রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬ ।। ১৪ চৈত্র ১৪৩২ ।। ১০ শাওয়াল ১৪৪৭

শিরোনাম :
কাল থেকে পুনরায় শুরু হচ্ছে জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশন দেশের সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের আহ্বান ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বৃষ্টি ও তাপমাত্রা নিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বার্তা এলজিইডির উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আনতে সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান মির্জা ফখরুলের ভোটার নিবন্ধন ফরম নিয়ে ইসির জরুরি নির্দেশনা সংসদ ভবনের মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়নে সংসদ কমিটির সুপারিশ সুনামগঞ্জে যমুনার বার্জ ডিপোতে দেড় প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন সংসদীয় কার্যক্রমে গতি আনার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ময়মনসিংহে অবৈধভাবে মজুদ করা ২৪ হাজার লিটার জ্বালানি জব্দ নারায়ণগঞ্জে নতুন করে কোনো মাফিয়া যেন তৈরি না হয়: নাহিদ ইসলাম

কওমি মাদরাসায় কেন বেড়েই চলেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| জহির উদ্দিন বাবর ||

গত কয়েক বছরে দেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে ছাত্রসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে কওমি মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার হার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। যেহেতু কওমি মাদরাসাগুলো একক কোনো বোর্ড বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না এজন্য সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া মুশকিল। তবে বেফাক-হাইয়্যাসহ বোর্ডগুলোর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি থেকে সেটা অনুমান করা যায়। পাশাপাশি যারা কওমি মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে সবসময় অস্বস্তি বোধ করে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকেও বিষয়টি পরিষ্কার।

কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদের স্বীকৃতি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তবে কওমি মাদরাসা নিয়ে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠারও শেষ ছিল না। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে ডিসিরা কওমি মাদরাসায় ছাত্রছাত্রী সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উপস্থাপন করে উদ্বেগও প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি কওমি মাদরাসার কারণে স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলেও জানিয়েছিলেন তারা। তখনকার শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান নওফেলের বক্তব্যেও কওমি মাদরাসায় শিক্ষার্থী বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছিল। এমনকি আওয়ামী লীগের পতনের পর এক সাক্ষাৎকারে নওফেল দাবি করেছেন, তাদের পতনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মাদরাসাপড়ুয়ারা। তাদের সময়ে মাদরাসার সংখ্যা এবং ছাত্র ভর্তির লাগাম টানতে না পারাকে তিনি নিজেদের সময়ের ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও একজন সচিব কওমি মাদরাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এই ধারা কীভাবে বন্ধ করা যায় সেটা নিয়ে ভাবতে তাগিদ দেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব  সিদ্দিক জোবায়ের তখন কওমি মাদরাসায় ছাত্র সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের প্রতি তাগিদ দিয়েছিলেন। তার সেই বক্তব্য নিয়ে তখন বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।

কিন্তু কওমি মাদরাসায় দিন দিন ছাত্রসংখ্যা কেন বেড়েই চলেছে? এর পেছনে কী কারণ? শুধু বিরোধী পক্ষ নয়, কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের সামনেও সেই কারণগুলো পরিষ্কার থাকা দরকার। এতে কওমি মাদরাসার সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সহায়ক হবে। যদিও কওমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিষয়গুলো নিয়ে তেমন কোনো স্টাডির কথা শোনা যায় না।

কওমি মাদরাসায় ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধির অনেক কারণের মধ্যে একটা বড় কারণ এখানে পড়াশোনার খরচ তুলনামূলক কম। এখানেও ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তারপরও সাধারণ শিক্ষার তুলনায় অনেক কম। যেহেতু মাদরাসাপড়ুয়াদের বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ফলে তাদের পক্ষে বিপুল অংকের শিক্ষাব্যয় মেটানো সম্ভব হয় না। কওমি মাদরাসাগুলো যেহেতু জনসাধারণের অনুদানে চলে, ফলে শিক্ষার্থীদের খাওয়া, আবাসনসহ অন্যান্য ব্যয়ের পেছনে বড় অংকের ভর্তুকি দিয়ে থাকে কর্তৃপক্ষ। এজন্য শিক্ষার্থীদের ওপর খরচের পুরোটা চাপিয়ে দেওয়া হয় না কোনো মাদরাসাতেই। এটাই মূলত এখানে শিক্ষাব্যয় কম হওয়ার বড় কারণ।

সাধারণ মানুষের মধ্যে দীনের প্রতি অনুরাগ ও সচেতনতা যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। সাধারণত ধর্মপ্রাণ মানুষদের প্রত্যাশা থাকে, তিনি মারা যাওয়ার পর যেন তার সন্তান জানাজার নামাজটা পড়াতে পারেন। তার জন্য যেন একটু দোয়া করতে পারেন। সেই তাগিদ থেকেই সমাজের একটি বড় অংশ তাদের সন্তানদের মাদরাসায় পাঠিয়ে থাকে। যেহেতু দীনের সঠিক ধারাটির প্রতিনিধিত্ব কওমি মাদরাসাই করছে, এজন্য সবার পছন্দের তালিকায় থাকে এই মাদরাসা। একটা সময় দীনি প্রয়োজনে সন্তানদের আলিয়া মাদরাসায় পাঠালেও এখন সাধারণত এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আলিয়া মাদরাসাগুলোর সিলেবাসে দিন দিন ইসলাম যেমন গৌণ হয়ে যাচ্ছে, তেমনি এখানকার শিক্ষার্থীদের সিংহভাগই সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এজন্য নিরেট দীনের জন্য মাদরাসায় পড়াশোনা মানেই এখনকার অভিভাবকদের প্রথম পছন্দে থাকে কওমি মাদরাসা।

জেনারেল শিক্ষার মান দিন দিন নিম্নমুখী হচ্ছে। ভালো পড়াশোনা হয়, পাশাপাশি আদব-কায়দা, সভ্যতা-সংস্কৃতি সর্বোপরি একজন ভালো মানুষ তৈরির মতো প্রতিষ্ঠান দিন দিন কমে যাচ্ছে। শিক্ষার হার বাড়লেও পুরোপুরি সুফল মিলছে না। শিক্ষিতদের বড় একটা অংশ বেকার থাকছে। উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে মাদকসহ নানা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা। সমাজের এসব বাস্তবতা চোখের সামনেই ঘটছে। যে মা-বাবা তাদের জীবনের সর্বোচ্চটুকু বিলিয়ে সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করছেন, সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে দিচ্ছেন; সেই মা-বাবাকেই শেষ বয়সে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হচ্ছে। এসব বাস্তবতা চোখের সামনে অহরহ ঘটতে থাকায় অভিভাবকদের বড় অংশ সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে করে তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সন্তানদের মাদরাসায় পাঠাচ্ছে।

করোনা মহামারি বিশ্বজুড়ে মানুষের মনোজগতে নজিরবিহীন ধাক্কা দিয়ে যায়। এই ধাক্কায় পাল্টে যায় মানুষের জীবনবোধ। বিশেষ করে বিশ্বাসী মানুষেরা নতুন করে চিন্তার খোরাক পান। এই জীবন এবং এর যত উপকরণ সবই ব্যর্থ মনে হয় মহান প্রভুর শক্তির সামনে। এজন্য অনেকের জাগতিক হিসাব-নিকাশটাই পাল্টে গেছে। সেই হিসাব থেকেই অনেকে তাদের সন্তানদের পরকালমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। যেহেতু আমাদের দেশে স্কুল-কলেজের শিক্ষায় ন্যূনতম ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণের উপকরণও নেই, ফলে সত্যিকারের দীনি শিক্ষা মাদরাসার দিকেই ঝুঁকছেন সাধারণ মানুষ। এজন্য দীনি শিক্ষার পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানে জাগতিক বিষয়াদিও গুরুত্ব পায় সেইসব প্রতিষ্ঠান দিন বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

বিভিন্ন সেক্টরে আলেম-উলামার সরব উপস্থিতিও মাদরাসার প্রতি সাধারণের ধ্যান-ধারণায় পরিবর্তন এনেছে। একটা সময় মৌলভী সাহেব বলতেই মনে করা হতো, মসজিদ-মাদরাসার চারদেয়ালে বন্দি কেউ। গত এক দুই দশক ধরে রাজনীতি থেকে শুরু করে সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন সেক্টরে আলেম-উলামার ব্যাপক উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সেলিব্রেটি আলেম কিংবা বিশ্বজয়ী হাফেজ এখন ভাইরাল টপিক। একজন মাদরাসায় পড়াশোনা করেও বিভিন্ন সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন এবং নিজের মেধা ও প্রতিভার জানান দিতে পারেন- সেটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সন্তান মাদরাসায় পড়লে খাবে কী, চলবে কীভাবে- এমন অহেতুক চিন্তা যাদের মধ্যে ছিল তাদের অনেকেই সেই চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। পরকালীন প্রাপ্তির পাশাপাশি জাগতিক সম্ভাবনার বিষয়টিও উজ্জ্বল হওয়ায় তারা সন্তানদের মাদরাসায় পড়াতে সম্মত হচ্ছেন।

কওমি মাদরাসার মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক নারী। একটা সময় হাতেগোনা কয়েকটি মহিলা মাদরাসা ছিল। মহিলা মাদরাসার আদৌ প্রয়োজন আছে কি না সেটা নিয়েও আলেমদের একটি অংশে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। ধার্মিক পরিবারগুলো এখন তাদের মেয়েদের মহিলা মাদরাসায় পড়াশোনা করতে পাঠাচ্ছে। এর কারণ হলো, আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষার পরিবেশটা নারীবান্ধব না। যারা একটু দীনি পরিমণ্ডলে তাদের মেয়েদের বড় করতে চান, তাদের জন্য কোনোভাবেই স্কুল-কলেজের পরিবেশ সহায়ক নয়। এজন্য কওমি মাদরাসাগুলোতে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। এবারও বেফাক পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের প্রায় অর্ধেক নারী শিক্ষার্থী। এভাবে ছাত্রীসংখ্যা বাড়তে থাকলে আগামীতে ছাত্রদের চেয়েও তাদের সংখ্যা বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

এভাবেই নানা কারণে দিন দিন মাদরাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তবে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের জন্য এতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার কোনো সুযোগ নেই। এই শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ঢেলে সাজিয়ে ‘কওমি’কে সত্যিকারের জাতীয় মাদরাসা হিসেবে রূপান্তর করার দায়িত্ব তাদের।

লেখক: আলেম সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সম্পাদক

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ