আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নতুন প্রজন্মের ঈমান ও আকিদা রক্ষা করা আলেম-উলামা ও মসজিদের ইমামদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শারীরিক অসুস্থতা মানুষের দুনিয়ার জীবনকে বিপন্ন করে, আর চিন্তা ও বিশ্বাসের অসুস্থতা ধ্বংস করে তার পরকালীন জীবন। তাই সমাজের মানুষকে সমকালীন বিভ্রান্তি ও ভ্রান্ত মতবাদ থেকে রক্ষা করতে আলেমদের নিয়মিত দাওয়াতি ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে।
ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুরে জামিয়া মাহমুদিয়া আশরাফুল উলুমে খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ পরিষদ কানপুর আয়োজিত দুই দিনব্যাপী বার্ষিক প্রশিক্ষণ শিবিরের সমাপনী অধিবেশনে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস মুফতি আবুল কাসেম নোমানি।
মাওলানা আমিনুল হক আবদুল্লাহ কাসেমির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে মুফতি আবুল কাসেম নোমানি বলেন, সত্য সব সময় এক থাকে, কিন্তু অসত্য প্রতিটি যুগে নতুন নতুন রূপে সামনে আসে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে নানা ধরনের চিন্তাগত বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। কাদিয়ানিবাদ, শাকিলিবাদ ও গওহর শাহিবাদের মতো নবুওয়ত ও মাহদিবাদের মিথ্যা দাবিদারদের ফিতনাও এর অন্তর্ভুক্ত।
তিনি বলেন, সাধারণ মুসলমানদের বড় একটি অংশ, বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও কলকারখানায় কর্মরত তরুণেরা মৌলিক ইসলামি আকিদা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকা এবং স্থানীয় আলেমদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতির কারণে এসব বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মসজিদের ইমাম ও মাদরাসার দায়িত্বশীলদের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জুমার নামাজের আগে সময়টুকু আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাওহিদ, রিসালাত, খতমে নবুওয়ত, সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও কিয়ামতের আলামতের মতো মৌলিক আকিদা শিক্ষায় কাজে লাগাতে হবে। মাদরাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য সাপ্তাহিক বা মাসিক প্রশিক্ষণমূলক আলোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। মক্তবে শিশুদের মৌলিক আকিদা শেখানোর পাশাপাশি ঘরে নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ঈমান-আকিদা রক্ষায় পরিবারকেও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে।
মাদরাসা আশরাফুল মাদারিস হারদইয়ের শায়খুল হাদিস মাওলানা শাহ আফজালুর রহমান কাসেমি বলেন, ভ্রান্ত চিন্তাধারার মোকাবিলায় আলেমদের গভীর জ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর বক্তব্য উপস্থাপনের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। এ জন্য ইসলামের প্রাজ্ঞ মনীষীদের গবেষণাধর্মী রচনাবলি গভীরভাবে অধ্যয়ন করা জরুরি।
দাওয়াতি কাজের কৌশল তুলে ধরে তিনি বলেন, বিভ্রান্ত ও অর্থের বিনিময়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো ব্যক্তিদের একভাবে দেখা যাবে না। অজ্ঞতা কিংবা ভুল বোঝাবুঝির কারণে যেসব তরুণ ভ্রান্ত চিন্তার শিকার হয়েছে, তাদের অবহেলা না করে ভালোবাসা, উন্নত আচরণ ও প্রজ্ঞার সঙ্গে কাছে টানতে হবে। তাদের সংশয় ও প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিতে হবে। মাওলানা সিদ্দিক আহমদ বান্দভি রহ.সহ পূর্বসূরি মনীষীদের ত্যাগ ও অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, কোনো ভ্রান্ত মতবাদের বিস্তারের অপেক্ষায় না থেকে আগে থেকেই ইসলামের সঠিক আকিদা তুলে ধরা ও প্রচারের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে পরিষদের কানপুর শাখার সভাপতি মাওলানা আমিনুল হক আবদুল্লাহ কাসেমি বলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে নির্বাচিত আলেমদের প্রশিক্ষণ শিবিরে আমন্ত্রণ জানানোর উদ্দেশ্য হলো, তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় আকিদা সংরক্ষণের কেন্দ্র গড়ে তুলবেন। প্রতিটি মাদরাসায় আরবি বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত মাসে একবার সমকালীন চিন্তাগত চ্যালেঞ্জ এবং ইসলামী বিধিবিধান নিয়ে উত্থাপিত আপত্তির যুক্তিনির্ভর জবাব বিষয়ে প্রশিক্ষণমূলক আলোচনা আয়োজন করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তরুণদেরও ইতিবাচক বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে আলেমদের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে। আগামী শাবান মাসে যোগ্য আলেম ও মেধাবী ফারেগদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজনের ঘোষণাও দেন তিনি।
এর আগে চতুর্থ অধিবেশনে ‘আকিদা সংরক্ষণে আমাদের করণীয় ও কর্মপদ্ধতি’ শীর্ষক আলোচনায় মাওলানা হাফেজ মুহাম্মদ আলমাস দাওয়াতি কাজে ইখলাস, ধারাবাহিকতা ও দলিল-প্রমাণের দৃঢ়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে সাহাবায়ে কেরামের অবদান ও মর্যাদা তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
সমাপনী অধিবেশনে পরিষদের সহকারী নাজিম মাওলানা আমির হামজা কাসেমি কানপুরে চলমান দাওয়াতি ও সংস্কারমূলক কার্যক্রমের প্রতিবেদন তুলে ধরেন। তিনি জানান, সাপ্তাহিক পরামর্শসভা, ২৪ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ শিবির এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে কয়েক ডজন তরুণ ও শ্রমজীবী মানুষকে নবুওয়ত ও মাহদিবাদের মিথ্যা দাবিদারদের প্রভাব থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
সমাপনী অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন রাবেতা মাদারিস ইসলামিয়া দারুল উলুম দেওবন্দের পূর্ব উত্তর প্রদেশ জোন-১-এর সভাপতি মুফতি ইকবাল আহমদ কাসেমি, মাদরাসা জামিউল উলুম জামে মসজিদ পটকাপুরের মুহতামিম ও মোতাওয়াল্লি মুহিউদ্দিন খসরু তাজ, মুফতি আবদুর রশিদ কাসেমি, মাওলানা খলিল আহমদ মাজাহিরি ও শহর কাজি হাফেজ মামুর আহমদ জামেয়িসহ স্থানীয় বিশিষ্ট আলেমরা।
সূত্র: ফেসবুক পেজ
আইও/