সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ৩ রবিউস সানি ১৪৪৮


মাওলানা তামিজউদ্দীন (রহ.): এক নিভৃতচারী সাধক

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
মাওলানা তামিজউদ্দীন (রহ.)-এর নিজস্ব জায়গায় প্রতিষ্ঠিত মাদরাসার একাংশ। ছবি: সংগৃহিত

|| মাওলানা সাদ উদ্দীন ||

কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁদের কর্ম ও আদর্শ মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। তাঁদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; বরং একটি সমাজ, একটি প্রজন্ম ও একটি অঞ্চলের জন্য হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার উৎস। হযরত মাওলানা তামিজউদ্দীন (রহ.) ছিলেন কুমিল্লার দক্ষিণাঞ্চলের তেমনই একজন নিবেদিতপ্রাণ আলেমে দ্বীন। ইলম, আমল, তাকওয়া, ইসলাহী মেহনত, দাওয়াত এবং সমাজসেবার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল তাঁর কর্মময় জীবন।

দীর্ঘদিন তিনি নাঙ্গলকোটের ঐতিহ্যবাহী আফসারুল উলূম কামিল মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন। মুহাদ্দিস ও প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে মসজিদ-মক্তব প্রতিষ্ঠা, দাওয়াত ও তাবলিগসহ সামাজিক বিভিন্ন কার্যক্রমে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। নাঙ্গলকোট অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ‘বড় মাওলানা সাহেব’ ও ‘জোড়পুকুরিয়ার বড় হুজুর’ নামে পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় ছিলেন।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়:

হযরত মাওলানা তামিজউদ্দীন (রহ.) ১৯৩০ সালে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থানাধীন উত্তর জোড়পুকুরিয়া (বর্তমান কাজীজোড়পুকুরিয়া) গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম লুৎফে আলী, পিতামহের নাম আরব আলী এবং মাতার নাম রোকাব জান।

শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন। মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন আল্লাহওয়ালা ও মুত্তাকী ব্যক্তি। পিতার স্নেহবঞ্চিত শৈশব তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; বরং আল্লাহ তাআলা তাঁকে ইলম ও দ্বীনের পথে এগিয়ে দেন।

শিক্ষাজীবন:

স্থানীয় মক্তবে কুরআন কারীমের প্রাথমিক শিক্ষা লাভের মাধ্যমে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। এরপর শ্রীফলিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে মনতলী সরকারি সিনিয়র মাদরাসায় ভর্তি হন।

সেখানে জামাতে পাঞ্জুম তথা দাখিল পাস করার পর বৃহত্তর নোয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী টুমচর সিনিয়র মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে ফাজিল তথা জামাতে উলা পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। এরপর ফেনী আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে কামিল তথা টাইটেল ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন পরিশ্রমী ও মুত্তাকী এবং ইলমের প্রতি অনুরাগী। তাঁর ইলম অর্জনের আগ্রহ এবং আমল-আখলাক তাঁকে উস্তাদ ও সহপাঠীদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত করে তোলে।

বরেণ্য আলেমদের সান্নিধ্য:

তৎকালীন ফেনী আলিয়া মাদরাসা ছিল উপমহাদেশের বহু বরেণ্য আলেমের পদচারণায় সমৃদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান। বিশেষত শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর বহু খলিফা ও শাগরিদ সেখানে দ্বীনি খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন।

মাওলানা তামিজউদ্দীন (রহ.)-এর উল্লেখযোগ্য উস্তাদদের মধ্যে ছিলেন ফেনী আলিয়ার সাবেক প্রিন্সিপাল আল্লামা ওবায়েদুল হক (রহ.), হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর বিশিষ্ট খলিফা হযরত মাওলানা দিলাওয়ার হুসাইন (রহ.) (ফেনুয়ার হযরত), হযরত মাদানী (রহ.)-এর বিশিষ্ট খলিফা হযরত মাওলানা মুহিব্বুর রহমান (রহ.) এবং টুমচর আলিয়ার সাবেক প্রিন্সিপাল ও মাদানী (রহ.)-এর সুযোগ্য শাগরিদ হযরত মাওলানা আলী আহমদ (রহ.)।

বরেণ্য উলামায়ে কেরামের এই সান্নিধ্য তাঁর চিন্তা, আদর্শ ও কর্মজীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। সরকারি মাদরাসায় দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেও তিনি ‘মাসলাকে দেওবন্দ’ তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আদর্শের ওপর খুবই অটল ছিলেন।

শিক্ষকতা:

ফেনী আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল পাস করার পর মাওলানা তামিজউদ্দীন (রহ.) নাঙ্গলকোট আফসারুল উলূম কামিল মাদরাসায় সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে তিনি সেখানে অধ্যাপনা করতে থাকেন।

পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী ভুলুয়াপাড়া গ্রামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হলে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষিত সমাজ ও মাদরাসা কমিটির অনুরোধে তিনি সেখানে প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর নাঙ্গলকোট মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অনুরোধে পুনরায় সেখানে মুহাদ্দিস হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন।

১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে হাদীস, তাফসীর, ফিকহ, নাহু-সরফ, মানতিক ও বালাগাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কিতাব পাঠদান করেন। একই সঙ্গে তিনি সিনিয়র মুহাদ্দিস ও প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষত নাহু-সরফ ও ফিকহে তাঁর গভীর জ্ঞান ও অসাধারণ পাঠদানের দক্ষতার কথা তাঁর ছাত্রদের মাঝে আজও স্মরণীয়।

জনকল্যাণে নিবেদিত এক আলেম:

মাওলানা তামিজউদ্দীন (রহ.) ছিলেন নাঙ্গলকোটের সর্বস্তরের মানুষের আস্থাভাজন। দলমত-নির্বিশেষে মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করত। তিনি মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াতেন এবং সামাজিক ও মানবিক কাজে সাধ্যানুযায়ী সহযোগিতা করতেন। একসময় তিনি নাঙ্গলকোট থানার কেন্দ্রীয় শাহি ঈদগাহের খতীব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

এলাকার বিভিন্ন মসজিদ ও ঈদগাহে তিনি ইমাম ও খতীবের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে নিজস্ব আদর্শ ও আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকীদা অনুযায়ী দ্বীনি পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি নিজ এলাকায় পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত জমিতে মসজিদ, মক্তব ও ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে ইমামতি করেন এবং সাবাহী মক্তবে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্কদের কুরআন কারীম ও দ্বীনের মৌলিক শিক্ষা প্রদান করেন।

কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন:

একটি খালিস কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম স্বপ্ন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন এবং মৃত্যুর আগে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য একখণ্ড জমি দান করে যান।

পরবর্তীতে তাঁরই সুযোগ্য দুই সন্তান মুফতী মুহিব্বুদ্দীন (রহ.) ও মাওলানা সাদ উদ্দীন তাঁর মাকবারা সংলগ্ন স্থানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর স্বপ্নের সেই প্রতিষ্ঠান আজও এলাকায় দ্বীনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

ইসলাহী জীবন ও আত্মশুদ্ধির সাধনা:

ইলমের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি ও ইসলাহের প্রতিও তাঁর বিশেষ মনোযোগ ছিল। জীবনের প্রথম দিকে তিনি ফেনী আলিয়ার সাবেক প্রিন্সিপাল আল্লামা ওবায়েদুল হক (রহ.)-এর সঙ্গে ইসলাহী সম্পর্ক স্থাপন করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর ফিদায়ে মিল্লাত হযরত মাওলানা আসআদ মাদানী (রহ.)-এর সঙ্গে ইসলাহী তাআল্লুক গড়ে তোলেন।

১৯৯৭ সালে ঢাকা চৌধুরীপাড়া মাদরাসার মসজিদে ফিদায়ে মিল্লাত (রহ.) ইতিকাফে বসলে মাওলানা তামিজউদ্দীন (রহ.)-ও তাঁর সান্নিধ্যে ইতিকাফে অংশগ্রহণ করেন।

এছাড়া তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ঢাকা তেজগাঁও ডি.এল.আর জামে মসজিদের সাবেক খতীব হযরত মাওলানা আবদুস সাত্তার (রহ.)-এর সহ প্রতিবছর রমজান মাসে কুমিল্লা সদর দক্ষিণের বাটপাড়া গ্রামের কেন্দ্রীয় মসজিদে ইতিকাফ করতেন। সেখানে সালেকীনের একটি বড় জামাতও তাঁদের সঙ্গে ইতিকাফে বসত। তিনি ও মাওলানা আবদুস সাত্তার (রহ.) সালেকীনদের উদ্দেশ্যে নিয়মিত বয়ান করতেন।

দাওয়াত ও তাবলিগের ময়দানে:

দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা ছিল। দ্বীনের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি দেশ-বিদেশে সফর করেন। ভারত ও পাকিস্তানেও তিনি দাওয়াত ও তাবলিগের উদ্দেশ্যে সফর করেছেন এবং সময় পেলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ছুটে যেতেন।

তিনি দু’বার হজ পালন করেন। প্রথমবার ১৯৮্য সালে এবং দ্বিতীয়বার ১৯৯৩ সালে। দ্বিতীয় সফরে উমরার উদ্দেশ্যে গিয়ে পুরো রমজান মাস হারাম শরীফে ইতিকাফ করেন। পরবর্তীতে হজ পালন করে দেশে ফিরে আসেন।

উত্তরসূরিদের মাঝে দ্বীনি উত্তরাধিকার:

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে ও চার মেয়ে রেখে যান। মাওলানা তামিজউদ্দীন (রহ.) যদিও আজীবন আলিয়া মাদরাসায় পড়িয়েছেন, কিন্তু তিনি দেওবন্দী তথা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মাসলাক ও মতের ওপর খুবই অটল ছিলেন। তাই সন্তানদের কওমী মাদরাসায় পড়িয়েছেন। তাঁর সন্তান-সন্ততি ও উত্তরসূরিদের মধ্যে অনেকে হাফেজ, আলেম, মুফতী, মুহাদ্দিস, সমাজসেবক, লেখক ও গবেষক হিসেবে দ্বীনের বিভিন্ন অঙ্গনে খেদমত করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তাঁরা তাঁর রেখে যাওয়া দ্বীনি উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এটিও তাঁর জীবনের এক অনন্য সাফল্য। তিনি শুধু নিজে দ্বীনের খেদমত করেননি, বরং পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও দ্বীনের খেদমতের ধারাটি রেখে গেছেন।

ইন্তেকাল:

দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পর রবিবার ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ ভোরে ৭৪ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। শেষ মুহূর্তে তিনি কালিমায়ে তাইয়্যেবা জিকির করতে করতে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

ঐ দিন বিকেল ৩টায় তাঁর নিজ বাড়ি সংলগ্ন মাঠে বিশাল নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন তাঁর বড় সাহেবজাদা মুফতী মুহিব্বুদ্দীন (রহ.)। জানাজায় বিপুলসংখ্যক উলামায়ে কেরাম, ছাত্র-শাগরেদ ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। পরে তাঁকে তাঁর নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত জামে মসজিদ সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

স্মৃতিতে অম্লান এক মহান সাধক:

আব্বাজান হযরত মাওলানা তামিজউদ্দীন (রহ.) আজ আমাদের মাঝে নেই; কিন্তু তাঁর ইলম, আমল, শিক্ষা ও দ্বীনি খেদমতের স্মৃতি আজও নাঙ্গলকোটের মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মসজিদ ও মক্তব, তাঁর ছাত্র-শাগরেদ এবং তাঁর উত্তরসূরিদের দ্বীনি খেদমত তাঁর জীবনের সফলতার সাক্ষ্য বহন করছে।

একজন আলেমের প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল তাঁর লিখিত বই বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তাঁর দ্বারা গড়ে ওঠা মানুষ, তাঁর শেখানো ইলম এবং তাঁর রেখে যাওয়া নেক আমলের ধারাই তাঁর সবচেয়ে বড় স্মারক এবং সেটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। সে বিচারে মাওলানা তামিজউদ্দীন (রহ.)-এর জীবন ছিল নাঙ্গলকোটের দ্বীনি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল নেক আমল কবুল করুন, কবরকে নূরে ভরপুর করুন, তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে উচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর রেখে যাওয়া দ্বীনি খেদমতের ধারাকে কিয়ামত পর্যন্ত জারি রাখুন। আমিন।

লেখক: হযরতের মেজো সাহেবজাদা। সভাপতি, খিদমাতুল ইসলাম পরিষদ নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা। মুহতামিম, খোলাফায়ে রাশেদীন ইসলামিয়া মাদরাসা নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ