|| মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন ||
কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আগ্রাসন চলছে। নাস্তিক্যবাদ, উগ্র হিন্দু-ত্ব-বাদ এবং বিভিন্ন ভ্রান্ত মত ও পথের অনুসারীরা নানাভাবে এতে অংশ নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কওমি মাদরাসার সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা রক্ষায় দায়িত্বশীলদের প্রতি আমার কিছু প্রস্তাব—
১) গড়পড়তায় শিক্ষক নিয়োগের প্রবণতা পরিহার করতে হবে। যাদের মধ্যে শিক্ষকতার মেজাজ, যোগ্যতা ও ছাত্র গঠনের মানসিকতা রয়েছে, কেবল তাদেরই পাঠদানের দায়িত্ব দেওয়া উচিত।
২) শিক্ষকদের জাহিরি ইসলাহের পাশাপাশি বাতিনি ইসলাহ ও আত্মশুদ্ধির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেক নফসই মন্দের দিকে ধাবিত হতে পারে, তবে এর চিকিৎসা আছে সেটা আলোচনায় আনতে হবে।
৩) মক্তব ও হিফজখানাগুলোকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে, যাতে শিক্ষার পরিবেশ আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হয় এবং অভিভাবকদের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
৪) থানা ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ ওলামায়ে কেরামকে নিয়ে একটি সমন্বিত সহযোগিতা টিম গঠন করা যেতে পারে। তারা নিজ নিজ এলাকার ছোট-বড়, প্রাইভেট-পাবলিক—সব ধরনের মাদ্রাসার নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন এবং সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করবে এবং কোনো অপবাদ বা অভিযোগের ভিত্তিতে সহজে কাউকে হেনস্তা করার সুযোগ থাকবে না।
৫) কোনো প্রতিষ্ঠানে অনৈতিক বা আপত্তিকর ঘটনা ঘটলে তা ধামাচাপা না দিয়ে দ্রুত ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৬) কওমি মাদরাসায় আকিদার বিষয়গুলো সাধারণত উচ্চ জামাতে পড়ানো হয়। ফলে নিচের জামাতের কিছু আবেগপ্রবণ ও অপরিপক্ব ছাত্র আকিদার বিষয়কে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করেছে। তারা অনেক সময় আমলি অবক্ষয়কে আকিদাগত বিচ্যুতির চেয়ে বড় সমস্যা মনে করে বাতিল ফিরকাগুলোর প্রতি সহনশীল হয়ে ওঠছে। অথচ বাস্তবতা হলো, প্রত্যেক বাতিল ফিরকাই শেষ পর্যন্ত আকিদা ও আমল উভয় ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে।
৭) ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা ধারা ও মতের উদ্যোগে শিশুদের জন্য অসংখ্য আকর্ষণীয় প্রাইভেট মাদরাসা গড়ে উঠেছে। ছাত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তাদের অনেকেই কওমি মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। কিছু এলাকা থেকে খবর আসছে যে, এর প্রভাবে নূরানী মক্তব ও হিফজখানাগুলোতে ছাত্রসংখ্যা কমে গেছে। এ বিষয় নিয়েও সতর্ক হোন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার দায়িত্বও অনেক ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসা থেকে বের হওয়া ব্যক্তিদের মাধ্যমেই পালন করা হচ্ছে। কিন্তু সেখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে কওমি মাদরাসায় ফিরে আসবে—এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ তাদেরকে সাধারণত স্কুল, আলিয়া ও বিভিন্ন প্রাইভেট পরীক্ষার দিকে বেশি উৎসাহিত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দ্বীনি শিক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শের দিকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করার চেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়।
মনে রাখতে হবে, এই পাইপলাইন দুর্বল হয়ে গেলে তার প্রভাব অনিবার্যভাবে উচ্চতর জামাতগুলোতেও পড়বে। তাই বিষয়টি নিয়ে এখন থেকেই গভীরভাবে চিন্তা করা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
লেখক: মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট; সিনিয়র মুহাদ্দিস, লালবাগ জামিয়া
জেডএম/
