সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬ ।। ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
মাদরাসা শিক্ষার কারিকুলাম যুগোপযোগী ও কর্মসংস্থানমুখী করার উদ্যোগ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ছেলেদের জন্যও উপবৃত্তির ভাবনা সরকারের বাইতুল মোকাররম প্রতিষ্ঠায় শামসুল হক ফরিদপুরীর অনন্য অবদান হেরা গুহার নিঃসঙ্গ ভাবনা বুলবুল হত্যা: সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে ওসির সঙ্গে ইসলামী যুব আন্দোলনের সাক্ষাৎ দুই দিনের সফরে ঠাকুরগাঁও যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি ঢাকা মেডিকেল এলাকার আশপাশ যেন গাঁজাখোর জোন: কে এম শরীয়তুল্লাহ জামেয়া দ্বীনিয়া দারুল আবরার মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা হেলাল উদ্দিন আফতাবি-র ইন্তেকাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আমীরে মজলিসের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় হাম উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১ হাজার ২৩২

বাইতুল মোকাররম প্রতিষ্ঠায় শামসুল হক ফরিদপুরীর অনন্য অবদান

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
প্রতিষ্ঠাকালের বাইতুল মোকাররমের ছবি। ছবি: সংগৃহিত

|| মুফতী মাহমুদুল হক বিন সলিমুল্লাহ ||

বাইতুল মোকাররম আমাদের গর্বের জাতীয় মসজিদ। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র পল্টনে অবস্থিত নান্দনিক ডিজাইনের বিশাল মসজিদ দেখতে ও জিয়ারত করতে প্রতিদিন শত শত মানুষ সেখানে গমন করেন।

এটি বিশ্বের দশম বৃহত্তম মসজিদ। এখানে একসঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার মুসল্লি জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। মক্কার পবিত্র কাবা শরিফের আদলে এর মূল ভবনের আকৃতি তৈরি করা হয়েছিল। চারকোনা বিশিষ্ট মূল ভবন। মসজিদটি আটতলা। নিচতলায় বিশাল বিপণীকেন্দ্র বা মার্কেট রয়েছে। দোতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত নামাজের জন্য নির্ধারিত।

১৯৬০ সালের ২৭শে জানুয়ারি এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৬৩ সালে এখানে প্রথম জুমা অনুষ্ঠিত হয়।

বাইতুল মোকাররমকে আমরা সবাই চিনি ও জানি, কিন্তু এর সাথে যে জড়িয়ে আছে বাংলার আলেমকুল শিরোমণি, মুজাহিদে আজম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর অনন্য অবদানের গর্বিত ইতিহাস—সেটা আমরা কজন জানি!

আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী এই বঙ্গীয় অঞ্চলে এমন কোনো দ্বীনি খেদমত ও কাজ নেই যার নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা তিনি করেননি। আজ বিশ্বজুড়ে দাওয়াত ও তাবলীগের যে জয়জয়কার, সেই বিশ্ব তাবলীগের প্রধান কেন্দ্র আমাদের বাংলাদেশে। এখানে সারা পৃথিবী থেকে হাজার হাজার মুসল্লি দ্বীনি দাওয়াতের অসিলায় একত্রিত হন। এখানে সংঘটিত হয় বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের বৃহত্তম গণজমায়েত বিশ্ব ইজতেমা। এটা শামসুল হক ফরিদপুরীর এখলাসের ফলাফল—তিনি এদেশে তাবলীগী কাজের সূচনা করেছিলেন। বর্তমানে তাবলীগের মারকাজ কাকরাইল মসজিদ হুজুরের পরামর্শে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

দেশের প্রধান অনেকগুলো জামিয়া তিনি গড়ে তুলেছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শীর্ষ মাদ্রাসা লালবাগ জামিয়া, ফরিদাবাদ, বড় কাটরাসহ সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার মসজিদ-মাদ্রাসা, খানকা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠান তাঁর হাতে গড়া।

তাঁর অনন্য কীর্তি ও অবদানের মধ্যে বাইতুল মোকাররম প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে আজকের আলোচনা।

আমাদের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম যে জায়গায় অবস্থিত, সে জায়গাটি ছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন ব্যবসায়ীর। তারা সেখানে একটি সর্বাধুনিক মার্কেট নির্মাণের চিন্তাভাবনা করছিলেন। তখন ছিল ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শাসন। হঠাৎ সরকার ওই জায়গা অ্যাকোয়ারের নোটিশ জারি করে। কোটি কোটি টাকার বিশাল জায়গা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে ব্যবসায়ীরা নানা চেষ্টা-তদবির করতে লাগলেন, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছিল না। সরকারের মোকাবেলায় কে দাঁড়াতে পারে? কার বুদ্ধি কাজে লাগতে পারে?

অবশেষে তারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শীর্ষ আলেম, প্রখ্যাত বুজুর্গ আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরীর দরবারে উপস্থিত হন। ঘটনা শুনে হুজুর তাদেরকে অনেক শক্ত কথা শুনিয়ে দিলেন এবং বললেন, “তোমরা কত শত মিল-কলকারখানা মায়ানমারসহ অন্যান্য দেশে করেছ, সব ফেলে আসতে হয়েছে। এ দেশেও যে বড় বড় কলকারখানা তোমরা প্রতিষ্ঠা করেছ, অল্প দিনের মধ্যে তাও ফেলে তোমাদের পালাতে হবে। কারণ তোমরা আল্লাহর জন্য, তাঁর দীনের জন্য কিছুই করো নাই। হয়তো এ দেশের মাতব্বরিও ছেড়ে তোমাদের পালাতে হবে একদিন। এখন আমার কাছে কেন এসেছ?” (আল্লামা ফরিদপুরীর কী দূরদর্শিতা ছিল! এর ১০ বছর পর বাংলাদেশে যুদ্ধ লাগে এবং এ দেশ স্বাধীন হয়।)

ব্যবসায়ীরা খুব কাকুতি-মিনতি করে হুজুরের কাছে পরামর্শ চাইলেন। হুজুর তাদেরকে বললেন, “আমি তোমাদেরকে পরামর্শ দিতে পারি। যদি তোমরা শোনো, তাহলে তোমাদের জমি তো নষ্ট হবেই না, অধিকন্তু কেয়ামত পর্যন্ত তোমরা লাভবান হতে থাকবে।” তারা সবাই হুজুরের কথা মান্য করার অঙ্গীকার করে।

হুজুর বললেন, “সেই জায়গায় বিরাট আকারের একটি মসজিদ তৈরি করো, যা স্মরণীয় মসজিদে পরিণত হবে এবং সে জায়গার বাকি পুরো অংশে আদর্শ একটি মার্কেট তৈরি করো, যার সকল উপার্জনে মসজিদের সমস্ত খরচ পরিচালিত হবে। তাহলে কেয়ামত পর্যন্ত তোমরা লাভবান হতে পারবে।”

ব্যবসায়ীরা বলল, “হুজুর, ওই জায়গার কাছে যাওয়া বেআইনি, কীভাবে মসজিদ করব?”

হযরত মাওলানা ফরিদপুরী রহ. বললেন, “সরকারের নিকট খবর হওয়ার আগেই তোমরা রাতারাতি ওই জায়গা টিন দিয়ে ঘেরাও করে সিমেন্ট-বালি দ্বারা একটা ভিত্তি স্থাপন করে মসজিদের একটা সাইনবোর্ড লাগিয়ে দাও। এরপর দায়িত্ব আমার। সাইনবোর্ড লাগানোর পরে সরকার যদি ভাঙতে আসে, সেটা আমি ঠেকাব ইনশাআল্লাহ। দেখব সরকার কীভাবে মসজিদে হস্তক্ষেপ করে।”

তারা হুজুরের কথামতো কাজ করল। পরে সরকারি দায়িত্বশীল দফতর অবস্থা জেনে খবরাখবর নিয়ে জানতে পারল, মাওলানা শামসুল হক সাহেবের পরামর্শে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে।

পরবর্তীতে উপরমহলে অনেক কানাঘুষা হলো, কিন্তু হুজুরের প্রভাবে কেউ মসজিদে হস্তক্ষেপ করতে সাহস করল না। পাকিস্তানি ব্যবসায়ীরা হুজুরের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজটি আঞ্জাম দিয়েছিল, যেটি আজ আমাদের গর্বের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম।

সূত্র: আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর জীবনী। পৃষ্ঠা: ১৪২-১৪৩

লেখক: সাবেক মুহাদ্দিস: জামিয়া কাসেমুল উলুম, রহমতপাড়া, মাগুরা। খতিব, ফোরকানিয়া জামে মসজিদ, পাঁচ্চর, শিবচর, মাদারীপুর।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ