আওয়ার ইসলাম ডেস্ক
গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। আইনটিতে কোনো সম্পত্তি দান (হেবা) করার পরও দাতার জীবদ্দশায় তা নিজে ভোগদখল করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে বিলটি পাসের শুরু থেকেই এর কঠোর বিরোধিতা করে আসছে দেশের শীর্ষ আলেমসমাজ, ইসলামি রাজনৈতিক দলসহ বিরোধী দলের নেতারা। তাদের মতে, মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলা হলেও এই আইনের মাধ্যমে মূলত পবিত্র কোরআন-সুন্নাহ ও ইসলামি শরীয়াহ নির্ধারিত ফারায়েজ (উত্তরাধিকার) এবং হেবার মূল নীতিকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
শরীয়াহ বিরোধী এমন আইনের বিরুদ্ধে দেশের শীর্ষ আলেমসমাজ, ইসলামি রাজনৈতিক দলসহ বিরোধী দলের নেতাদের মতামত এবং দাবি সংক্ষিপ্তভাবে নিচে তুলে ধরা হলো—
বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক:
এ সংক্রান্ত দেওয়া মুফতি আব্দুল মালেকের ফতোয়ায় বলা হয়, প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে জীবিত অবস্থায় দাতা সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও আয় ভোগ করবেন এবং মৃত্যুর পর সম্পত্তি কন্যার কাছে চলে যাবে—এ ধরনের ব্যবস্থা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, এর মাধ্যমে কার্যত ইসলামি উত্তরাধিকার আইনকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হয়।
তিনি বলেন, ‘মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে কোনো ধরনের সংশোধন ও পরিবর্তনের ন্যূনতম অবকাশ নেই। জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে হেবা করা ইসলামি শরিয়তে জায়েজ নেই। হেবাকৃত সম্পদের দখল হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত কেউ একা ওই সম্পদের পূর্ণ মালিক হতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে সম্পদ মিরাস বণ্টননীতি অনুযায়ী সব ওয়ারিশের মধ্যে বণ্টন করা আবশ্যক। অন্যদিকে, যদি হেবার বস্তুর দখল হস্তান্তর সম্পন্ন হয়ে যায়, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে হেবাকারীর মালিকানা থেকে বাদ পড়ে হেবাগ্রহীতার মালিকানায় অন্তর্ভুক্ত হয়। দখল হস্তান্তরের পর "দাতার জীবদ্দশায় হেবাগ্রহীতা ওই সম্পদ ভোগ করার দাবি করতে পারবে না"—এমন শর্ত যুক্ত করা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বাতিল ও অর্থহীন।’
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ:
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-এ বিদ্যমান মুসলিম পারিবারিক ও সামাজিক বিধিব্যবস্থার কোনো ব্যত্যয় না ঘটে, তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
হেফাজত নেতৃদ্বয় আল্লামা শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান বলেন, বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতার নিরাপত্তা, সুচিকিৎসা ও সম্মানজনক জীবিকা নিশ্চিত করা প্রতিটি সন্তানের ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্ব। ইসলাম পিতা-মাতার হক আদায়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সুরক্ষায় যেকোনো ইতিবাচক উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
তবে সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ ও শরিয়াহর সামঞ্জস্যের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। মুসলমানদের সম্পত্তি বণ্টন, হেবা ও মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়গুলো শরিয়াহভিত্তিক ফারায়েজ ও হেবার বিধানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন কোনো পদ্ধতি বা ধারা যেন ইসলামী মিরাস ও হেবার বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের প্রতি বিলটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট আলেম ও ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শের আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক:
জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন বিধান শরিয়াহর আলোকে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। একই সঙ্গে ‘Transfer of Property (Amendment) Act, 2026’ সংসদে দ্রুত পাস করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই নিরাপত্তার নামে এমন কোনো বিধান করা যাবে না, যা আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের শরয়ী বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি করে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান:
শরিয়াহর নির্দেশনা অমান্য করার ফলে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আবারও শরিয়াহর বিধান অমান্য করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান।
‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন-২০২৬’ বাস্তবায়নযোগ্য নয় দাবি করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব বলেন, হেবাকৃত সম্পত্তির ওপর হেবাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত না হলে হেবা সম্পন্ন হবে না। আর হেবা সম্পন্ন না হলে হেবাকারী ব্যক্তির মৃত্যুর পর ওই সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য হবে। ফলে এ ধরনের জটিলতা নিয়ে আইন করা যায় না।
তিনি বলেন, আমরা সরকারের সদিচ্ছার প্রতি সুধারণা রাখছি। তবে সম্ভবত গভীরভাবে পর্যালোচনা না করেই আইনটি আনা হয়েছে। তাই সরকারকে আইনটি নিয়ে আরও পর্যালোচনা করার আহ্বান জানাই। একই সঙ্গে উলামায়ে কেরাম ও আইনবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনারও আহ্বান জানান তিনি।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ:
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-এ মুসলমানদের পারিবারিক ও সামাজিক বিধিব্যবস্থার পাশাপাশি ইসলামী শরিয়াহর সুস্পষ্ট বিধানগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, পিতা-মাতার অধিকার ও প্রবীণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য শরিয়াহর মিরাস, হেবা ও সম্পত্তি হস্তান্তরের বিধান অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। একই সঙ্গে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে আইনটি এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে মানবিক ও সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনাও সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে।
মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী:
ইসলামি শরিয়া বিশেষজ্ঞদের মতামত না নিয়ে তড়িঘড়ি করে জাতীয় সংসদে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল-২০২৬’ পাস করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তিনি দাবি করেছেন, নতুন এ আইন কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এর মাধ্যমে ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের ফারায়েজের বিধান লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, মুসলমান-প্রধান এ দেশে আলেম-ওলামাদের মতামত উপেক্ষা করে ইসলামি শরিয়াহবিরোধী কোনো আইন গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল-২০২৬ সংশোধন করতে হবে।
পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম:
তিনি বলেন, এই আইনটি নিয়ে দেশের ওলামায়ে কেরাম আপত্তি তুলেছেন এবং এটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি তৈরি হবে।
সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান (জামায়াতে ইসলামী):
তিনি বিএনপির নির্বাচনী ওয়াদার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিএনপি বলেছিল তারা কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করবে না। কিন্তু সেই কথা ভঙ্গ করে কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিরোধী এই আইন পাস করতে যাচ্ছে। ইসলামিক স্কলারদেরও এই আইনটি নিয়ে ঘোর আপত্তি রয়েছে। পিতা-মাতা সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর অনেক সময় সন্তানরা পিতামাতাকে বের করে দেয়—এটা বাস্তব এবং দুঃখজনক ঘটনা। কিন্তু এই সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ইসলামী বিধানকে পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই।’
বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আলীম:
তিনি বলেন, ‘এই আইনটি না করে কুরআনে যে বিধান রয়েছে—এক-তৃতীয়াংশের বেশি কেউ দান করতে পারবে না, সেই বিধানটি আইনে পরিণত করা দরকার। ইসলামিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই আইনে ইসলামিক স্কলারদের মতামত নেওয়া জরুরি।’
শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম:
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ বলে একটি নিয়ম থাকলেও আমি বিশ্বাস করি অধিকাংশ সংসদ সদস্য এই আইন পাসের সময় হয় বিরোধিতা করবেন, নয় চুপ থাকবেন। ইসলামিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি কাঠামো তৈরি হলে তা আমরা মেনে নিতে পারি না।"
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের (স্বতন্ত্র) সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল:
আইনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, "এই আইনটি দ্রুত পাস করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করছি, যাতে কোনো কুলাঙ্গার সন্তান দ্বারা কোনো বাবা-মা লাঞ্ছিত না হন।"
আইও/