শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬ ।। ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ২৫ মহর্‌রম ১৪৪৮


পাত্রী দেখার আড়ালে এক নীরব জুলুম

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

|| সাকিব মাহবুব ||

বিয়ের আগে প্রায় দুই বছর ধরে বিভিন্নভাবে নিজের জন্য পাত্রী দেখা হয়েছিল। এই সময়ে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে, তিক্ত কিছু বিষয়ও সামনে এসেছে। একসময় এতটাই নিরাশ হয়ে গিয়েছিলাম যে, মনে হয়েছিল, হয়তো আর ভালো কিছু হবে না। তবুও এই দীর্ঘ সময়ে আমি একটি সিদ্ধান্ত থেকে কখনো সরে আসিনি–কোনো মেয়েকে অযথা সরাসরি গিয়ে না দেখা। মাহরামের মাধ্যমে ছবি দেখেছি, প্রয়োজনীয় তথ্য জেনেছি। সর্বশেষ সবকিছু যাচাই-বাছাই করে যখন সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত, তখনই একজনকে সরাসরি দেখতে গিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, তাকেই বিয়ে করেছি।

কেনো আমি একাধিক জায়গায় গিয়ে পাত্রী দেখিনি? সেই প্রশ্নের উত্তরই মূলত এই আলোচনার ভিত্তি।

ভূমিকা না বাড়িয়ে মূল কথায় আসি। লেখাটি কিছুটা দীর্ঘ হলেও অনুরোধ থাকবে, ধৈর্য নিয়ে পড়ার। লাইক, কমেন্ট কিংবা ক্রেডিট দেওয়ারও দরকার নেই। তবে প্রচুর মানুষের কাছে এই আলোচনাটা পৌঁছানো চাই। তাই কেউ চাইলে শেয়ার করুন, কেউ কপি-পেস্ট করুন। উদ্দেশ্য একটাই—একটি প্রয়োজনীয় সচেতনতার কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এর উত্তম প্রতিদান আপনিও পাবেন ইনশাআল্লাহ।

পাত্রী দেখার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে পাত্রপক্ষ এমন একটি অন্যায়ের চর্চা করে আসছে, যা ধীরে ধীরে রীতির মর্যাদা পেয়ে গেছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, অধিকাংশ মানুষ এটিকে অন্যায় বলেও মনে করেন না। অথচ সামান্য নিরপেক্ষভাবে ভেবে দেখলেই বুঝে আসে, এটি কেবল একটি সামাজিক রীতি নয়; বহু ক্ষেত্রে এটি নীরব জুলুম।

পাত্রী দেখার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নিয়ম কী হওয়া উচিত?

প্রথমে মেয়ের দ্বীনদারিতা, চরিত্র, পরিবার, মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন—সবকিছু সম্পর্কে নির্ভরযোগ্যভাবে খোঁজ নেওয়া। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে যদি মনে হয় বিষয়টি সামনে এগোনোর মতো, তাহলে পরিবারের মহিলা সদস্যদের মধ্যে এক দু'জন গিয়ে মেয়েকে দেখে আসবেন। এরপর সবকিছু ইতিবাচক থাকলে ছেলেও যাবে। আর তারও আগে মেয়েপক্ষ ছেলের সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে, বুঝে, আগ্রহ প্রকাশ করবে। অর্থাৎ উভয় পক্ষই যথাসম্ভব নিশ্চিত হওয়ার পরই সরাসরি সাক্ষাতের পর্যায়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবে কী হয়?

কোনোভাবে একটি সম্বন্ধের সন্ধান পাওয়া মাত্রই আর সাত-পাঁচ ভাবার সময় ও ধৈর্য হাতে থাকে না। যেন একটু দেরি হলেই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। তড়িঘড়ি করে পাত্রী দেখার দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যায়। তারপর একদিনের মধ্যেই মা-বাবা, ছেলে, বড় ভাই, বড় বোন, দুলাভাই, চাচা—কখনো কখনো আত্মীয়স্বজনের পুরো বহর গিয়ে উপস্থিত হয় মেয়ের দরজায়।

এরপর শুরু হয় আপ্যায়নের পালা। অনেক পরিবার সামর্থ্যের সীমা অতিক্রম করেও অতিথিপরায়ণতার দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হয়। অর্থ ব্যয় হয়, শ্রম ব্যয় হয়; তার চেয়েও বেশি ক্ষয় হয় মানসিক স্বস্তির। সব আয়োজন শেষে পাত্রপক্ষ দেখে-শুনে বিদায় নেয়।

তারপর...

নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা।  আর কোনো খবর নেই। এক সপ্তাহ পেরিয়ে যায়। এক মাস কেটে যায়। কখনো তারও বেশি সময় অতিবাহিত হয়। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর আর ফুরায় না।

মেয়ের পরিবার অপেক্ষা করে। মেয়েটি নীরবে অপেক্ষা করে। আশা নিয়ে, স্বপ্ন নিয়ে দিন গোনে।অথচ এদিকে পাত্রপক্ষ আরও তিন-চারটি জায়গা দেখে ফেলেছে। প্রথম মেয়েটির কথা তাদের মনেই নেই।

এটাকে কি অবিচার বলা হবে না? এটাকে কি অমানবিক আচরণ বলা হবে না? এটাকে কি এক ধরনের নীরব জুলুম বললেও অত্যুক্তি হবে?

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ছেলেপক্ষ অধিকাংশ সময় এই জুলুমের গভীরতাই উপলব্ধি করতে পারে না। করবেই-বা কীভাবে? একজন ছেলে একশোটি মেয়েকে দেখেও ফিরে এলে তার সামাজিক অবস্থানেও তেমন কোনো প্রভাব পড়ে না, মানসিক অশান্তিরও তেমন কিছু হয় না। বরং দুঃখজনক হলেও সত্য, কেউ কেউ এটিকে এক ধরনের আনন্দ কিংবা সামাজিক রেওয়াজ বলেই ধরে নিয়েছেন।

কিন্তু একটি মেয়ের জীবনে বিষয়টি এতটা হালকা নয়। তার পরিবার জানে প্রতিটি অপেক্ষার প্রহর কতটা ভারী। সে নিজে জানে অনিশ্চয়তার প্রতিটি দিন কত দীর্ঘ, কত ক্লান্তিকর, কত অস্থিরতায় ভরা।

আপনি হয়তো কয়েক ঘণ্টার জন্য দলবল নিয়ে গিয়ে দেখে এলেন। কিন্তু সেই কয়েক ঘণ্টার পদচিহ্ন একটি মেয়ে ও তার পরিবারের মনে কত দিন পর্যন্ত রয়ে যায়, কখনো কি তা ভেবে দেখেছেন?

যখন আশপাশের মানুষ জানতে পারে, এতজন মানুষ এসে দেখে গেলো, তখন পরবর্তী প্রতিটি প্রস্তাবের সঙ্গে অবধারিতভাবেই কিছু প্রশ্নও এসে দাঁড়ায়—কেন হলো না? কেন অপছন্দ হলো? মেয়ের কোনো সমস্যা ছিল? নাকি পরিবারের?

তখন পরিবার ও মেয়ে অগত্যা এমন এক বিব্রতকর ও হতাশাজনক পরিস্থিতিতে পড়ে, যার ভার বাইরের মানুষ কখনো উপলব্ধিই করতে পারে না।

আর যদি এরই মধ্যে ছেলেটি কিংবা তার পরিবার মেয়েটির মনে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে থাকে, তাহলে সেই অপেক্ষা, সেই অপূর্ণ প্রত্যাশা, সেই নীরব ভাঙন তার অন্তরে এমন এক ক্ষতের জন্ম দেয়, যার গভীরতা বাইরে থেকে কখনোই বোঝা যায় না। মানুষ দেখে একটি সম্বন্ধ ভেঙে গেছে; কিন্তু দেখতে পায় না, সেই সঙ্গে একটি কোমল হৃদয়ের কতগুলো স্বপ্নও নীরবে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সেই অভিঘাতের রেশ অনেক সময় দীর্ঘদিন, কখনো দীর্ঘকাল পর্যন্ত একজন মেয়ে এবং তার পরিবারের ভেতরে থেকে যায়।

একটি পরিবারের সবাই কি একসঙ্গে এতটাই অবুঝ হয়ে যেতে পারে? সবাই কি এতটাই অসচেতন হতে পারে?

ছোটদের কথা না হয় বাদই দিলাম। আবেগের বয়সে তারা অনেক কিছু ভেবে ওঠে না, অনেক কিছুই বিবেচনায় আসে না। কিন্তু পরিবারের প্রবীণরা? তাদের তো অভিজ্ঞতা পোক্ত, তারাও কিভাবে একটি মেয়ে ও তার পরিবারের উপর এমন মানসিক চাপ সৃষ্টি করার আগে একবারও ভাবেন না?

মানুষের কষ্টকে হালকাভাবে নেওয়ার ফল কখনোই ভালো হয় না। কারও হৃদয়ে অকারণে কষ্ট দেওয়া, কারও আশা ভেঙে দেওয়া, কাউকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখা— এসব যদি সত্যিকার অর্থেই জুলুম হয়ে থাকে, তবে এর প্রতিক্রিয়া যে একেবারেই হবে না—এ কথা বলার সুযোগ নেই।

আমার এই লেখার মূল বক্তব্যের সঙ্গে খুব বেশি ভিন্নমত থাকার কথা নয়। চাইলে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা করা যায়, সম্ভাব্য নানা প্রশ্নেরও উত্তর দেওয়া যায়। কিন্তু সেদিকে গেলে লেখাটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ হয়ে যাবে। আপনার মনেও হয়তো আরও কিছু প্রশ্ন এসেছে, সেগুলোর কথাও আমার বিবেচনায় আছে।

তবে আপাতত অন্তত মূল বিষয়ে আমরা সচেতন হই। যাচাই-বাছাই না করে, যথেষ্ট নিশ্চিত না হয়ে, অযথা একটি মেয়ে ও তার পরিবারের মনে আশা জাগিয়ে তাদের দীর্ঘ অপেক্ষা, মানসিক কষ্ট ও অনিশ্চয়তার কারণ না হই। একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমাদের অবশ্যই আছে; কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পথে যেন অন্য একটি পরিবারকে অকারণে কষ্টের ভার বহন করতে না হয়—এই বিবেকটুকুও আমাদের থাকা উচিত।

নিজে সচেতন হই, অন্যদেরও সচেতন করি। হয়তো আমাদের এই সামান্য পরিবর্তনই একটি পরিবারের অশ্রু বাঁচাবে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাবে, আর একটি মেয়ের হৃদয়ে অকারণে জন্ম নেওয়া ভাঙা স্বপ্নের দায় থেকে আমাদের মুক্ত রাখবে। মনে রাখবেন, একটি সচেতনতা হতে পারে আপনার জীবনের বড় পরিবর্তনের সূচনা।

লেখক: তরুণ আলেম ও চিন্তক

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ