মাওলানা মুনির আহমদ
দেখতে দেখতে উম্মাহর অন্যতম অবিসংবাদিত রাহবার, কায়েদে মিল্লাত হজরত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)-কে হারানোর পাঁচ বছর পূর্ণ হয়ে গেল। তাঁর নীতি-আদর্শে পাহাড়সম দৃঢ়তা, দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে অক্লান্ত ত্যাগ ও ভালোবাসা, গভীর দেশপ্রেম এবং উম্মাহর প্রতি অকৃত্রিম দরদ—দুই যুগ ধরে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কর্মজীবনে এই মহান ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে সবসময় গভীর আস্থা, উৎসাহ ও প্রেরণা লাভ করেছি। তাঁকে সর্বদা দ্বীন-ইসলাম, দেশ ও উম্মাহর চিন্তায় নিমগ্ন দেখেছি।
এই মহান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কাটানো কিছু মধুর স্মৃতি কখনোই বিস্মৃত হওয়ার নয়। তিনি প্রায়ই আমাকে বলতেন, “মুনির সাহেব, আপনাকে আমি শুধু নিছক লেখক বা সম্পাদক মনে করি না; আপনি একজন উঁচুমাপের বুদ্ধিজীবীও। হেফাজতের ঈমান-আকীদার আন্দোলনে আমরা তো মাঠে বক্তব্য দিয়েছি। আর মিডিয়ার মাধ্যমে বয়ান তৈরি, আমীরের বয়ান প্রচার, ১৩ দফা লেখাসহ হেফাজতের কর্মসূচির পক্ষে যুক্তি তৈরি এবং সেগুলোর প্রচার-প্রসারের বড় একটি দায়িত্ব তো আপনি একাই পালন করেছেন। আমি মনে করি, হেফাজতের আন্দোলনে আপনার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
অথচ বাস্তবতার বিচারে এই উচ্চ মূল্যায়নের যোগ্যতার ছিটেফোঁটাও আমার ছিল না। আমি বরং অনুভব করতাম, গভীর স্নেহ ও ভালোবাসা থেকেই হজরত আমার প্রতি এমন উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। তাঁর সেই স্নেহমিশ্রিত আস্থা আজও আমার জন্য এক অমূল্য স্মৃতি, এক গভীর প্রেরণা এবং একই সঙ্গে এক বড় আমানত।
মাসিক মুঈনুল ইসলামে হযরতের লেখা প্রায়ই প্রকাশিত হতো। লেখা দেওয়ার সময় তিনি একটি কথা সবসময় বলতেন—“লেখা প্রকাশ করা বা না করার বিষয়ে সম্পাদক হিসেবে আপনার পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে লেখা প্রকাশ করবেন না; মান দেখে প্রকাশ করবেন। এছাড়া যেকোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সম্পাদনার পূর্ণ এখতিয়ার আপনার আছে।”
একজন শীর্ষস্থানীয় আলেম-লেখকের কাছ থেকে সম্পাদকের স্বাধীনতার প্রতি এমন উদারতা, আস্থা ও সম্মান পাওয়া বাস্তবিকই বিস্ময়কর ও সৌভাগ্যের বিষয়। বিশেষত, যাঁর প্রতি মানুষের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে, তিনি নিজেই যখন সম্পাদককে বলেন—“আমার দিকে তাকিয়ে নয়, মান দেখে প্রকাশ করবেন”—তখন তাঁর ব্যক্তিত্বের ঔদার্য ও প্রজ্ঞার একটি অনন্য দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দুয়েক মাস পরপর হজরত মাসিক মুঈনুল ইসলাম কার্যালয়ে এলে কিংবা তাঁর রুমে সাক্ষাৎ করতে গেলে আলাপচারিতার ফাঁকে কখনো কখনো হাতে কিছু টাকা তুলে দিতেন। নিতে সংকোচ বোধ করলে বলতেন, “আপনারা উম্মাহর অনেক বড় খেদমত করছেন। আপনাদের আরও অনেক কিছু করার আছে। এই সামান্য হাদিয়াটি আমার পক্ষ থেকে আপনাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য—আর কিছু নয়।”
এমনকি অনেক সময় লুঙ্গি, রুমাল, গেঞ্জি কিংবা পাঞ্জাবির কাপড়ও হাদিয়া দিতেন। এগুলো বস্তুগত দিক থেকে হয়তো সামান্য; কিন্তু হযরতের স্নেহ, আন্তরিকতা ও উৎসাহের স্মারক হিসেবে আমার কাছে প্রতিটি উপহারই ছিল অমূল্য। হযরতের এমন স্নেহ, মূল্যবান উৎসাহ ও দুআ লাভের স্মৃতির তালিকা করতে গেলে তা সত্যিই অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে।
ইসলাম-নির্মূলবাদী নানা তৎপরতা, ঈমান-আকীদা, ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে তিনি প্রায়ই আমাকে ডাকতেন। আমার মতামত গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। পরিস্থিতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো গভীরভাবে বুঝতে চাইতেন। বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বিভিন্ন স্তরের মানুষের—এমনকি জুনিয়রদেরও—মতামত শোনার গুরুত্ব হজরত গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন।
এখানেই তাঁর নেতৃত্বের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি শুধু নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অন্যের কথা শুনতেন না; বরং পরিস্থিতিকে বিভিন্ন দিক থেকে বুঝতে এবং সিদ্ধান্তকে অধিকতর বাস্তবভিত্তিক করতে সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। অথচ কম বিচক্ষণ কেউ কেউ এই উদারতাকেই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে বলতেন, ‘হজরত সবার কথা শুনেন।’ আমি মনে করি, সবার কথা শোনা ছিল তাঁর দুর্বলতা নয়; বরং এটি ছিল তাঁর প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের শক্তি।
হযরতের বিচক্ষণতা, ঈমান-আকীদার সুরক্ষায় আত্মত্যাগ, অদম্য মনোবল, উম্মাহর প্রতি গভীর দরদ, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং আকাশছোঁয়া দেশপ্রেম—কাছ থেকে যা দেখেছি, তা সংক্ষেপে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে ঈমান-আকীদার সুরক্ষার আন্দোলনে যেমন হজরত ছিলেন অদম্য ও অবিচল, তেমনি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সুরক্ষার পাশাপাশি বৈষম্যমুক্ত ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ এবং সর্বস্তরে ন্যায়, ইনসাফ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদ উৎখাতের আন্দোলনেও তিনি ছিলেন সক্রিয় ও সোচ্চার।
ফ্যাসিবাদ উৎখাতের পর নির্বাচিত সরকার কায়েমের এই সময়ে হজরত যদি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকতেন, তাহলে এই পরিবর্তনে তিনি কতটা আনন্দিত হতেন—তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দেশ ও উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁকে সর্বদা গভীরভাবে চিন্তিত দেখেছি, এই পরিবর্তনের সময়ে তাঁর উপস্থিতি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্যও এক বড় প্রেরণার বিষয় হতো।
আমি নিজেকে অনেক বড় সৌভাগ্যবান মনে করি—হযরতের সঙ্গে পরিচয়ের দুই যুগের শুরু থেকে তাঁর ইন্তিকালের আগ পর্যন্ত তাঁর অকৃত্রিম স্নেহ, মমতা ও গভীর আস্থার বেষ্টনীতে থাকার সুযোগ পেয়েছি। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁর উৎসাহ, পরামর্শ ও আস্থার যে স্পর্শ পেয়েছি, তা আমার জন্য নিছক ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়; বরং এক ধরনের আমানত। আলহামদুলিল্লাহ।
এভাবে হঠাৎ করে হজরতকে হারিয়ে ফেলব—কখনো চিন্তাতেও ছিল না। মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাঁদের স্নেহ, শিক্ষা, আদর্শ ও স্মৃতি দীর্ঘদিন মানুষের পথচলার সঙ্গী হয়ে থাকে। হযরতের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তাঁর ইন্তিকালে আমাদের অঙ্গনসহ সমগ্র উম্মাহ যে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং যে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
আজ পাঁচ বছর পরও মনে হয়, হজরত যেন খুব কাছেই আছেন—কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলার জন্য ডাকছেন, মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছেন, কিংবা কোনো লেখার বিষয়ে তাঁর সেই পরিচিত স্নেহমিশ্রিত আস্থার কথা বলছেন। সময় চলে গেছে, কিন্তু কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে দূরে সরে না; বরং স্মৃতির ভেতর আরও গভীর হয়ে থাকে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দরবারে কায়মনোবাক্যে দুআ করি—এই মহান বুজুর্গ আলেমের কবরকে আপন রহমতের চাদরে আবৃত করুন, তাঁর সকল খাতা-ত্রুটি ক্ষমা করুন, তাঁর নেক আমলগুলো কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। হযরতের স্নেহ, আস্থা, দিকনির্দেশনা ও সান্নিধ্য থেকে যারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি, আমাদের সবাইকে তাঁর রেখে যাওয়া দ্বীনি দায়িত্ব ও আদর্শকে ধারণ করে উম্মাহর কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার তাওফীক দান করুন।
আল্লাহ তাআলা তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন, কিয়ামতের দিন তাঁকে তাঁর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে উঠান এবং তাঁর ইলম, খেদমত ও দ্বীনি মেহনতকে তাঁর জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক মুঈনুল ইসলাম
আরএইচ/