অবশেষে জল্পনাই সত্যি হলো। জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য থেকে সরে এলো পীর সাহেব চরমোনাইয়ের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান জানান, তারা আর জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যে থাকছেন না। তাদের প্রার্থীরা ২৬৮টি আসনে এককভাবে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন। বাকি ৩২টি আসনে তারা সমমনা কোনো দল বা প্রার্থীকে সমর্থন দেবেন।
জামায়াত জোট থেকে হঠাৎ কেন তারা বেরিয়ে এলেন এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন মাওলানা গাজী আতাউর রহমান। তিনি জানান, তাদের প্রতি ইনসাফ করা হয়নি এবং রীতিমতো অপমান করা হয়েছে। তাছাড়া শরিয়া প্রশ্নে জামায়াতের ছাড়, বিএনপির সঙ্গে দলটির জাতীয় সরকারে অংশগ্রহণের ঘোষণাসহ নানা কারণে শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।
জামায়াতের আমির ইসলামী আন্দোলনের আমিরকে ‘ইনসাল্ট’ করেছেন দাবি করে গাজী আতাউর রহমান বলেন, আসন এখানে কম বেশি হতেই পারে, তবে এখানে আমাদের আত্মসম্মান বোধে লেগেছে। এটাও একটু বলা প্রয়োজন, আসন সমঝোতায় সর্বপ্রথম আলোচনা শুরু হয়েছে দুই আমিরের মধ্যে। ডিসেম্বর ৯ তারিখ আমিরে জামায়াত এবং আমাদের আমির পীর সাহেব চরমোনাই দুইজন একান্তে বসেছিলেন। প্রথম দিনেই তিনি ইনসাল্ট করেছেন। আপনারা জানেন, সেদিন প্রথম আলোতে একটা জরিপ প্রকাশ হয়েছিল, সেই জরিপ আপনারা দেখেছেন। সেই জরিপে প্রকাশ হয়েছিল যে, বিএনপিকে চায় ৬৫ শতাংশ মানুষ, জামায়াতে ইসলামীকে চায় ২৫ শতাংশ মানুষ। আর সেখানে ইসলামী আন্দোলনেরও ছিল একটা, সেটা হলো ০.১ শতাংশ মানুষ। ওইদিন বসার পরে আলোচনার শুরুতেই জামায়াত আমির আমাদের আমিরকে বললেন, এই যে প্রথম আলোতে একটা জরিপ এসেছে, দেখেন। তাইলে এটার অর্থ কী? এটার অর্থ হলো তাকে ইনসাল্ট করা যে, আপনাদের তো কোনো পয়েন্টই নেই। মানে জনমতে আপনাদের কোনো অবস্থান নেই। কোনো শতাংশও নেই। সেদিনই আমির আমাদের বলেছেন যে, তাদের কিন্তু মতলব ভালো নয়।
কেন এককভাবে পথচলা এর ব্যাখ্যা দিয়ে মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, আমরা এ দেশের ইসলামপন্থী জনতার আবেগের সঙ্গে কিছুতেই প্রতারণা করতে পারি না। আমরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য, ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য, ইসলামের আলোকে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিন ধরে এখানে কাজ করে আসছি। আমরা এ থেকে বিচ্যুত হতে পারি না। এজন্য আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে, গতকালকে ১১ দলীয় জোটের ব্যানারে যেখানে আমরাও ছিলাম, সেখানে একটি সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। সেখানে আসন বণ্টন হয়েছে। সেখানে আমাদের দীর্ঘদিনের পথচলা, ৫ আগস্ট পরবর্তী সারাদেশে আমরা ইসলামপন্থী শক্তি একসঙ্গে করার জন্য যে চেষ্টা-সাধনা করেছিলাম; আমরা দেখেছি শেষ পর্যায়ে এসে আমাদের যে লক্ষ্য ছিল, সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই শঙ্কা থেকে আমরা চিন্তা করলাম, আমাদের ইসলামের পক্ষের একটি বাক্সকে আমাদের হেফাজত করতে হবে।
ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আমরা জানি সামনে আমাদের পথচলা হয়ত মসৃণ নাও হতে পারে। কারণ আমরা ক্ষমতার রাজনীতি সেভাবে করি না। আমাদের মূল লক্ষ্য ইসলাম। ইসলামকে আমরা আগে রাখি। আমরা নীতি-আদর্শের রাজনীতি করি। সেখানে আমরা দেখছি, নীতি-আদর্শের প্রশ্নে, রাজনৈতিক প্রশ্নে, ইনসাফের প্রশ্নে আমরা বৈরিতার শিকার হয়েছি। সেজন্য আমরা আজ আপনাদের সামনে ঘোষণা দিতে বাধ্য হচ্ছি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৭০টি আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে। এর মধ্যে আপিলে দুজনের বাতিল হয়েছে। বাকি ২৬৮ জন সংসদ সদস্য প্রার্থী এখন পর্যন্ত মাঠে কাজ করছেন। আমরা তাদের নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছি, তারা নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। একজনও তারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন না।
জামায়াত জোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে জামায়াতে ইসলামী একটি বড় শক্তি ছিল। অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাদের শক্তি-সামর্থ্য অনেক বেশি। কিন্তু আমরা আদর্শিকভাবে, নৈতিকভাবে কারও চেয়ে দুর্বল নই।
ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। তিনি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, সেই খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একজন সম্মানিত নারী, তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আমরা আশ্বস্ত হয়েছি, জামায়াতের আমির শরিয়া প্রতিষ্ঠা, শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করবেন না। এই ওয়াদা তিনি করেছেন। এজন্য আমরা আশ্বস্ত হয়েছি। এই বিষয়টা যখন আমরা জানতে পারলাম তখন আমরা স্পষ্ট হয়ে গেলাম, আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে চলছি সেই লক্ষ্য অর্জিত হবে না। কারণ, আজ যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার মতো একটা পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এখন যারা প্রধান শক্তি তারাই যদি ইসলামের সমান আদর্শ থেকে ভিন্ন দিকে চলে যায়, যদি ইসলামি আইনের প্রতি তাদের আস্থা না থাকে… তাহলে আমরা যে কর্মী, সমর্থক সারা দেশে ইসলামের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। এই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
আরএইচ/