বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ ।। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪৮


পরিবেশবান্ধব কওমি মাদরাসা গড়ে তুলি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

|| মিনহাজ উদ্দীন আত্তার ||

একটি কওমি মাদরাসা শুধু দ্বীনি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মানুষ গড়ার এক মহৎ পাঠশালা। এখানেই গড়ে ওঠেন আগামী দিনের আলেম, ইমাম, খতিব, শিক্ষক ও সমাজের নৈতিক নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিরা। ফলে একটি মাদরাসার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন চর্চা শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর ইতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, মসজিদ এবং বৃহত্তর সমাজে। তাই কওমি মাদরাসাগুলো যদি পরিবেশ সংরক্ষণকে নিজেদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলে, তবে তা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

ইসলাম মানুষকে পৃথিবীর মালিক নয়, বরং আল্লাহর প্রতিনিধি ও আমানতদার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। এই পৃথিবী মানুষের ইচ্ছামতো ভোগ করার বস্তু নয়; বরং এটি এমন একটি আমানত, যার হেফাজতের দায়িত্ব মহান আল্লাহ মানুষের ওপর অর্পণ করেছেন। তাই পরিবেশ রক্ষা কোনো আধুনিক ধারণা নয়; এটি ইসলামের নৈতিক শিক্ষা, দায়িত্ববোধ এবং ইবাদতের একটি বাস্তব প্রকাশ।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি, তাতে স্থাপন করেছি সুদৃঢ় পর্বতমালা এবং তাতে উদ্গত করেছি সব ধরনের মনোরম উদ্ভিদ।” (সূরা কাফ: ৭)। অন্যত্র সতর্ক করে বলা হয়েছে, “মানুষের কৃতকর্মের কারণেই স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।” (সূরা আর-রূম: ৪১)। এই আয়াতগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে তার ক্ষতিকর প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেই ফিরে আসে।

আজ আমরা সেই বাস্তবতাই প্রত্যক্ষ করছি। জলবায়ু পরিবর্তন, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, বন উজাড় এবং প্লাস্টিক দূষণ আমাদের জীবনকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। নিরাপদ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং নির্মল বাতাস আজ বিশ্বজুড়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবিলায় শুধু আইন বা প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, সংযম এবং দায়িত্বশীল জীবনচর্চা। আর সেই শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিবেশ সংরক্ষণে এমন সব শিক্ষা দিয়েছেন, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়াহ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো মুসলমান একটি গাছ রোপণ করলে তার ফল মানুষ, পাখি কিংবা অন্য কোনো প্রাণী ভক্ষণ করলে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে। আবার অজুর সময় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে দেখে তিনি সাহাবিকে সতর্ক করে বলেন, প্রবাহমান নদীর তীরেও যেন অপচয় না করা হয়। এ থেকেই স্পষ্ট হয়, ইসলাম পরিবেশের প্রতি কতটা সংবেদনশীল এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছে।

এই শিক্ষা সামনে রেখে দেশের কওমি মাদরাসাগুলো পরিবেশ সংরক্ষণে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। প্রতিটি মাদরাসায় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্ন ও প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তোলা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ ও পানির সাশ্রয়ী ব্যবহারকে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য বড় বাজেটের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন আন্তরিকতা, পরিকল্পনা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ।

পরিবেশ নিয়ে আমার এই ভাবনা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। ছাত্রজীবনে আজমপুর দারুল উলুম মাদরাসায় অধ্যয়নকালে প্রিয় আসাতাজায়ে কেরামের সঙ্গে মাদরাসার আঙিনা ও ছাদে বৃক্ষরোপণের সৌভাগ্য হয়েছিল। বহু বছর পরও সেই গাছগুলো সবুজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিবার সেখানে গেলে মনে হয়, একটি ছোট্ট চারা কত দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণের সাক্ষী হতে পারে।

পরবর্তীতে দারুল আজহার মডেল মাদরাসার ডিজিটাল ক্যাম্পাসে হোস্টেল সুপার ও আইটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং পরিবেশ সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। তখন উপলব্ধি করেছি, পরিবেশ রক্ষা আলাদা কোনো কর্মসূচি নয়; বরং এটি চরিত্র গঠনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে শিক্ষার্থী একটি গাছের যত্ন নিতে শেখে, সে মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতির প্রতিও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে।

বর্তমানে কতকিছুর হাটের মাধ্যমে কৃষক, কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করি—মাটি সুস্থ না থাকলে ফসল সুস্থ হয় না, পরিবেশ সুস্থ না থাকলে মানুষের জীবনও সুস্থ থাকে না। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ কেবল প্রকৃতিকে রক্ষা করার বিষয় নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আজকের একজন তালিবুল ইলমই আগামী দিনের একজন ইমাম, খতিব কিংবা শিক্ষক। তিনি যদি নিজের জীবনেই পরিচ্ছন্নতা, সংযম, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ রক্ষার চর্চা করেন, তাহলে তাঁর মাধ্যমে সেই শিক্ষা হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। মিম্বার থেকে পরিবেশ রক্ষার কথা বলা যেমন জরুরি, তেমনি মাদরাসার আঙিনায় একটি গাছ রোপণ করাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি আল্লাহর দেওয়া আমানতের হেফাজত। তাই প্রতিটি কওমি মাদরাসা যদি ইলমের পাশাপাশি সবুজায়ন, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সচেতনতাকে নিজেদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলে, তবে সেখান থেকেই গড়ে উঠবে একটি দায়িত্বশীল, সচেতন ও মানবিক প্রজন্ম।

আসুন, আমরা সবাই মিলে পরিবেশবান্ধব কওমি মাদরাসা গড়ে তুলি। ইলমের আলোয় আলোকিত প্রতিটি মাদরাসা হোক সবুজেরও ঠিকানা। কারণ একটি সবুজ মাদরাসা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সুস্থ সমাজ, নিরাপদ পরিবেশ এবং টেকসই বাংলাদেশের ভিত্তি রচনার অন্যতম অনুপ্রেরণা।

লেখক: আলেম, কৃষি উদ্যোক্তা; পরিচালক, কতকিছুর হাট; ই-মেইল: minhazantor10@gmail.com

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ