মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ৪ রবিউস সানি ১৪৪৮


মোবাইল আসক্তি: তরুণ প্রজন্মের নীরব নৈতিক সংকট

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মুফতী আনোয়ার হুসাইন নদভী ||

একটি ছোট্ট যন্ত্র—মুঠোফোন। আয়তনে সামান্য, অথচ এর ভেতরে যেন গোটা পৃথিবী বন্দী। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তেই যোগাযোগ, এক ক্লিকে হাজারো বই, অসংখ্য তথ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য—সবকিছুই এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অগ্রগতি নিঃসন্দেহে মানবজীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু কখনো কখনো সহজ করে দেওয়া কোনো কিছুই যখন আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে, তখন উপকারের সেই মাধ্যমটিই পরিণত হয় বিপদের কারণ। আজকের মুসলিম তরুণ প্রজন্মের সামনে মোবাইল ফোন তেমনই এক নীরব পরীক্ষা।

একসময় মানুষ প্রয়োজনের জন্য মোবাইল হাতে নিত; এখন অনেকেই মোবাইলের প্রয়োজন ছাড়াই মোবাইল হাতে নেয়। একসময় ফোন ছিল যোগাযোগের মাধ্যম; এখন এটি অনেকের কাছে সময় কাটানোর সঙ্গী, একাকিত্বের আশ্রয়, বিনোদনের প্রধান উৎস, এমনকি ঘুম থেকে ওঠা ও ঘুমিয়ে পড়ার শেষ সঙ্গী। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত স্ক্রিন, সকালে চোখ খোলার পর প্রথমেই স্ক্রিন। মাঝখানে জীবনের যে সময়টুকু—সেটিও ক্রমশ স্ক্রিনের দখলে চলে যাচ্ছে। সমস্যা মোবাইল ফোনে নয়; সমস্যাটি শুরু হয় তখন, যখন মানুষ মোবাইল ব্যবহার না করে মোবাইলই মানুষকে ব্যবহার করতে শুরু করে।

আজকের একজন তরুণ হয়তো সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ফোনটি হাতে নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন দেখে, কয়েকটি রিলস দেখে, কারও স্টোরি দেখে, একটি ভিডিও থেকে আরেকটি ভিডিওতে চলে যায়। নিজেকে বলে—“আরেকটা দেখে রাখি, তারপর উঠব।” কিন্তু সেই ‘আরেকটা’ কখন যে দশটা, বিশটা কিংবা পঞ্চাশটিতে পরিণত হয়, তা সে নিজেই টের পায় না। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যায়, অথচ তার দিন শুরু হয় না।

কত অদ্ভুত আমাদের সময়! আমরা কখনো কখনো পাঁচ মিনিটের একটি ফোনকলের জন্যও ব্যস্ত হয়ে পড়ি, অথচ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিংয়ের জন্য আমাদের কোনো হিসাব থাকে না। আমরা বলি—‘সময় নেই।’ অথচ সেই আমরাই প্রতিদিন কত সময় যে এমন কিছুর পেছনে ব্যয় করছি, যার কোনো স্থায়ী মূল্য নেই!

আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করে বলেছেন—

وَالْعَصْرِ - إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْر

“শপথ সময়ের! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত।”

 —সূরা আল-আসর: ১–২

আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করেছেন—এটাই সময়ের মর্যাদা বোঝার জন্য যথেষ্ট। কারণ সময় মানে শুধু ঘড়ির কাঁটা নয়; সময় মানে জীবন। একটি মিনিট চলে যাওয়া মানে জীবনের একটি মিনিট চলে যাওয়া। একটি ঘণ্টা চলে যাওয়া মানে জীবনের একটি ঘণ্টা কমে যাওয়া। পৃথিবীর সব সম্পদ দিয়ে চেষ্টা করলেও অতীতের একটি মুহূর্ত ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

ধরা যাক, একজন তরুণ প্রতিদিন মাত্র তিন ঘণ্টা অপ্রয়োজনীয়ভাবে মোবাইলে ব্যয় করছে। এক বছরে সেই সময় দাঁড়ায় প্রায় ১,০৯৫ ঘণ্টা—অর্থাৎ প্রায় ৪৫ দিন। পাঁচ বছরে প্রায় ২২৮ দিন। ভাবুন তো, একজন মানুষ তার জীবনের প্রায় সাড়ে সাত মাসের সমপরিমাণ সময় শুধু কয়েক বছরের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিংয়ে হারিয়ে ফেলতে পারে!

এই সময়ের কিছু অংশ যদি কুরআন শেখার পেছনে ব্যয় হতো, কোনো একটি কিতাব পড়ার পেছনে ব্যয় হতো, কোনো দক্ষতা অর্জনে ব্যয় হতো, মা-বাবার সঙ্গে বসে কথা বলায় ব্যয় হতো, শরীরচর্চায় ব্যয় হতো, কোনো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যয় হতো—তাহলে সেই জীবন কতটা অন্যরকম হতে পারত!

তরুণ বয়স জীবনের এমন একটি ঋতু, যা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। যৌবন হলো শক্তির সময়, মেধার সময়, স্বপ্ন দেখার সময়, নিজেকে গড়ে তোলার সময়। আর ইসলামের দৃষ্টিতে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ আমানত।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন বান্দাকে তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে—সে তা কোথায় ব্যয় করেছে; এবং তার যৌবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে—তা কোথায় ক্ষয় করেছে।

যে বয়সে একজন মুসলিম তরুণ কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে পারত, ইলম অর্জন করতে পারত, নিজের চরিত্র নির্মাণ করতে পারত, বাবা-মায়ের সেবা করতে পারত, উম্মাহর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারত—সে বয়স যদি কেবল স্ক্রিনের আলোয় কেটে যায়, তাহলে এর চেয়ে বড় আফসোস আর কী হতে পারে?

মোবাইল আসক্তির বিপদ শুধু সময় নষ্ট হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব মানুষের মন, ঘুম, মনোযোগ, সামাজিক সম্পর্ক এবং নৈতিকতার ওপরও পড়তে পারে। আধুনিক গবেষণাতেও অতিরিক্ত ও সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সমস্যা এবং মানসিক সুস্থতার বিভিন্ন নেতিবাচক সূচকের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের একটি বড় systematic review ও meta-analysis-এ ১৮২টি গবেষণা এবং ১০ লাখের বেশি মানুষের তথ্য পর্যালোচনা করে সমস্যাজনক social media use-এর সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতার লক্ষণ, ঘুমের সমস্যা এবং কম wellbeing-এর সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে এসব গবেষণা সব ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল প্রমাণ করে না; মানুষের মানসিক অবস্থা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্পর্কটি জটিল।

রাতের ঘুমের কথাও বিশেষভাবে ভাবা দরকার। বিছানায় যাওয়ার পরও যদি চোখ স্ক্রিনে আটকে থাকে, একটি ভিডিও শেষ হওয়ার পর আরেকটি ভিডিও, একটি পোস্টের পর আরেকটি পোস্ট—তাহলে ঘুমের সময় পিছিয়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। গবেষণাতেও তরুণদের অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের মানের অবনতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—মোবাইল আমার ঘুম নষ্ট করছে কি না, তার চেয়েও আগে মোবাইল কি আমার আখিরাতের ঘুম বাড়িয়ে দিচ্ছে?

আমি কি রাত জেগে মানুষের জীবন দেখছি, অথচ নিজের জীবনের হিসাব ভুলে যাচ্ছি?

আমি কি শত শত মানুষের পোস্ট পড়ছি, অথচ কুরআনের কয়েকটি আয়াত পড়ার সময় পাচ্ছি না?

আমি কি অন্যের জীবনের প্রতিটি আপডেট জানি, অথচ নিজের রবের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কতটা গভীর—সেটি জানার চেষ্টা করছি না?

কখনো কখনো মানুষ মোবাইলের স্ক্রিনে এতটাই ডুবে যায় যে আজানের শব্দও তার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। কোনো নোটিফিকেশন তাকে টেনে নেয়, কিন্তু “হাইয়া আলাস সালাহ” তাকে টেনে নিতে পারে না। একটি ভিডিওতে এক ঘণ্টা চলে যায়, অথচ দশ মিনিট কুরআন পড়তে তার মন বসে না।

এখানেই বিষয়টি শুধু প্রযুক্তির নয়; বিষয়টি হয়ে যায় হৃদয়ের।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ - حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ

“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরস্থানে পৌঁছেছ।”

 —সূরা আত-তাকাসুর: ১–২

আজকের যুগে এই প্রতিযোগিতা শুধু টাকা-পয়সা বা সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কে কত লাইক পেল, কার কত ফলোয়ার, কার ভিডিও কত ভাইরাল হলো, কে কোথায় ঘুরতে গেল, কে কী কিনল—এসবও অনেকের জীবনে এক ধরনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। মানুষ অন্যের সাজানো কয়েক সেকেন্ড দেখে নিজের পুরো জীবনকে মূল্যহীন মনে করতে শুরু করে।

একজন তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের হাসি দেখে নিজের কান্নার সঙ্গে তুলনা করে। অন্যের সাফল্য দেখে নিজের ব্যর্থতাকে বড় করে দেখে। অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজের স্বাভাবিক জীবনকে অসুন্দর মনে করে। অথচ সে জানে না—যে জীবনের কয়েক সেকেন্ড সে দেখছে, তার আড়ালে কত অশ্রু, কত ঋণ, কত দুশ্চিন্তা, কত অশান্তি লুকিয়ে আছে।

আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো—চোখের হেফাজত।

আজ হারাম দেখা আগের মতো কঠিন নয়। অশ্লীলতার জন্য কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে হয় না; কখনো কখনো তা নিজেই আমাদের স্ক্রিনে এসে হাজির হয়। একটি ভিডিও, একটি ছবি, একটি রিল—তারপর আরেকটি। চোখ অভ্যস্ত হয়ে যায়। হৃদয় ধীরে ধীরে সংবেদনশীলতা হারাতে থাকে।

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন—

قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ

“মুমিনদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।”

 —সূরা আন-নূর: ৩০

আজকের যুগে চোখের হেফাজত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। কারণ হারাম এখন শুধু রাস্তার পাশে নয়; অনেক সময় তা মানুষের নিজের ঘরের ভেতর, নিজের হাতে থাকা একটি ছোট্ট যন্ত্রের পর্দায়।

তাই তাকওয়া শুধু মানুষের সামনে ভালো থাকা নয়। তাকওয়া হলো—একাকী ঘরে বসেও এমন কিছু থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া, যা দেখলে কেউ জানবে না; কিন্তু আল্লাহ জানেন।কেউ দেখছে না—এই ধারণা একজন মুমিনের নয়।

আল্লাহ দেখছেন। এই একটি বিশ্বাস যদি হৃদয়ে জীবন্ত থাকে, তাহলে অন্ধকার ঘরেও একজন তরুণ নিজেকে সংযত রাখতে পারে।

মোবাইল আসক্তির আরেকটি ক্ষতি হলো মনোযোগের ভাঙন। ছোট ছোট ভিডিও ও দ্রুত পরিবর্তনশীল কনটেন্টের অভ্যাস মানুষের দীর্ঘ সময় ধরে একটি কঠিন বা গভীর কাজের ওপর মনোযোগ ধরে রাখাকে কঠিন করে তুলতে পারে। ফলে বই পড়া, দীর্ঘ কোনো লেখা বোঝা, গবেষণা করা কিংবা ইলমের কিতাব নিয়ে বসার মতো কাজ অনেকের কাছে ধৈর্যের হয়ে ওঠে।

এ কারণেই হয়তো আজ অনেক তরুণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করতে পারে, কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা কিতাব পড়তে পারে না।কয়েক ঘণ্টা গেম খেলতে পারে, কিন্তু আধা ঘণ্টা মন দিয়ে কোনো দরস শুনতে পারে না।শত শত ভিডিও দেখতে পারে, কিন্তু কুরআনের একটি সূরার তাফসির নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে পারে না।সমস্যা মেধার অভাবে নয়; অনেক সময় সমস্যাটি হলো—মনোযোগের অভ্যাস হারিয়ে যাওয়া।

তবে এর অর্থ এই নয় যে মোবাইলকে শত্রু বানিয়ে ফেলতে হবে। ইসলাম উপকারী প্রযুক্তির বিরোধিতা করে না। মোবাইলের মাধ্যমে কুরআন শেখা যায়, হাদিস পড়া যায়, দ্বীনি দরস শোনা যায়, বই পড়া যায়, ব্যবসা করা যায়, প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা যায়, মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া যায়।

সুতরাং প্রশ্নটি মোবাইল থাকবে কি থাকবে না—এটি নয়। প্রশ্ন হলো—মোবাইল কি আমার হাতে, নাকি আমি মোবাইলের হাতে?মোবাইল যদি আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে এটি একটি উপকারী যন্ত্র। আর যদি আপনার সময়, ঘুম, চিন্তা, দৃষ্টি ও ইবাদতকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তবে সেটিই বিপদের কারণ।

তাই প্রতিকারের প্রথম ধাপ হলো—নিজের সঙ্গে সত্য কথা বলা।আজই একবার মোবাইলের screen time দেখুন। কত ঘণ্টা? তারপর নিজের কাছে প্রশ্ন করুন—এই সময়ের কতটুকু সত্যিই প্রয়োজনীয় ছিল?

হয়তো সংখ্যাটি দেখে নিজের কাছেই অবাক লাগবে।কিন্তু ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ পরিবর্তনের জন্য কখনো পুরো জীবন একদিনে বদলাতে হয় না। একটি ছোট সিদ্ধান্তই যথেষ্ট—আজ থেকে আমি আমার সময়ের মালিক হব।

প্রথমে অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করা যায়। যে অ্যাপ সবচেয়ে বেশি সময় খেয়ে ফেলছে, সেটির ব্যবহার সীমিত করা যায়। ঘুমের অন্তত কিছু সময় আগে ফোনটি বিছানা থেকে দূরে রাখা যায়। খাবারের সময় ফোন না ধরার অভ্যাস করা যায়। পরিবারের সঙ্গে বসার সময় ফোন পাশে না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সালাতের সময় ফোনকে নয়, আল্লাহর ডাককে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়।

দিনের শুরুটা বদলে দিন। ঘুম থেকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে ফোন নয়—প্রথমে আল্লাহকে স্মরণ করুন। ফজরের সালাত আদায় করুন। কিছু সময় কুরআনের সঙ্গে কাটান। দিনের প্রথম আলো যদি স্ক্রিনের আলোয় নয়, কুরআনের আলোয় হৃদয়ে প্রবেশ করে, তাহলে হয়তো পুরো দিনটির চরিত্রই বদলে যাবে।

রাতটাকেও বদলে দিন। ঘুমের আগে পৃথিবীর মানুষের জীবন দেখার পরিবর্তে নিজের জীবন নিয়ে ভাবুন। আজ আমি কী করলাম? কাকে কষ্ট দিলাম? কোন গুনাহ হলো? আল্লাহর জন্য কী করলাম? কাল কীভাবে আরও ভালো হতে পারি?

মোবাইলের পর্দা বন্ধ করে কখনো নিজের হৃদয়ের পর্দাটিও খুলে দেখুন।সেখানে হয়তো অনেকদিনের জমে থাকা ক্লান্তি আছে।অনেক গুনাহ আছে।অনেক অপ্রকাশিত কান্না আছে।আবার হয়তো আছে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষাও।আর মনে রাখবেন, আল্লাহর দিকে ফিরে আসার দরজা এখনো খোলা।

আপনি যদি ইতোমধ্যে মোবাইল আসক্তিতে ডুবে থাকেন, নিজেকে শেষ মনে করবেন না। আজ থেকেই শুরু করুন। পাঁচ ঘণ্টা থেকে চার ঘণ্টা, চার ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা থেকে প্রয়োজনীয় সময়—ধীরে ধীরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনুন। প্রতিদিন কিছু নির্দিষ্ট সময় screen-free রাখুন। সেই সময়টুকু কুরআন, কিতাব, পরিবার, শরীরচর্চা, প্রকৃতি কিংবা নীরব আত্মসমালোচনার জন্য রাখুন।

কারণ মানুষকে শুধু কোনো কিছু থেকে দূরে রাখলেই হয় না; তাকে ভালো কিছুর সঙ্গে যুক্ত করতেও হয়।

যে তরুণের হাতে কুরআন নেই, কিতাব নেই, লক্ষ্য নেই, দায়িত্ব নেই, সৃজনশীল কাজ নেই—তার জন্য মোবাইল থেকে দূরে থাকা কঠিন। কিন্তু যার সামনে একটি লক্ষ্য আছে, যার হৃদয়ে আখিরাতের চিন্তা আছে, যার হাতে একটি কিতাব আছে, যার মনে কোনো স্বপ্ন আছে—সে তার সময়ের মূল্য বুঝতে শেখে।

প্রিয় তরুণ, তোমার যৌবন সস্তা নয়।তোমার সময় সস্তা নয়।তোমার চোখ সস্তা নয়।তোমার মেধা সস্তা নয়।তোমার হৃদয় সস্তা নয়।তুমি শুধু একজন মোবাইল ব্যবহারকারী নও; তুমি একজন মুসলিম। তোমার জীবনের সঙ্গে তোমার পরিবার, সমাজ এবং উম্মাহর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।

তোমার হাতে শুধু একটি ফোন নেই—তোমার হাতে তোমার ভবিষ্যৎও আছে।তুমি চাইলে এই হাত দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করতে পারো। আবার এই হাত দিয়েই কুরআনের পাতা উল্টাতে পারো।তুমি চাইলে চোখ দিয়ে হারাম দেখতে পারো। আবার এই চোখ দিয়েই কুরআনের আয়াত পড়তে পারো।

তুমি চাইলে রাত জেগে অর্থহীন ভিডিও দেখতে পারো। আবার সেই রাতেই তাহাজ্জুদের দুই রাকাত পড়ে আল্লাহর কাছে নিজের ভবিষ্যৎ চেয়ে নিতে পারো।তুমি চাইলে নিজের যৌবনকে স্ক্রিনের পেছনে পুড়িয়ে দিতে পারো। আবার এই যৌবন দিয়েই এমন কিছু করে যেতে পারো, যার সুফল মৃত্যুর পরও তোমার আমলনামায় পৌঁছাবে।

একদিন এই ফোনটি হাতে থাকবে না।একদিন আঙুল স্ক্রল করবে না।একদিন নোটিফিকেশন আসবে না।একদিন ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম—কোনোটিই থাকবে না।থাকবে শুধু আমলনামা।থাকবে শুধু হিসাব।থাকবে শুধু আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো।সেদিন হয়তো কেউ আর জিজ্ঞেস করবে না—তোমার কত ফলোয়ার ছিল? কত লাইক পেয়েছিলে? কত ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল?

জিজ্ঞেস করা হবে—তোমার জীবন কোথায় ব্যয় করেছিলে? তোমার যৌবন কোথায় ক্ষয় করেছিলে?তাই আজই নিজেকে প্রশ্ন করুন—আমি কি মোবাইল ব্যবহার করছি, নাকি মোবাইল আমার জীবন ব্যবহার করছে?

আরও গভীর একটি প্রশ্ন করুন—আজ যদি আমার জীবনের শেষ দিন হতো, গতকাল মোবাইলে যে সময়গুলো কাটিয়েছি—সেগুলোর কতটুকু নিয়ে আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে পারতাম?

প্রশ্নটি কঠিন।কিন্তু কখনো কখনো একটি কঠিন প্রশ্নই একটি ঘুমন্ত হৃদয়কে জাগিয়ে দেয়।এখনো সময় আছে।এখনো ফজরের আজান শোনা যায়।এখনো কুরআনের পাতা খোলা যায়।এখনো সিজদায় কাঁদা যায়।এখনো চোখের পানি দিয়ে অতীতের গাফিলতি ধুয়ে ফেলা যায়।এখনো একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়—

আমি আমার সময়কে আর অর্থহীনতার কাছে বিক্রি করব না।মোবাইল থাকবে, প্রযুক্তি থাকবে, পৃথিবী এগিয়ে যাবে—কিন্তু একজন মুমিনের হৃদয় প্রযুক্তির দাস হবে না।

কারণ সে জানে—সময়ই জীবন।আর জীবন একদিন শেষ হবে।তারপর ফিরে যেতে হবে সেই রবের কাছে, যিনি আমাদের সময় দিয়েছেন, যৌবন দিয়েছেন, চোখ দিয়েছেন, মেধা দিয়েছেন—এবং দিয়েছেন একটি জীবন।

সেদিন যেন বলতে পারি—“হে আমার রব! আপনি যে সময় আমাকে দিয়েছিলেন, তা পুরোপুরি নষ্ট করিনি। আপনার দেওয়া যৌবনকে গাফিলতির অন্ধকারে হারিয়ে দিইনি। আপনার দেওয়া চোখকে সবসময় হেফাজত করতে না পারলেও, আপনার দিকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছি। আপনার দেওয়া জীবনকে অর্থহীন স্ক্রলের স্রোতে ভাসিয়ে দিইনি; বরং আপনার সন্তুষ্টির পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি।”

হে তরুণ, তাই স্ক্রিনটি একটু বন্ধ করো।চারপাশের পৃথিবী থেকে কিছুক্ষণের জন্য চোখ ফিরিয়ে নিজের হৃদয়ের দিকে তাকাও।হয়তো সেখানে তোমার রব তোমাকে এখনো ডাকছেন।

ফিরে এসো।কারণ তোমার হারিয়ে যাওয়া সময় ফিরে আসবে না—কিন্তু তুমি যদি আজ ফিরে আসো, তবে তোমার বাকি সময়গুলো এখনো বদলে যেতে পারে।

লেখক: তত্ত্বাবধায়ক,ইফতা বিভাগ ,দারুল হিদায়া আল-মাদানিয়া মিরপুর, ঢাকা ১২১৬

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ