আওয়ার ইসলাম ডেস্ক
বর্ষার ভারী বৃষ্টির অন্যতম খারাপ প্রভাব হলো বন্যা। এ বছরও ভারী বৃষ্টির প্রভাবে দেশের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল বন্যাকবলিত এলাকায় পরিণত হয়েছে, যার ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। স্বাস্থ্যকর খাবার, সুপেয় পানি ও থাকার ন্যূনতম পরিবেশ থেকেও বঞ্চিত বন্যাকবলিত মানুষেরা।
বন্যার এই দুর্যোগের সময়ে কিছু রোগবালাই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি এসব রোগবালাই থেকেও সতর্ক থাকা এবং সচেতনতা জরুরি। প্রয়োজন কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ—যা বন্যাবাহিত বা পানিবাহিত রোগ থেকে আমাদের বাঁচতে সহযোগিতা করবে।
* বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার:
বন্যার সময় পানি ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। চিকিৎসকরা বলেন, এ সময় পানি ভালোভাবে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করলে এবং গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে ব্যবহার করলে নানান রোগ থেকে বাঁচা সম্ভব।
বন্যার পানিতে টিউবওয়েল তলিয়ে গেলে করণীয় সম্পর্কে চিকিৎসকরা বলেন, এক কলস পানিতে তিন-চার চা-চামচ ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে টিউবওয়েলের ভেতর এ পানি ঢেলে দিন। এবার আধা ঘণ্টা রেখে এরপর একটানা আধা ঘণ্টা চেপে পানি বের করে ফেলে দিলে সে পানি খাওয়ার উপযোগী হয়ে যাবে। আর ব্লিচিং পাউডার না থাকলে এক ঘণ্টা টিউবওয়েলের পানি চেপে বের করে ফেলতে হবে। তবে নিরাপত্তার জন্য টিউবওয়েলের পানিও ভালোমতো ফুটিয়ে নেওয়া উচিত এবং পানি একটানা ৩০ মিনিট ফুটিয়ে তারপর ঠান্ডা করতে হবে।
কিন্তু পানি ফোটানোর ব্যবস্থা না থাকলে প্রতি দেড় লিটার খাওয়ার পানিতে ৭.৫ মিলিগ্রাম হ্যালোজেন ট্যাবলেট (হ্যালোট্যাব), তিন লিটার পানিতে ১৫ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট এবং ১০ লিটার পানিতে ৫০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা রেখে দিলে পানি বিশুদ্ধ হয়।
বাসার পানির ট্যাংকের প্রতি এক হাজার লিটার পানিতে ২৫০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার এক ঘণ্টা রাখলে পানি বিশুদ্ধ হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ভাইরাস জীবাণু ধ্বংস হয় না। তাই সতর্কতা কাম্য; পানি ফুটিয়ে নিলে উপকার হবে।
* ডায়রিয়া প্রতিরোধে করণীয়:
বন্যায় প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হলো ডায়রিয়া। এজন্য চিকিৎসকরা বলেন, খাওয়ার আগে এবং পায়খানা করার পর হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
যদি ডায়রিয়া হয়ে যায়, তাহলে পরিমাণমতো খাবার স্যালাইন খেতে হবে। দুই বছরের কম শিশুকে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ১০-১২ চা-চামচ এবং ২ থেকে ১০ বছরের শিশুকে ২০ থেকে ৪০ চা-চামচ খাওয়ার স্যালাইন দিতে হবে।
খাবার স্যালাইন না থাকলে বিকল্প হিসেবে লবণ-গুড়ের শরবত খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি ভাতের মাড়, চিঁড়ের পানি ও ডাবের পানি খাওয়াতে হবে। আর যদি কিছুই না পাওয়া যায়, তাহলে শুধু নিরাপদ পানি খাওয়ানো যেতে পারে।
এ সময় শিশুর পুষ্টিহীনতা রোধে খিচুড়ি খাওয়ানো যেতে পারে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো যেতে পারে। যদি পাতলা পায়খানা ও বমির মাত্রা বেড়ে যায়, তাহলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দ্রুত নিয়ে যাওয়া জরুরি।
* খাবার গ্রহণে সতর্কতা:
বন্যায় অনেক সময় মানুষ পচা-বাসি খাবার খেতে বাধ্য হয়। ফলে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগে তারা আক্রান্ত হয়ে পড়ে। তাই বাসি-পচা খাবার খাওয়া থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
বন্যার সময় খিচুড়ি খাওয়া স্বাস্থ্যোপযোগী। খাবার প্লেট সাবান ও নিরাপদ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। পানি বেশি খরচ হয় বলে অনেকে প্রথমে একবার স্বাভাবিক পানিতে থালাবাসন ধোয়ার পর একই পানিতে বারবার ধোয়, যা ঠিক নয়। এতে থালাবাসনে অনেক ধরনের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে।
* দুর্ঘটনা থেকে সাবধানতা:
বন্যার সময় আকস্মিক নানা দুর্ঘটনা ঘটে। সাধারণত বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে যাওয়া, সাপ ও পোকামাকড়ের কামড়ের ঘটনাগুলো বেশি ঘটে। বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেলে বা পানিতে পড়ে থাকতে দেখলে তা স্পর্শ না করে বিদ্যুৎকর্মীদের দ্রুত জানাতে হবে।
এ সময় সাপ ও ইঁদুর তাদের আবাস হারিয়ে শুকনো স্থানে মানুষ ও গবাদিপশুর সঙ্গে অবস্থান নেয়। এ জন্য সাপের দংশন ও ইঁদুরে কাটার পরিমাণ বেড়ে যায়। বিষহীন সাপের দংশনে তেমন ভয়ের কিছু নেই। তবে বিষধর সাপে কাটলে, প্রাথমিকভাবে সাপে কাটা স্থানের সামনে মোটা কাপড় বা গামছা বা রশি দিয়ে গিঁট দিয়ে দিতে হবে। তারপর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালে নেওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে অ্যান্টিভেনম এবং টিটেনাস প্রতিষেধক দিতে হবে। ইঁদুরে কাটলেও অবহেলা না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
* মলত্যাগে সতর্কতা:
বন্যার সময় যেখানে-সেখানে মলত্যাগ করা উচিত নয়। এতে পেটের পীড়া ও কৃমির সংক্রমণ বেড়ে যায়। সম্ভব হলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে মলত্যাগ করতে হবে এবং মলত্যাগের পরে সাবান বা ছাই দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। মলত্যাগের সময় কখনো খালি পায়ে থাকলে বক্রকৃমির জীবাণু শরীরে সংক্রমিত হয়। এ সময় বাসার সবাইকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানো উচিত। তবে দুই বছর বয়সের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
* বন্যা-পরবর্তী সতর্কতা:
বন্যা-পরবর্তী সময়ে মানুষ (দুই বছরের নিচের শিশু ছাড়া) ও গবাদিপশুকে কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে। যেকোনো সমস্যায় জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
আইও/