শনিবার, ৩০ মে ২০২৬ ।। ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১৩ জিলহজ ১৪৪৭


পাক মুলুকে আমাদের ঈদ সমাচার

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| আব্দুল্লাহ আফনান ||

সুখ দুঃখের মিশ্রণে ঈদের দিনখানা কেটে গেল। বাড়ি ছেড়ে এটা আমার প্রথম কুরবানি ঈদ না হলেও, দেশ ছেড়ে এই প্রথম। মন খারাপকে সাধারণত আমি পাত্তা দিই না, তবুও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা বেশ মুশকিল। মাঝেমধ্যে মনটা বলা-কওয়া ছাড়াই হুটহাট বিষণ্ন হয়ে যায়।

বিদেশে আসলে অধিকাংশ বাঙালির পরদেশের সবকিছু ভালো লাগে। নিজের দেশকে মনে হয় ব্যাকটেডেট। দেশকে গালি দিতে দিতে পরম মুগ্ধতা নিয়ে তারা পরদেশের সংস্কৃতি দেখে। একজন বাঙালি হিসেবে এই মুদ্রাদোষ থেকে আমিও পুরোপুরি মুক্ত নই, তবুও মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে আমি ঝগড়া বাঁধিয়ে দিই। পানি ঢেলে দিই তাদের অতি মুগ্ধতায়। বলতে চাচ্ছি ঈদের জামাতের কথা।

আমাদের দেশে ঈদের জামাত হয় বেশ দেরিতে। শহরে কিছু ব্যতিক্রম হতে পারে, গ্রামে গঞ্জে অধিকাংশ জায়গায় সকাল আটটা নয়টার আগে কল্পনা করা যায় না। ইমাম সাহেব কখনো সময় আগানোর প্রস্তাব উঠালে মসজিদে হট্টগোল বেঁধে যায়।

করাচিতে দেখলাম ব্যতিক্রম। কে কার আগে নামাজ পড়তে পারে—এমন প্রতিযোগিতা চলে যেন। আমাদের জামিয়ায় (জামিয়া উলুমিল ইসলামিয়া বিনুরি টাউন) জামাত ছিল ৬:৪৫ মিনিটে। করাচিতে বর্তমানে ইশরাকের সময় হয় ৫:৫২ মিনিটে, অর্থাৎ ওয়াক্ত আসার প্রায় ঘন্টাখানেক পর। কিন্তু আশপাশের অন্যান্য মসজিদে আরো অনেক আগে জামাত হয়ে যায়। কোনো কোনো মসজিদে ওয়াক্ত আসার সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে যায় জামাত। ব্যাপারটা প্রশংসনীয়। প্রবাসী বাপ-চাচাদের সুবাদে জানি, সৌদি আরবেও ওয়াক্ত আসার সঙ্গে সঙ্গে জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামও আমাদের উৎসাহিত করে ভোরে ভোরে নামাজ পড়ে নিতে। বিশেষত কুরবানি ঈদে।

***

ঈদের দিন সেমাই, নুডলস, পায়েস ইত্যাদি নাস্তার বাহার আমাদের ঈদ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের জামিয়া ছাত্রদের সবসময় নিজেদের সন্তান মনে করেন। পরিপূর্ণ না হলেও ছাত্ররা যেন একেবারে বঞ্চিত না হয় সেজন্য ঈদের দিন নাস্তা হিসেবে ছিল সেমাই, কিমা ও চা-রুটি। এমনিতে প্রতিদিনই বাদ ফজর নাস্তার ব্যবস্থা থাকে। ঈদের দিন কাজ অনেক। তাই স্পেশাল নাস্তার এই আয়োজন ছিল ফজরের পূর্বে।

ঈদের রাতে দেরি করে ঘুমানোর বদভ্যাস আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে পড়ছে। রাতে বেশ দেরি করে ঘুমিয়েছি তাই ফজরের পূর্বে উঠতে পারিনি। ফজরের পর 

‘একঘন্টা’ সময়, তাই পুনরায় ঘুম দিই। নামাজের তিন মিনিট আগে একজন এসে ডাক দেয়— ভাই নামাজে যাবেন না?

আমি দৌড়ে অজু করে নামাজে অংশ নিই। নামাজ শেষ হতেই মনটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে যায়। মনে পড়ে মায়ের ধমকের কথা, জামাতের আধাঘন্টা আগে শুরু হয়ে যেত ডাকাডাকি, চিল্লাচিল্লি। খালি মুখে বের হবার প্রশ্নই আসে না। ৫ মিনিট থাকলেও মুখে কয়েক লোকমা সেমাই, নুডলস পুরে দিতেন। আমার পেটে তখন প্রচণ্ড ক্ষুধা। চোখের সামনে সেমাই, নুডলস, পায়েশ, পিঠা ভাসছিল। মায়ের ঘর্মাক্ত মুখখানিও ভেসে উঠছিল বারবার। বাড়ি থাকলে কখনো সপ্তাহে একদিনও নুডলস মিস হতো না, অথচ প্রায় আড়াইমাসে এক চিমটি নুডলস আমারে পেটে পড়েনি। জীবন কত বৈচিত্র্যময়!

কিছুক্ষণ জিম মেরে বসে থাকার পর খবর আসে দ্রুত নিচে যেতে হবে। জামিয়ায় চামড়া কালেকশনের দায়িত্বের নির্ধারিত জায়গায়। দারুল উলুম করাচি, হক্কানিয়া, জামিয়া ফারুকিয়াসহ পাক মুলুকের বহু মাদরাসায় চামড়া কালেকশন নেই। ঈদের আগেই ছুটি হয়ে যায়। আমাদের জামিয়ায় ব্যাপকভাবে কালেকশন হয়। বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই, এতটুকু যে, আমাদের দেশের প্রচলিত কালেকশনের মতো নয়। (যেটাকে হাল যামানার অনেকেই যিল্লতির কালেকশন বলে অভিহিত করে।) কাজ মূলত লেবাররাই করে। ছাত্রদের কাজ কেবল তদারকি, চামড়ার হিসাব রাখা, কতগুলো আসল, কতগুলো কোম্পানিতে পাঠানো হলো। আশেপাশে কোথাও হলে থলি দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে আসা। ব্যস। এর মধ্যে আবার ঠান্ডা পানি, শরবত এমনকি জামিয়ার পক্ষ থেকে কিছু ‘জেব খরচা’ও থাকে।

***

আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল বসে থাকা। তবে আমাদের বাঙালি চামড়া করাচির চল্লিশ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় অভ্যস্ত না। ফলে এটাও আমাদের জন্য অসহ্য ঠেকছিল। আমি এক ফাঁকে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

দুপুর বারোটার দিকে খাবার দেয়। রুটি ও কিমা দেখে পুনরায় মনটা খারাপ হলো। স্বাদ যাইহোক অন্তত জঠর জ্বালা তো নিবারণ হবে। যতদূর সম্ভব খেলাম।

জোহরের নামাজের পর খবর পেলাম ‘গায়রে মুলকি’ (বিদেশি) ছাত্রদের গরুর গোশত দিচ্ছে। নগদ জবাই করা তাজা গোশত। সেখানে গিয়ে দেখলাম মাতবাখ থেকে রান্না করা গোশতও দেওয়া হচ্ছে। পেটের ভেতর খিদে মোচড় দিয়ে উঠল। কাঁচা ও পাকানো উভয় গোশত নিয়ে রুমে ফিরলাম। মন ভরে কুরবানির গরুর গোশতের স্বাদ আস্বাদন করলাম।

গোশত খেয়ে উদর পূর্ণ করে বিছানায় কেবল গা এলিয়েছি, এমন সময় রুমের আফগানি সাথী দাওয়াত দিলো সেমাইয়ের। সকালের সেই সেমাই। খেতে খেতে নানান গল্প হলো আফগানি সঙ্গীর সাথে। কেন জানি না, মনটা আনন্দে ভরে গেল। আমাদের মন শিশুর মতো কিংবা বলা যায় আমাদের দেহখানি আকারে বড় হলেও মনটা শিশুই থেকে যায়। কত তুচ্ছ কারণে মন বিষণ্ন হয়ে পড়ে আবার কত সহজেই তা আনন্দে বিমোহিত হয়ে যায়!

লেখক: শিক্ষার্থী, উলূমুল হাদীস, জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া নিউটাউন করাচি

আইও


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ