fbpx
           
       
           
       
ধরণ পাল্টে ভয়াবহ রূপে যৌতুক; বিলুপ্ত হচ্ছে না কেনো?
আগস্ট ০৬, ২০২২ ১২:০৫ অপরাহ্ণ

।। আতাউর রহমান খসরু ।।

দৃশ্য-১ : হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে রীতা। ডাক্তারি পরীক্ষায় দেখা গেলো তার একটি কিডনি নেই। অথচ রীতা এর কিছুই জানেন না।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো, যৌতুকের টাকা না পেয়ে তার স্বামী এবি সরকার দুই বছর আগে অ্যাপেনডিক্স অপারেশনের নামে অভিনব প্রতারণার ফাঁদে ফেলে রীতাকে। অসৎ চিকিৎসকের সহায়তায় তার একটি কিডনি বিক্রি করে দেয় পাষণ্ড স্বামী।
[সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮]

দৃশ্য-২: দুপুরে স্কুল থেকে ফিরেছে মীনা। তার প্রচণ্ড ক্ষুদা লেগেছে। তাই গেটের বাইরে থেকে মাকে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকে সে। চিৎকার দিয়ে ওঠে মীনা। তার মা ফ্যানের সাথে ঝুলছে।

প্রতিবেশীরা উদ্ধার করে সাভার এনাম মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশের দাবি মীনার মাদকাসক্ত বাবা আলী আকবর যৌতুক না পেয়ে তার মাকে শ্বাসরোধ হত্যা করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে পালিয়ে যায়।
[সূত্র : ১০ মার্চ ২০১৮, বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম]

দৃশ্য-৩: আবুল কাসেম সরদার। একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তিনি খুলনার পৈতৃক ভিটা বিক্রির করে দিয়েছেন। কেননা তাকে মেয়ের ঘর সাজিয়ে দিতে হবে। তিনি চিন্তিত পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া ১০ লাখ টাকায় মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করতে পারবেন কিনা?

আবুল কাসেম সরদারের মেয়ে একজন উচ্চশিক্ষিতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামী সাবজেক্টে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন। মেয়ের জামাইও উচ্চশিক্ষিত এবং কোনো এক মন্ত্রণালয়ের সরকারি ইঞ্জিনিয়ার।

এ তিনটি দৃশ্য আমাদের সমাজের ৩ স্তরের। উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন। অর্থাৎ সমাজের সবস্তরে এখনও সমানভাবে মেয়ে পরিবারকে নিজের সাধ্য বা সাধ্যের বেশি কিছু দিয়ে মেয়ের জামাইকে সন্তুষ্ট করতে হচ্ছে।

যদিও তা স্তরভেদে চলছে ভিন্ন ভিন্ন নামে। কোথাও যৌতুক নামে, কোথাও ঘর সাজানোর নামে আবার কোথাও উপহার নামে। যৌতুক বিরোধী কঠোর আইন করেও কোনোভাবে তা রোধ করা যাচ্ছে না।

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে যৌতুকের যে প্রথা রয়েছে তা মূলত এ অঞ্চলের বিধর্মীয় উত্তরাধিকার। উপমহাদেশের মানুষ ইসলাম ধর্মগ্রহণের পূর্বে হাজার ধরে এ অঞ্চলে হিন্দু ধর্ম আচরিত হয়ে আসছে। হিন্দু ধর্মমতে নারী পিতার উত্তরাধিকার পায় না। পায় যৌতুক।

তাই স্বামী বিয়ের সময় সর্বোচ্চ সুবিধা লাভের চেষ্টা করে। হিন্দু সমাজে এ নিয়ম এখনও বহাল রয়েছে।

হাজার বছরের ঐতিহ্য ও হিন্দু প্রতিবেশের কারণে ভারতীয় মুসলিম সমাজেও কমবেশি যৌতুকের প্রচলন রয়েছে। এখনও মুসলিম নারীরা পিতার উত্তরাধিকার গ্রহণকে দোষণীয় মনে করে এবং স্বামীরা শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু না কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা করে।

একইভাবে ভাই বোনকে পিতার উত্তরাধিকার দেয়ার প্রয়োজন মনে করে না। শরিয়ত প্রদত্ত উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়াও যৌতুক প্রথা টিকে থাকার অন্যতম কারণ।

বিশিষ্ট গবেষক ও আলেম ড. শামসুল হক সিদ্দিক মনে করেন, উত্তরাধিকার থেকে নারীর বঞ্চিত হওয়াই যৌতুক প্রথা টিকে থাকার একমাত্র কারণ নয়। বরং তার মূল কারণ সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া।

তিনি বলেন, ইসলাম নারীকে যে মর্যাদা প্রদান করেছে তা সমাজের সবশ্রেণির মানুষের সামনে আমরা তুলে ধরতে পারি নি বলেই বাঙালি মুসলিম সমাজ থেকে যৌতুক নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।

আমাদের সমাজের ধারণা পুরুষের তুলনায় নারী কম মূল্যবান বা অনেকটা মূল্যহীন তাই নারীকে মূল্যবান হওয়ার জন্য যৌতুকের প্রয়োজন হয়। উপমহাদেশের বাইরে অন্য কোথাও মুসলিম সমাজে যৌতুকের প্রথা নেই।

আমি মালয়েশিয়া, তুরস্ক, লিবিয়ায় ছিলাম সেখানে যৌতুকের প্রচলন নেই। বরং আরবরা নারীকে উচ্চ মহর দিয়ে বিয়ে করে।

তবে ড. শামসুল হক সিদ্দিক মনে করেন, সমাজ থেকে যৌতুকের প্রকোপ কমেছে। আর তা সম্ভব হয়েছে, নারীর শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে। নারীর শিক্ষা ও সচেতনা বৃদ্ধি পেলে এবং কুরআনে বর্ণিত নারীর অধিকার যথাযথভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারলে যৌতুক প্রথার বিলুপ্তি সম্ভব।

ইসলামের নির্দেশনা হলো নারী পিতা ও নিকটাত্মীয়ের থেকে উত্তরাধিকার পাবে। বিয়ের সময় তাকে পিতার পরিবার থেকে কোনো কিছু সন্তুষ্টি চিত্তে দিলে তা গ্রহণ করবে এবং না দিলে কোনো কিছু দাবি করতে পারবে না।

স্বামী বা স্বামীর পরিবার স্ত্রীর পরিবার থেকে জোরপূর্বক কোনো কিছু আদায় করলে তা যৌতুক হিসেবে গণ্য। ইসলামি শরিয়তে যৌতুক নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ আত্মসাৎ কর না।’ [সুরা নিসা : ২৯]

হাদিসে শরিফে এসেছে, সাবধান! তোমরা অবিচার কর না, সাবধান! তোমরা অবিচার কর না, সাবধান! তোমরা অবিচার কর না। নিশ্চয় কোনো ব্যক্তির সন্তুষ্টি ব্যতীত তার সম্পদগ্রহণ বৈধ নয়। [জামিউল আহাদিস, হাদিস নং ২৫৭৬৫]

উল্লিখিত হাদিসের কারণেই কোনো ব্যক্তি শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনো কিছু চেয়ে নিলে যেমন তা যৌতুক হয়, তেমন সামাজিক চাপে পড়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছু দিলেও তা যৌতুক বলে গণ্য হবে।

দেশের শীর্ষ ফিকহবিদ ও ইসলামি ব্যক্তিত্ব মুফতী দেলোয়ার হুসাইন বলেন, ‘চেয়ে নিলে তা যেমন যৌতুক। সামাজিক চাপে পড়ে দেয়া জিনিসপত্রও যৌতুক হবে। কেননা এর কোনোটাই সন্তুষ্টির সঙ্গে দেয়া হয় নি। তাছাড়া ‘সামাজিক চাপ’ কুসংস্কার। যা মাকরুহ তাহরিমি তুল্য। পরিহার করা ওয়াজিব।’

তবে স্বামী বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার চাপ, প্রত্যাশাপূর্ণ ইঙ্গিত ও সামাজিক রীতির কারণে না দিয়ে যদি স্ত্রীর পরিবার কোনো কিছু প্রদান করে তবে তা গ্রহণ করা বৈধ।

কেননা রাসুল সা. বলেছেন, ‘চাওয়া বা ইঙ্গিত ছাড়া আল্লাহ যা তোমাকে দান করেছেন তা ‍তুমি গ্রহণ কর। অতপর তা সম্পদ হিসেবে রেখে দাও বা দান কর। আর যা তোমার পেছনে পড়ে নি তুমি তার পেছনে পড় না। [সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং ২৬০৪]

মেয়ের বাড়ি থেকে প্রদত্ত উপহার সামগ্রিকে স্বামী তার প্রাপ্য মনে করে এবং যাচ্ছে-তাইভাবে খরচ করে। অনেক সময় প্রয়োজন দেখা দিলে স্ত্রীর অনুমতি ব্যতীত বিক্রিও করে দেয়।

কিন্তু ইসলামের নির্দেশনা হলো স্ত্রীর আত্মীয়-স্বজন তাকে যা উপহার দিবে যেসব জিনিস ও সম্পদের উপর একক অধিকার কেবল স্ত্রীর। তাই স্বামী স্ত্রীর অনুমতি ব্যতীত ব্যবহারও করতে পারবে না। [মুসলিম বর-কনে ইসলামি বিয়ে, মোহর অধ্যায়]

উপমহাদেশের বিয়ের ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের যৌতুকের প্রতিকার হিসেবে উচ্চহারে মোহর নির্ধারণের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। অধিকাংশ নারীর ভবিষ্যত তথা বৈবাহিক জীবনের নিরাপত্তার অজুহাতে উচ্চহারে মোহর নির্ধারণ করা হয়। যা যৌতুকতুল্য অন্যায়।

উচ্চহারে মোহর নির্ধারণের সময় মেয়েপক্ষকে বলতেও শোনা যায় এটা আদায় করতে হবে না।

কিন্তু মেয়ের নিরাপত্তার বিষয়টি তো উপেক্ষা করা যায় না? অর্থাৎ মেয়ে এবং ছেলে কোনো পক্ষ এ মোহর আদায় করাকে প্রয়োজন মনে করে না। অথচ মোহর আদায়ের উপর নির্ভর করে পুরুষের জন্য নারীর সংশ্রব-সম্ভোগ বৈধ হওয়া না হওয়া।

হাকিমুল উম্মাত হজরত আশরাফ আলি থানবি রহ. বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যদি মোহর আদায় করাকে প্রয়োজন মনে না করে এবং তা আদায় না করে মারা যায় তবে সে ব্যভিচারী বলে গণ্য হবে।’ [মুসলিম বর-কনে ইসলামি বিয়ে, মোহর অধ্যায়]

বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের ইফতা বিভাগের প্রধান মুফতি- মুফতি এমানুল হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘পুরুষের সাধ্য ও নারীর পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা সামনে রেখে মোহর নির্ধারণ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে পুরুষের সাধ্যের বাইরে মোহর নির্ধারণ করা উচিৎ নয়।

বর্তমান সমাজে যেভাবে উচ্চহারে মোহর নির্ধারণ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। যারা স্বামীকে উচ্চহারে মোহর প্রদানে বাধ্য করছেন তারা অন্যায় করছেন।’

তবে স্বামী বাধ্য হয়ে উচ্চ মোহরে রাজি হলেও তাকে তা আদায় করতে হবে বলে মত দেন এ মুফতি।

উচ্চ মোহর নির্ধারণে সমাজের যুক্তি নারীর ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। কিন্তু হাদিসের ভাষায় পুরুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মোহর নির্ধারণ নারীকে আরও বেশি অনিরাপদ করে তোলে।

ইরশাদ হয়েছে, মোহরের ক্ষেত্রে সহজতা অবলম্বন কর। কেননা পুরুষ নারীকে অধিক মোহর দেয় এবং তাতে পুরুষের মনে নারীর প্রতি শত্রুতা জন্ম নেয়। [কানজুল উম্মাল, খণ্ড-৮, পৃষ্ঠা-২৪৯]

একইভাবে পুরুষের জন্যও উচিৎ নয় প্রদর্শন ও মিথ্যা অহমিকার শিকার হয়ে উচ্চ মোহরের বোঝা মাথায় চাপিয়ে নেয়া।

রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘কোনো মুমিনের উচিৎ নয় নিজেকে অপদস্থ করা। সাহাবায়ে কেরাম রা. জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে নিজেকে অপদস্থ করে? তিনি বললেন, সাধ্যাতীত বিপদ নিজের উপর চাপিয়ে নেয়া।’[সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২২৫৪]

তাহলে বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা কী? ইসলামের নির্দেশনা হলো, ছেলে ও মেয়ে উভয় পক্ষই অপচয়, অপব্যয় ও পরস্পরের উপর চড়াও হওয়া থেকে বিরত থাকবে।

রাসুল সা. বলেছেন, ‘নিশ্চয় (আল্লাহর নিকট) সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে সেটিই যা তার খরচ সবচেয়ে কম।’

কেএল/

সর্বশেষ সব সংবাদ