নিজস্ব প্রতিবেদক
জীবনের সর্বাবস্থায় হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর মুহাদ্দিস ও মুফতি আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন। তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের মধ্যেই মুমিনের দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি ও সফলতা নিহিত।
সম্প্রতি পবিত্র সীরাতুন্নবী (সা.) বিষয়ে দারুল উলূম হাটহাজারীতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া একদল তরুণ আলেমের উদ্দেশে তিনি এসব কথা বলেন।
মুফতি জসিমুদ্দীন বলেন, ইসলামের প্রতিটি বিধানই মানবকল্যাণের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। ইসলামের ইবাদত-বন্দেগি, বিধান ও নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। জুলুম-অত্যাচার, অবিচার ও বেইনসাফি দূর হবে; সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা সমুন্নত থাকবে।
তিনি বলেন, ইসলামের বিধানকে সঠিকভাবে চিনতে ও বুঝতে হলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সাহাবায়ে কেরামের জীবন অধ্যয়ন করতে হবে।
পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আল্লাহর ভালোবাসা পেতে হলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (সা.) যা আদেশ করেছেন তা গ্রহণ এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশও কোরআনে দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্যকে আল্লাহর আনুগত্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুফতি জসিমুদ্দীন বলেন, কোরআনে সুন্নাহ অনুসরণের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত ও নির্দেশকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। এ কারণে একজন মুমিনের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুন্নাহর অনুসরণ থাকা জরুরি।
হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতের জন্য আল্লাহর কিতাব ও তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। যতক্ষণ মানুষ এ দুটি বিষয় দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে, ততক্ষণ তারা পথভ্রষ্ট হবে না।
তরুণ আলেমদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা আপনাদের দ্বীনি ইলম অর্জনের সুযোগ দিয়েছেন। তাই এ ইলমকে মহান নিয়ামত হিসেবে গ্রহণ করে এর গুরুত্ব ও মর্যাদা দিতে হবে। নিজেদের জীবন সুন্নাহ অনুযায়ী গড়ে তুলতে হবে এবং দ্বীনি শিক্ষাকে জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে দ্বীনি শিক্ষা বিস্তার, আদর্শ সমাজ ও দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, জীবন চলার পথে সর্বক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে। জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়, নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত এবং উম্মতে মুহাম্মদীর ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণে কাজ করার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের কল্যাণেও সজাগ থাকতে হবে।
মুফতি জসিমুদ্দীন বলেন, যেখানেই থাকুন না কেন, দ্বীনি ইলমের প্রচার-প্রসারে কাজ করতে হবে এবং দাওয়াত ও তাবলিগে সময় দিতে হবে। তবে পরিবেশ ও পরিস্থিতি বুঝে সুস্থিরতা, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে দ্বীনি কাজ আঞ্জাম দিতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্তিম অসিয়তের কথা উল্লেখ করে তিনি তরুণ আলেমদের সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মতভেদ ও বিভ্রান্তির সময়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে এবং নবাবিষ্কৃত বিষয় থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
আল্লামা মুফতি জসিমুদ্দীন আরও বলেন, কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকিরকে জীবনের অপরিহার্য অংশ করে নিতে হবে। এগুলো মানুষের অন্তরে নূর সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে দৃঢ় করে।
তরুণ আলেমদের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন, মুহাদ্দিসীন, মুজতাহিদীন, আউলিয়ায়ে কেরাম এবং আকাবিরে দেওবন্দ ও আকাবিরে হাটহাজারীর মাসলাকের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে তাদের কাঁধে দাওয়াতের মহান দায়িত্ব এসেছে।
তিনি বলেন, এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আদর্শকে আকিদা, আমল ও জীবনের সর্বক্ষেত্রে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে। ইলমি দক্ষতা, খোদাভীতি, একনিষ্ঠতা, আল্লাহর ওপর ভরসা ও সুন্নাহ অনুসরণকে হাতিয়ার করে দেশ ও জাতির পথপ্রদর্শনে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
তরুণ আলেমদের ভবিষ্যৎ জাতির কান্ডারি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তালিম, দাওয়াত ও তাবলিগ, ইমামত, বক্তৃতা-বিবৃতি, ওয়াজ-নসিহত ও লেখনীর মাধ্যমে পথহারা মানুষকে সঠিক পথের দিশা দিতে হবে। এ পথ কণ্টকাকীর্ণ হলেও ধৈর্য, সহনশীলতা, দৃঢ়তা, গাম্ভীর্য, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে বাধা অতিক্রম করতে হবে।
যশ-খ্যাতির লোভ পরিহার করে ইলম ও আখলাকের প্রতিটি স্তরে কঠোর সাধনা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য করে তোলার আহ্বান জানিয়ে মুফতি জসিমুদ্দীন বলেন, তরুণ আলেমরাই ভবিষ্যৎ জাতির কান্ডারি ও দ্বীনের ধারক-বাহক। মহান আল্লাহ যেন তাদের দেশ ও জাতির সঠিক পথপ্রদর্শক হিসেবে কবুল করেন—এ কামনা করেন তিনি।
এসএইচ/