শনিবার, ২০ জুন ২০২৬ ।। ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ৫ মহর্‌রম ১৪৪৮

শিরোনাম :
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ব্যর্থ করে দিতে পারে ইসরায়েল: মার্কিন গোয়েন্দাসংস্থা। বিশ্ব শরণার্থী দিবসে বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতের আহ্বান গাজীপুরে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের তৃণমূল প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত বিকেএম মিডিয়া সেলের আয়োজনে ওরিয়েন্টেশন কর্মশালা ইঞ্জিন বিকল হয়ে ফেনীতে আড়াই ঘণ্টা আটকা মেঘনা এক্সপ্রেস মোহাম্মদপুরের অপরাধীদের নির্মূল করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কৃষিকাজ: জীবিকার পাশাপাশি ইবাদত বড় ছেলে হত্যার ঘটনায় ছোট ছেলের নামে বাবার মামলা হাতিরঝিলের নিরাপত্তায় আনসার মোতায়েন করা হবে: মীর শাহে আলম পরিত্যক্ত কূপ থেকে ছাগল তুলতে নেমে ৪ জনের মৃত্যু

কৃষিকাজ: জীবিকার পাশাপাশি ইবাদত


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মিনহাজ উদ্দিন আত্তার ||

মানুষ যতই আধুনিকতার শিখরে পৌঁছাক, প্রযুক্তির বিস্ময় যতই বিস্তৃত হোক—তার অস্তিত্বের ভিত্তি এখনো সেই মাটি। আকাশচুম্বী নগর, শিল্পকারখানা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ—সবকিছুর পেছনে নীরবে কাজ করে এক মুঠো উর্বর ভূমি। কারণ মাটিতে ফসল না জন্মালে, সভ্যতার সব অর্জন একসময় অর্থহীন হয়ে পড়ে।

ইসলাম তাই কৃষিকে কেবল একটি পেশা হিসেবে নয়, বরং এক মহান নিয়ামত এবং মানবজীবনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

“তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর তা দ্বারা তোমাদের জন্য পানীয় এবং বৃক্ষরাজি উৎপন্ন করেন…” (সূরা আন-নাহল: ১০–১১)

অন্যত্র বলা হয়েছে—“আর তাদের জন্য নিদর্শন হলো মৃত ভূমি, যাকে আমি জীবিত করি এবং তা থেকে শস্য উৎপন্ন করি…” (সূরা ইয়াসিন: ৩৩–৩৫)

এই আয়াতগুলো কৃষিকে শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং আল্লাহর কুদরতের এক জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করে।

একজন কৃষক তাই নিছক উৎপাদনকারী নন; তিনি মানবসভ্যতার খাদ্যনিরাপত্তার নীরব প্রহরী। তাঁর বীজ বপনের মধ্যেই ভবিষ্যতের জীবন লুকিয়ে থাকে। এই শ্রমকে ইসলাম আখিরাতের সওয়াবের সাথেও যুক্ত করেছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—“যে ব্যক্তি কোনো গাছ রোপণ করে বা ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা প্রাণী আহার করে—তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।” (সহিহ মুসলিম: ১৫৫৩)

অর্থাৎ কৃষকের শ্রম তার নিজের সীমা ছাড়িয়ে মানুষের উপকারে প্রবাহিত হয় এবং আল্লাহর কাছে তা সদকার মর্যাদা লাভ করে।

তবে কৃষিকাজ শুধু উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংরক্ষণ ও সুরক্ষার দায়িত্বও।

ক্ষেত-খামার, গবাদিপশু কিংবা শস্যভাণ্ডার রক্ষার প্রয়োজনীয়তা বাস্তব জীবনে বহু সময় অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে কুকুর পালনের বিষয়টি ইসলামে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়ে এসেছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—“যে ব্যক্তি কুকুর পোষে, প্রতিদিন তার আমল থেকে এক কিরাত কমে যায়; তবে শিকার, গবাদিপশু বা ক্ষেত পাহারার জন্য রাখা কুকুর এর ব্যতিক্রম।” (সহিহ বুখারি: ২৩২২)

অন্য বর্ণনায় এসেছে— “শিকার, পশুপালন কিংবা কৃষিকাজের প্রয়োজন ছাড়া কুকুর পালন করলে প্রতিদিন দুই কিরাত সওয়াব কমে যায়।” (সহিহ মুসলিম: ১৫৭৫)

এই হাদিসগুলো ইসলামের গভীর বাস্তববোধকে তুলে ধরে।

একদিকে অপ্রয়োজনীয় শৌখিনতা ও অতিরিক্ত আসক্তিকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, অন্যদিকে মানুষের জীবিকার বাস্তব প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ কৃষিকাজ, পশুপালন কিংবা ক্ষেত পাহারার প্রয়োজনে কুকুর পালন ইসলামে বৈধতার আওতায় পড়ে। তবে এই বৈধতা শর্তহীন নয়; প্রয়োজন যেখানে শেষ, অনুমতির সীমাও সেখানে শেষ—এটাই ইসলামের নৈতিক ভারসাম্য।

আজকের বাস্তবতায় কৃষিজমি সংকুচিত হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তীব্র হচ্ছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমন সময়ে কৃষিকে অবহেলা করা মানে ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেওয়া। কারণ খাদ্য ছাড়া উন্নয়ন টেকে না, আর কৃষক ছাড়া খাদ্যের ধারাও অব্যাহত থাকে না।

এই বাস্তবতা শুধু অর্থনীতির নয়, এটি মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন। যে সমাজ মাটিকে ভুলে যায়, সে সমাজ ধীরে ধীরে নিজের শিকড় হারায়। আবার যে সমাজ কৃষকের ঘামকে মূল্য দেয়, সেই সমাজই টিকে থাকে দীর্ঘ সময়, স্থিতিশীলভাবে।

শেষ পর্যন্ত জীবন যতই শহরমুখী হোক, মানুষের টিকে থাকা নির্ভর করে সেই পুরোনো সত্যের ওপর—মাটির সঙ্গে সম্পর্ক। এই সম্পর্কই নীরবে গড়ে তোলে সভ্যতার ভিত্তি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে নিয়ে যায় জীবনের ধারাবাহিকতা।

লেখক : আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ