আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। কিছু জায়গা দু'একটা তারা দেখা যাচ্ছে। মেঘের মাঝেমাঝে চাঁদটা একটু উঁকি দিয়ে আবার ডুবে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বসেছে দাদার গল্পের আসর।
দাদা নাতি-নাতনিদের ডেকে বললেন, এসো দাদুভাইয়েরা, আজ তোমাদের এমন একটি গল্প শোনাব, যা শুধু ইসলামের ইতিহাসেই নয়, পুরো মানবজাতির ইতিহাসেও এক মহামূল্যবান অধ্যায়।
দাদার ডাকে নাতি-নাতনিরা একটু নড়েচড়ে জড়ো হয়ে বসল। দাদা গল্প বলতে শুরু করলেন-
হিজরি দশম বছর। একদিন খবর ছড়িয়ে পড়ল—রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হজ পালন করবেন। এ খবর শুনে আরবের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ দলে দলে মদিনায় আসতে লাগল। সবার একটাই ইচ্ছা— প্রিয় নবীর সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে পবিত্র সফরে অংশ নেওয়া।
অবশেষে সেই কাফেলা রওনা হলো। চারদিকে শুধু ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনি। পাহাড়, মরুভূমি আর উপত্যকা যেন সেই ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠল। এক লক্ষেরও বেশি সাহাবি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে ছিলেন। কেউ তখনও জানতেন না, এটাই হবে তাঁর জীবনের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ এবং শেষ হজ।
"দাদু একটু থেমে বললেন, ভাবতে পারো, যত দূর চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ! আরাফার বিশাল ময়দানে সবাই একত্রিত হলেন। কেউ ধনী, কেউ গরিব; কেউ আরব, কেউ দূরদেশের মানুষ। কিন্তু সেদিন সবার পোশাক ছিল প্রায় একই— সাদা ইহরাম। যেন সবাই আল্লাহর সামনে সমান।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উটের পিঠে বসে মানুষের উদ্দেশে ভাষণ দিতে শুরু করলেন। সবাই গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। কেউ একটি কথাও হারিয়ে ফেলতে চাইছিলেন না। কারণ, সবাই অনুভব করছিলেন- এই কথাগুলো শুধু সেই দিনের জন্য নয়— আগামী সব যুগের মানুষের জন্য।
"রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'তোমাদের জীবন, সম্পদ ও সম্মান একে অপরের জন্য পবিত্র।'
দাদু বললেন, এর মানে কী জানো? কাউকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া যাবে না। কারও সম্পদ জোর করে নেওয়া যাবে না। কারও সম্মান নষ্ট করা যাবে না। নবীজি সবাইকে সতর্ক করে বললেন— 'অন্যায়, জুলুম আর অত্যাচারের কোনো স্থান ইসলামে নেই। একজন মানুষের মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক মূল্যবান।'
এরপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন একটি ঘোষণা দিলেন, যা শুনে সবাই বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, 'আজ থেকে সব ধরনের সুদের প্রথা বাতিল।'
দাদু বললেন, সেই সময় সুদের কারণে কত মানুষ নিঃস্ব হয়ে যেত! ধনীরা আরও ধনী হতো, আর গরিবরা আরও কষ্টে পড়ত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাইলেন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষ একে অপরকে শোষণ করবে না; বরং ন্যায় ও দয়ার সঙ্গে জীবনযাপন করবে।
"তারপর তিনি পরিবারের কথা বললেন। তিনি পুরুষদের উপদেশ দিলেন, 'নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে। কারণ, তারা আল্লাহর অর্পিত আমানত।'
দাদু বললেন, সেই যুগে অনেক সমাজে নারীরা অবহেলিত ছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের সম্মান, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিলেন। তিনি শিখিয়েছিলেন, একটি সুন্দর সমাজ গড়তে হলে নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার রক্ষা করতে হবে।
এরপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন একটি কথা বললেন, যা মানুষের সব অহংকার ভেঙে দিল। তিনি বললেন, 'কোনো আরবের ওপর অনারবের, আর কোনো অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো সাদার ওপর কালোর কিংবা কালোর ওপর সাদারও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া।'
দাদু মুচকি হেসে বললেন, বুঝলে? মানুষের পরিচয় তার জাতি, ভাষা বা গায়ের রঙে নয়। মানুষকে মহান বানায় তার চরিত্র, আল্লাহভীতি এবং সৎকর্ম।
"ভাষণের শেষদিকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি— আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ। এগুলো আঁকড়ে ধরলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।'
দাদু বললেন, এই কথাগুলো ছিল যেন পুরো উম্মতের জন্য একটি দিকনির্দেশনা। জীবনের প্রতিটি সমস্যায় কুরআন ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ মানুষকে সঠিক পথ দেখাবে।
"দাদু গল্প শেষ করে বললেন, দাদুভাইয়েরা, বিদায় হজের সেই ভাষণ শুধু মুসলমানদের জন্য নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহাসনদ। এখানে আছে ন্যায়বিচার, সমতা, ভ্রাতৃত্ব, দয়া, মানবিকতা এবং পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা। আজও যদি মানুষ এই শিক্ষাগুলো হৃদয়ে ধারণ করে, তাহলে পৃথিবীত থেকে অন্যায়, হিংসা আর বৈষম্য দূর হয়ে যাবে। এজন্য আমরা যেন সব সময় মনে রাখি— মানুষকে ভালোবাসা, অন্যায় থেকে দূরে থাকা, সবার অধিকার রক্ষা করা এবং আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করাই একজন সত্যিকারের মুমিনের পথ। এটিই হলো আজকের গল্পের শিক্ষা।
দাদার গল্প শেষ না হতেই দমকা হাওয়া এসে পড়ল। নাতি-নাতনিরা যার যার ঘরের দিকে দৌড় দিল। দাদা হাঁক ছেড়ে বললেন, আগামীকাল কিন্তু নবী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ গল্প। যথাসময়ে তোমরা উপস্থিত হয়ে যেও।
গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ২৭)
লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী
চলবে....
আইও/