বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ ।। ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১৮ জিলহজ ১৪৪৭

শিরোনাম :

পাকিস্তানে মাদরাসায় ভর্তিচ্ছুরা প্রতারকদের থেকে বাঁচবেন যেভাবে

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| মুহাম্মদ রিদওয়ান সিরাজ কলামুড়ি ||

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও দ্বীনি ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে পাড়ি জমাচ্ছেন। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন প্রতারক (দালাল) চক্রের খপ্পরে পড়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাদের অনেকেই স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে আসলেও যাত্রার শুরুতেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

প্রতারক চক্রের কৌশল সাধারণত একই রকম। প্রথমে তারা শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে বলে, “মাত্র ৪০ হাজার টাকার মধ্যেই সব কাজ সম্পন্ন করে দেওয়া হবে, আপনাকে কোনো ঝামেলায় পড়তে হবে না।” এরপর অগ্রিম হিসেবে অর্ধেক টাকা নিয়ে ভিসার প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করে। দূতাবাসে সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হওয়ার পর সাধারণত জানানো হয় যে ভিসা এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে পাওয়া যাবে।

কিন্তু আবেদনকারীর নিজের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করে প্রতারকদের অ্যাকাউন্ট থেকে আবেদন করানো হয়। ফলে ভিসা সংক্রান্ত সকল বার্তা তাদের কাছেই পৌঁছায়। পরে শিক্ষার্থীকে বলা হয়, “ভিসা আসতে অনেক সময় লাগবে। যদি দ্রুত পেতে চান, তাহলে আরও ১৫ হাজার টাকা দিতে হবে। দূতাবাসে পরিচিত লোক আছে, ব্যবস্থা করে দিতে পারব। তবে বিষয়টি কাউকে জানাবেন না।”

বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন ও আবেগের কারণে অনেকেই অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হন। এভাবে শুধুমাত্র ভিসার পেছনেই ৫৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় আরেক ধাপের প্রতারণা। প্রতারকরা অনুরোধ করে, “এত কাজ করে দিয়েছি, টিকিটটাও আমাদের মাধ্যমেই কাটুন।” নতুন শিক্ষার্থীরা অভিজ্ঞতার অভাবে তাদের মাধ্যমেই টিকিট কাটেন, আর সেখান থেকেও নেওয়া হয় অতিরিক্ত অর্থ।

এরপর নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভিসা প্রসঙ্গে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা পূর্বের ভুক্তভোগীদেরই ‘রেফারেন্স’ হিসেবে ব্যবহার করে। যেহেতু তারা একই মাদ্রাসার ছাত্র বা পরিচিত ব্যক্তি, তাই অনেকেই সহজে বিশ্বাস করে বসেন। একজনের কাজ তুলনামূলক ভালোভাবে সম্পন্ন করে তাকে দিয়েই নিজেদের প্রচারণা চালায়।

অথচ বাস্তবতা হলো, পাকিস্তানের অধিকাংশ দ্বীনি মাদারিসের শিক্ষার্থী ভিসার সরকারি ফি সাধারণত ৩৫ থেকে ৫৫ মার্কিন ডলারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যা বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ৫ থেকে ৭ হাজার টাকার বেশি নয়।

পাকিস্তানে এসে যখন বিভিন্ন শিক্ষার্থী নিজেদের খরচের হিসাব একে অপরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন, তখন অনেকেই বিস্মিত হয়ে জানতে পারেন যে কেউ মাত্র কয়েক হাজার টাকায় কাজ সম্পন্ন করেছেন, আবার কেউ একই কাজের জন্য কয়েক গুণ বেশি অর্থ দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললে অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা হুমকি দিয়ে বলে “আপনার পাসপোর্ট, ঠিকানা ও ব্যক্তিগত তথ্য আমাদের কাছে আছে। কোথাও কিছু বলবেন না।”

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এমন ৮ থেকে ৯ জন ভুক্তভোগী রয়েছেন, যারা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি।

তাই যারা ভবিষ্যতে পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষা বা দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে আসতে চান, তাদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ— আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। সম্ভব হলে পূর্বপরিচিত, বিশ্বস্ত ব্যক্তি অথবা ইতোমধ্যে পাকিস্তানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ভিসা প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য খরচ এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পর্কে আগেই বিস্তারিত জেনে নিবেন।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তানে আসার পূর্বেই কোন মাদ্রাসা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবেন তা নিশ্চিত করে নিন। অন্যথায় পাকিস্তানে পৌঁছানোর পর কোথায় যাবেন এবং কীভাবে ভর্তি হবেন— এ নিয়ে চরম ভোগান্তি ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

প্রতারণার বিরুদ্ধে সচেতনতাই বড় প্রতিরোধ। নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিন এবং নতুন শিক্ষার্থীদের সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন। আপনার সামান্য সচেতনতাই হয়তো আরেকজন শিক্ষার্থীকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ও প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

লেখক: জামিয়া বিনুরিয়া আলামিয়া, করাচি, পাকিস্তান।


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ