাবে ওই পরিবারটির চেয়ে বহুগুণ ভালো আছি। কিন্তু তারপরও অচেনা শিক্ষার্থীর দু বেলা খাবারের দায়িত্ব নেয়া দূরে থাক, আত্মীয়-স্বজন আসলেই বেশিরভাগ মানুষ আমরা বিরক্ত হই। আত্মীয় বিদায় নিলে স্বস্তিবোধ করি।

কেন এমন হলো?

কারণ, সময়ের পালাবদলে আজ আমাদের অর্থের বৈভব বেড়েছে, কিন্তু হৃদয়টা সেভাবে বড় হয়নি।

ফলে এই সংকীর্ণ হৃদয়ে পরার্থপরতা ও ত্যাগের মতো মহৎ গুণের আর জায়গা হয় না। আর একারণে বিত্তবান হওয়া সত্ত্বেও আত্মিকভাবে আমরা সুখী হয়ে উঠতে পারছি না।

নবীজি (সা.) ঠিকই বলেছেন, ধন-সম্পদ বেশি থাকাই প্রকৃত ধনাঢ্যতা নয়; বরং প্রকৃত ধনাঢ্যতা হলো আত্মার ধনাঢ্যতা।

তাই আসুন, প্রকৃত সুখী মানুষ হওয়ার জন্য অল্পে তুষ্ট থাকি, আত্মাকে বড় বানাই, ভোগ নয় ত্যাগের সাধনায় নিজেকে ব্যাপৃত রাখি।

লেখক: চেয়ারম্যান, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন

আওয়ার ইসলাম/জেডএম


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ